রুদ্রর কবিতা আমাকে শোয়া থেকে বসিয়ে দেয়। দাঁড় করিয়ে দেয়। বারান্দায় অস্থির হাঁটায়। এমন সত্য কথন, এমন দৃঢ এবং বলিষ্ঠ বক্তব্য আমাকে আকৃষ্ট না করে পারে না। রুদ্রর কবিতা সজোরে পড়ার মত, আবৃত্তি করার মত একঘর লোকের সামনে,খোলা মাঠে, জনসভায়। কবিতা আবৃত্তি করা নিতান্তই নতুন নয় আমার জন্য, দাদার ছোটবেলায় মা শিখিয়েছেন দাদাকে, আর আমার বড়বেলায় দাদার কাছে তালিম পেয়েছি আমি, আর আমি শেখাতে শুরু করি ইয়াসমিনকে। ইয়াসমিন ইশকুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায়, কেবল ইশকুলের নয়, ময়মনসিংহ জেলার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব চলছিল, সেই উৎসবের আবৃত্তিতে নাম লিখিয়ে আসে। ঠিক ঠিক একদিন গিয়ে আবৃত্তি করে তিন তিনটি পুরষস্কার পেয়ে গেল, ময়মনসিংহ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হাত থেকে ঢাউস ঢাউস রবীন্দ্ররচনাবলী, গীতবিতান, নজরুলের সঞ্চিতা, রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা নিয়ে বাড়ি ফিরল। গীতবিতান খুলে একা একাই ও গান গাইতে শুরু করে। ওর গানে চমৎকার সুর ওঠে, সুর শুনে বার বার বলি, তর একটা হারমোনিয়াম থাকলে ভাল হইত। বাড়িতে কোনও বাদ্যযন ্ত্র নেই। দাদার বেহালা ভেঙে পড়ে আছে, ছোটদা নিজের গিটার বিক্রি করে গীতাকে শাড়ি কিনে দিয়েছেন। বাবা গান বাজনা পছন্দ করেন না, বাবার কাছে ইয়াসমিনের জন্য হারমোনিয়াম কেনার কথা বলা মানে গালে দুটো চড় খাওয়ার ব্যবস্থা করা। গান গাওয়ার স্বপ্ন ইয়াসমিনকে আপাতত হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে হয়। তারচেয়ে কবিতা পড়, কবিতা পড়তে কোনও যন্ত্রের দরকার হয় না।
মাথায় যখন সেঁজুতি, মনে যখন কবিতা তখন আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য দাদা আমাকে ঢাকা নিয়ে গেলেন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটদার বন্ধু রফিকের হোস্টেল-রুমে নিয়ে যান ভর্তি পরীক্ষায় কি প্রশ্ন আসে, কি রকম কি তার সামান্য হলেও যদি তিনি আভাস দেন। রফিক মলিন হেসে বলেন, কালকে পরীক্ষা, আজকে কি আর দেখাবো! তবু আমাকে বসিয়ে কাগজ পেন্সিল দিয়ে একটানে একটি সরলরেখা আঁকতে বললেন, একটানে বৃত্ত। আঁকার পর বললেন,এই ঘরটার ছবি আঁকো। তাও আঁকার পর বললেন হাত তো ভালই। ওই হাত ভাল নিয়ে পরদিন পরীক্ষা দিতে বসে ছবিগুলো, যা আঁকতে বলা হয়েছে, একেঁ দিই। কিন্তু দশটি অঙ্কের একটি করাও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। হবে কেন, অঙ্ক নিয়ে তো বসিনি, বসেছি কবিতা নিয়ে। দুঘন্টা পরীক্ষা, কিন্তু একঘন্টা পর পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে দাদাকে নিস্প্রাণ কণ্ঠে বলে দিই, আমার পাশ হবে না। কদিন পর,আশ্চর্য, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আপিসঘরের পাশে মৌখিক পরীক্ষায় যাবার জন্য টাঙানো নামের তালিকায় আমার নামটি আছে খবর পাই। মৌখিক পরীক্ষা দিতে ঢাকা যেতে হবে, আমাদের সুটকেস গোছানো সারা। কিন্তু আমাদের যাত্রাভঙ্গ করে বাবা বললেন, ঢাকা যাওয়ার দরকার নাই।
কেন, ঢাকা যাওয়ার দরকার নাই কেন? ঢাকা না গেলে তো মৌখিক পরীক্ষা দেওয়া হবে না,না দেওয়া হলে আর্কিটেকচারে আমার ভর্তি হওয়া হবে না! বাবার অনড় অটল মূর্তিটির সামনে এক পাহাড় প্রশ্ন নিয়ে আমি স্তম্ভিত বসে থাকি।
বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, আর্কিটেকচারে পড়তে হইব না।
আমার স্বপ্নের স্থাপত্য হুড়মুড় করে আচমকা ভেঙে পড়ে। হৃদয় জুড়ে ভাঙন নিয়ে একা উদাস বসে থাকি।
আর্কিটেকচারে পড়তে হইব না কারণ মেডিকেলে পড়তে হইব আমাকে। আমার নাম উঠেছে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়াদের তালিকায়।
০৮. নিঃসঙ্গতার সঙ্গ
বাবা যা বহাল করেন বাড়িতে, তা যে বছরের পর বছর বহাল থাকে তা নয়। দড়ি তাঁর হাতে, যখন ইচ্ছে ঢিলে করেন, যখন ইচ্ছে শক্ত। তাঁর নেওয়া কিছু কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে তিনি হঠাৎ একদিন সরে আসেন। আমার কাছে পত্রমিতাদের চিঠি আর না আসতে থাকায় তিনি নতুন আসা ডাকপিয়নকে নতুন করে বাগিয়ে নিয়ে চিঠি হাত করতে চেষ্টা করেন না। ডাকপিয়ন আগের মত বাড়িতে চিঠি দিতে শুরু করেছে। রান্নাঘরের বন্ধ আলমারির তালা খুলে যেভাবে গুনে গুনে সবকিছু দিচ্ছিলেন তাতেও ভাটা পড়ে, তাঁর পক্ষে এত ঘন ঘন নতুন বাজার থেকে প্রতিবেলা রান্না চড়ানোর আগে বাড়ি আসা সম্ভব হয় না। আলমারি এখন খোলাই থাকে। মা আগের মতই সংসারসমুদ্রে নিমজ্জিত হন। জরির মা চলে গেলে নানিবাড়ির পেছনের বস্তি থেকে মালেকাকে এনেছিলেন, সেই মালেকাও মাস পার না হতেই চলে গেছে, দুদিন এদিক ওদিক খুঁজে কাউকে না পেয়ে পাড়ার রাস্তায় ভিক্ষে করা হালিমাকে ধরে আনলেন মা। হালিমা তার মা সহ বাড়িতে বহাল হয়ে গেল। টুকটাক সওদা করতে গিয়ে রাস্তায় কোনও এক শিশিবোতলকাগজঅলার সঙ্গে দেখা হয় হালিমার, সেই অলা তাকে বিয়ে করবে বলেছে বলে খুশিতে সে আটখানা থেকে ষোলখানা হয়ে যায়। মা একটি রঙিন শাড়ি দিলেন হালিমাকে, কাগজঅলা জামাইকে একটি নতুন লুঙ্গি। বিয়ে হওয়া হালিমা সদপের্ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। হালিমার মা একাই রয়ে গেল এ বাড়িতে। খুক খুক কাশতে কাশতে একা। একা তার পক্ষে বাড়ির সব কাজ করা কঠিন হয়ে ওঠে। গা প্রায়ই জ্বরে পুড়তে থাকে। যেদিন কাশির সঙ্গে দলা দলা রক্ত বেরোল, মা তাকে হাসপাতালে নিজে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে এলেন। দু সপ্তাহ পার না হতেই হালিমা ফিরে এল অবকাশে। কি হয়েছে? জামাই ভাত দেয় না।
হালিমা আগের মত বাসন ধোয়ায়, কাপড় ধোয়ায়, ঘর মোছায় লেগে গেল। থেকে থেকে কেবল বলে রাইতে ঘুমাইতে পারি নাই বেডার জ্বালায়। জ্বালাটি কি ধরনের জ্বালা শুনতে আমরা উৎসুক।
