পত্রের কোনও প্রত্যুত্তর বাবা পান না। তিনি মখু কালো করে বাড়ি ফেরেন, মখু কালো করেই বেরিয়ে যান। আমার লম্বা ফর্সা কোঁকড়া চুলের উত্তম কুমার-বাবা-র পেটে কত ধমক,কত খিস্তি জমা হয়ে আছে, ছিটকে বেরোতে চায়, কিন্তু তিনি ওসব নীতি-চাপা দিয়ে রাখেন। নৈঃশব্দ তাঁর অনেক নীতির এক নীতি কি না! পত্রাঘাতে আমি হেলে পড়ছি না বলে তিনি যে কাজটি করেন এরপর, সেটি অভিনব। তাঁর ঘরের দরজায় একটি কাগজ সেঁটে তিনি লিখেছেন,
আমি আর সহিতে পারছি না এত অন্যায়,
এই কি ছিল আমার কপালে হায়!
ছেলেমেয়েরা গেছে উচ্ছন্নে,
কাঁদিয়া মরি আমি মনে মনে।
লেখাটি পড়ে বাবার ঘরের লাল নীল জানালার লাল কাচে ভাতের আঠায় একটি কাগজ সেঁটে দিয়ে আসি, কাগজে লেখা,
কী আবার অন্যায় করলাম হঠাৎ
আমার তো কাটে দিন আর রাত
অবকাশে বসে, যাই না কোথাও,
বাড়াই না দরজার বাইরে এক পা ও।
বাবা বাড়ি ফিরলে আমি গুটিয়ে রাখি নিজেকে ঘরের ভেতর। প্রতিক্রিয়ার জন্য কান পেতে রেখেও কোনও লাভ হয়নি। বাবা নিঃশব্দে এসে নিঃশব্দে চলে গেছেন। চলে যাওয়ার পর জানালার কাগজের অবস্থাটি দেখতে গিয়ে দেখি ওই কাগজের পাশে আরেকটি কাগজ সাঁটা, ওতে লেখা
বাইরে না গেলেই কি সাধু হওয়া যায়!
এই লোক ঠিকই খবর পায়!
অবকাশে কি কি হয়।
শখ করে করা হচ্ছে জীবনের ক্ষয়।
নাই কোনও ভয়
যত্রতত্র পত্রমিতালি করে কেউ হয়না বড়,
লেখাপড়া না করলে জীবনের খুঁটি হয় নড়বড়।
বাবার লেখা পড়ে আবার কাগজে বড় বড় করে লিখি, লেখার সময় আমার মাথার পাশ থেকে ইয়াসমিনের মাথাটি কিছুতে সরে না।
তা তো জানি, তাকি আর জানি না !
তবে একটা জিনিস আমি মানি না
যে, কিলিয়ে কাউকে মানুষ করা যায়।
বাবারা কি এতে খুব সখু পায়,
কন্যারা যখন কেঁদে বুক ভাসায়!
বাবা সন্ধের মধ্যেই ফিরে এলেন, এসেই ঘরে ঢুকে ঘন্টা খানিক কারুকে ডাকাডাকি না করে কাটিয়ে, বেরিয়ে মার কাছে এক গেলাস পানি চেয়ে খেয়ে, বাড়িতে আনাজপাতি কিছু লাগবে কি না জিজ্ঞেস করে চলে গেলেন। ঘরে কেঁচো হয়ে বসে ছিলাম। বুক ধড়ফড় করে, এই খোলা পদ্যের গোলা শেষ অবদি কতটা বিস্ফোরক হবে কে জানে! বাবা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেঁচো কেটে বের করি কিংশুক।
বাবা লিখে গেছেন, এবার জানালার বেগুনি কাচে।
মরমে গিয়া আঘাত করিল আত্মজার ক্রন্দন
পিতাই শুধু বোঝে কন্যার সহিত কতখানি তার আত্মার বন্ধন।
পিতা আজ আছে, কাল যাবে মরে
তাইতো কন্যাকে সে দিতে চায় ভরে
শিক্ষা দীক্ষা আর দেখাইতে চায় সত্যের পথ
যে পথে চললে সকলে ভাল বলে, এই তো পিতার মত।
এই কথোপকথন আমাকে ভীষণ উৎসাহিত করে। বাড়ির সবাই এসে জানালার কাচে সাঁটা পদ্য পড়ে যায়। দাদার দেওয়া লাল ডায়রিতে কবিতা লেখা বাদ দিয়ে জানালায় সাঁটা এই পদ্য পদ্য খেলায় আমি মেতে উঠি।
রবীন্দ্রনাথ পড়ে কি কোনও সত্য যায় না পাওয়া?
কাজী নজরুলকে কার সাধ্য আছে করে হাওয়া!
আর সুকান্ত সে তো দুর্দান্ত।
কবিতা মানে কি মিথ্যের পথ?
যদি হয়, তবে এই দিচ্ছি নাকে খত
ওপথ মাড়াবো না,
কারো দুঃখ বাড়াবো না।
আমি অতি তুচ্ছ ক্ষুদ্র প্রাণী,
কেবল এইটুকু জানি
আমার কোনও তৃষ্ণা নেই মণি মুক্তা মালার,
একটু শুধু তাগিদ আছে সন্ধ্যাদীপ জ্বালার।
এক জানালা শেষ হলে আরেক জানালায় সাঁটা হচ্ছে। এটি পড়ে মা বললেন, আমি তুচ্ছ ক্ষুদ্র প্রাণীডা কাইট্টা দে।
কাইট্টা দিলে কি দিয়া মিলাবো?
লেইখা দে, আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান প্রাণী।
কাটা হয় না, কারণ বাবার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। বাবা আজকাল ঘন ঘন বাড়িতে ঢুঁ মারেন। পেচ্ছাব পায়খানা তো আছেই, এক গেলাস পানি খেতেও নতুন বাজার থেকে আমলাপাড়া পাড়ি দেন। উদ্দেশ্য অবশ্য কবিতা। কখনও এমন হয়েছে তিনি লিখে যাওয়ার আধঘন্টার মধ্যেই খামোকা ফিরে এলেন বাড়ি। ঘরের জানালা দরজায় নতুন কিছু সাঁটা হয়েছে কি না দেখে যান। কারণ ছাড়াই আমার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আড়চোখে দেখেন আছি কি না। চোখাচোখি হয় না, ও জিনিসটি তিনিও এড়িয়ে চলেন, আমিও। কথা বন্ধের কালে দৃষ্টিও সংযত করার নিয়ম, এ নিয়ম বাবারই শেখানো।
রবিবাবু কবিতা লিখেছেন নির্ভাবনায় জমিদারদেরই এইসব মানায়। ছাত্রজীবনে কবিতা কি শোভা পায়? এই হতভাগা বড় কষ্টে সংসার চালায় এত কষ্টের ফল কি সে পায়? পিতার কথা কি তারা এতটুকু ভাবে? আমি তো দেখি না কোনো সম্মান হাবে ভাবে। কত বলি হইতে মানুষের মত মানুষ তবওু দেখি না তাহাদের কোনও হুঁশ। সময় গেলে সময় নাহি আসে পিতা মরে গেলে কেউ আর নাই পাশে। ছাত্রজীবনে অবসর বলে কিছু নাই এই কথা আমি বারবার বলি, আবারও বলে যাই হেলাফেলা করিলে জীবনটি হবে নষ্ট দেখে আর কেউ নয়, পিতাই পাইবে কষ্ট।
বাবা এই পদ্যটি লিখতে সময় নিয়েছেন বেশ। সালামকে খুঁচিয়ে খবর জোটে, বাবা কাগজ কলম নিয়ে আজকাল আরোগ্য বিতানে বসে মাথা চুলকোন। রোগী বসে থাকে অপেক্ষা-ঘরে। তিনি চুলকোচ্ছেন, লিখছেন, ফেলছেন, আবার নতুন করে লিখছেন। পরে বেরিয়ে এসে রোগীদের আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে তিনি বাড়ি থেকে ঘুরে যান। ঘুরে যাওয়া মানে জানালায় পদ্য সেঁটে যাওয়া।
এ পদ্যটি পড়ে মা বলেন, হুঃ! এই সংসার চালাইতে কষ্ট হয় নাকি কোনও? সাতদিনে একদিন বাজার করে। হেই বেডির বাড়িত ত প্রত্যেকদিন মাছ মাংস যায়। টাকা ত আর কম কামায় না। তোদেরে কি দেয়? শখের একটা জিনিস দিছে কোনওদিন?
