যেদিন হলুদ রঙের পাঁচশ সেঁজুতি ছাপা হয়ে বাড়িতে এল, সেঁজুতির রূপ রস গন্ধ সব গ্রহণ করার পর বিছানায় বসে সেজুঁতির পাতা ভাঁজ করে করে পিন আটকে আলাদা করে রাখছিলাম, বাবার বাড়ি ঢোকার শব্দ শুনে চালান করে দিই সব খাটের নিচে। খাটের নিচেও চোখ যায় বাবার। বাবার চোখ, ইয়াসমিন বলে, শকুনের। কারও সাধ্য নেই কিছু লুকিয়ে রাখে। বাড়িতে কি হচ্ছে না হচ্ছে, তা তিনি বেশির ভাগ সময় বাড়ি না থেকেও জানেন। কে যে কখন বাবার দূত হয়ে কাজ করে, অসম্ভব অনুমান করা। মাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি ওইসব, লেখাপড়া রাইখা করে কি মেয়ে?
মা নিস্পৃহ কণ্ঠে বলেন, কি জানি কি কবিতার পত্রিকা ছাপাইছে।
কবিতার পত্রিকা আবার কি?
কবিতা লেখে। পত্রিকা ছাপায়।
কবিতার পত্রিকা দিয়া কি হইব? তারে না কইছি লেখাপড়া করতে? মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করাইব কেডা ওরে? কবিতা দিয়া পাশ হইব?
মার ওপর ধকল যায়।
টাকা পাইল কই? বাবার কৌতূহল উপচে ওঠে।
মা নীরস মুখে বলেন, নোমান দিছে।
নোমান দিছে কেন?
চাইছে। দিছে।
চাইলেই দিতে হইব নাকি?
ছোট বোন শখ করছে তাই দিছে।
নোমানের লাভ কি?
লাভ কি সবাই খুঁজে? ভাল লাগে বইলা কবিতা লেখে। নোমানও তো কবিতার পত্রিকা ছাপত। এহন নাসরিন ধরছে।
আমি যে দিনরাইত খাইটা আইনা তাদেরে খাওয়াই, তা কি এইসব আজে বাজে কাজ কইরা সময় নষ্ট করার লাইগা?
মা বলেন,আমারে জিগান কেন? মেয়েরে গিয়া জিগান।
বাবা আমার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে আসেন না। দাদাকে ধরেন, ওরে যে উস্কাইতাছস, ও পাগল হইছে বইলা কি তুইও পাগল হইছস?
দাদা মিনমিন করেন, ওরে তো উস্কাই নাই আমি।
টাকা দিছস কেন?
বেশি দেই নাই ত।
দিছস ত। তুই টাকা না দিলে এইগুলা কি করতে পারত ও?
দাদা গবের্ ফুলে বলেন, না।
কবিতা লেইখা কি হয় জীবনে? কিছু হয়?
না।
তাইলে লেখে কেন?
এমনি।
কবিতা ভাত দেয়?
দাদা মাথা নাড়েন, ভাত দেয় না।
কাপড় দেয়?
দেয় না।
১০৪
বাড়ি দেয়?
না।
ইলেকট্রিসিটি দেয়?
না।
দাদা নতমুখে নরম স্বরে উত্তর দিতে থাকেন।
শহরে ঘুইরা ঘুইরা মাইনষের জীবন ত দেখছস। কেউ কি আছে কবিতা লেইখা বাড়ি বানাইছে?
না।
কোনও ভদ্রলোকে ফালতু কাজে সময় নষ্ট করে?
না।
পাগল ছাড়া আর কেউ কি কবিতা লেখে?
দাদা এবার আর কোনও উত্তর দেন না। বাবা আরও দুবার প্রশ্নটি করে দাদাকে ওভাবেই নিরুত্তর রেখে জুতোর মচমচ শব্দ তুলে বেরিয়ে যান।
বাবা মুখে তালা দিয়েছেন। বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলবেন, আমার সঙ্গে নয়। বাবা কথা না বলা মানে টাকা পয়সা দেওয়া বন্ধ করা। আমার এখন কলেজও নেই যে কলেজে যাওয়ার রিক্সাভাড়ার দরকার হবে, একরকম স্বস্তিই পাই বাবার রক্তচোখ আর দাঁত কটমট আর গালিগালাজ আর পড়তে বসার আদেশের সামনে পড়তে হবে না বলে। বাবার স্বভাবই এমন, হঠাৎ হঠাৎ কথা বন্ধ করে দেন। দীর্ঘ দীর্ঘ দিন এভাবেই চলতে থাকে। বাড়িতে এক কাজের মানুষ ছাড়া আর সবার সঙ্গেই তিনি দফায় দফায় কথা বন্ধ করেছেন। যখন কথা বলা ফের শুরু হয়, তিনি নিজে থেকেই কথা বলতে শুরু করেন বলে হয়। মুখের তালা তিনি যখন ইচ্ছে খোলেন যখন ইচ্ছে লাগান, চাবি তাঁর বুক পকেটে। অনেক সময় এমনও হয় যে বাবা কার সঙ্গে কি কারণে কথা বন্ধ করেছেন, সে কারণ খুঁজে পাওয়া আমাদের সবার জন্য শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।এবার আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করার কারণটি হল সেঁজুতি। মুখে তালা দেওয়ার সপ্তাহ পার না হতেই আমার উদ্দেশে তিনি পত্র পাঠাতে শুরু করলেন। মখু বুজেই তিনি মুখের শব্দগুলো পত্রাকারে, সাধুকে চলিতের সঙ্গে গুলে পাঠাতে লাগলেন। পত্রবাহক আরোগ্যবিতানের কর্মচারি সালাম। সালামকে মা সালামের পুরো নাম ধরেই ডাকেন। সালাম হল আল্লাহর নিরানব্বইটি নামের একটি নাম। সরাসরি আল্লাহর নামে কাউকে ডাকতে হয় না, আবদুস বা আবদুল জুড়ে দিলে নামের অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহর গোলাম। যেহেতু মানুষ মাত্রই আল্লাহর গোলাম, মা তাই সালামকে আবদুস সালাম অর্থাৎ আল্লার গোলাম বলেই ডাকেন। কুদ্দুস নামে মার এক পাড়াতুতো ভাই আছে, সবাই ওকে কুদ্দুস ডাকে, মা ডাকেন আবদুল কুদ্দুস। আবদুস সালাম আমার হাতে পত্র দিয়ে যাওয়ার পর মা আমাকে পড়ে শোনাতে বলেন প্রতিটি পত্রই। আমি জোরে পড়ি, কেবল মা নন, বাড়ির আর সবাই শোনে। দশ বারো পৃষ্ঠার পত্র, পিতার আদেশ নিষেধ মানার ফজিলত বর্ণনা করে পত্রের শুরু, চরম হতাশা আর হাহাকার দিয়ে পত্র শেষ, মাঝখানে নীতিবাক্যের নহর। শেষ বাক্যটি যথারীতি ইতি তোমার হতভাগ্য পিতা। পত্র আমি পড়ি ঠিকই, তবে ভর্তি পরীক্ষার জন্য বইয়ের ওপর উপুড় হয়ে থাকার কোনও চেষ্টাই করি না। করি না কারণ ইচ্ছে করে না। বাবা যে লেখাপড়ার কথা বলেন, সেটা না হলেও অন্য ধরণের লেখা আর পড়ায় আমি দিবস রজনী কাটাতে থাকি।
কবিদের ঠিকানায় আর বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের ঠিকানায় সেঁজুতি পাঠাবার কিছুদিন পর থেকেই প্রচুর চিঠি আসতে থাকে, চিঠির সঙ্গে কবিতা। কবিতা পড়, শুদ্ধ কর, পরের সংখ্যায় ছাপার জন্য তুলে রাখো। সেঁজুতিকে করেছি ষৈনমাসিক। কিন্তু ইচ্ছে করে কালই ছেপে ফেলি। দীর্ঘ তিনটে মাসের অপেক্ষা সহ্য হয় না। চিঠি আসে এত, বাবা আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে মাকে বলেন,যত্র তত্র পত্রমিতালি কি ও বন্ধ করে নাই এখনো? যত্র তত্র পত্রমিতালি বন্ধ হয় বটে, যত্র তত্র কবিতা লেখা বন্ধ হয় না, ও চলে। বারান্দার টেবিলে পড়ে থাকা একটি সেঁজুতি তিনি একদিন আলগোছে সরিয়ে নেন। দুপুরে খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়েন সেঁজুতির সবগুলো কবিতা। পড়া হলে সেটি পকেটে নিয়েই বাইরে যান। কি হতে যাচ্ছে ঘটনা তা আঁচ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। রাতে তিনি মাকে নিজের ঘরে ডেকে পাশে বসিয়ে সেঁজুতি থেকে একটি কবিতা শুনিয়ে বলেন, দেখ এইখানে কবি বলতাছে কাগজ হইল মাটি, কলম হইল কোদাল, আর কবিতা লেখা হইল নিজের কবর খোঁড়া। ঠিক কইছে না? কবিরা নিজেরা খোঁড়ে নিজের কবর, এই কথা তো এক কবিই কইল।
