চন্দনাকে দীর্ঘ দীর্ঘ চিঠি লেখা ছাড়া ছাদে, ঘরের কোণে, বারান্দায়, মাঠের ঘাসে, ভোরের শিউলিতলায়, সেগুন গাছের ছায়ায় বসে একটি জিনিসই তখন হয়, কবিতা লেখা। দেশের বিভিন্ন শহর থেকে কবিতা পত্রিকা আসে আমার ঠিকানায়। পশ্চিমবঙ্গের নানা অঞ্চল থেকেও আসে কবিতার ছোট কাগজ। এগুলো এক ধরনের শেকলের মত, একটি থেকে আরেকটি, আরেকটি থেকে আরেকটি করে করে ব্যাপ্ত হতে থাকে। ছোট কবিতা পত্রিকায়, ঢাকার সাপ্তাহিক পত্রিকাতেও পাঠাই কবিতা। কোথাও না কোথাও ছাপা হতে থাকে কিছু না কিছু একদিন আমার ভাবনার পুকুরে ঢিল পড়ে, কোত্থেকে পড়ে, কি করে পড়ে কিছু না জেনে আমি পুকুর পাড়ে নিস্পন্দ বসে থাকি। পুকুরের ছোট ছোট ঢেউ ক্রমে বড় হতে হতে পায়ে আছড়ে পড়ে, আমার শরীর ভিজতে থাকে জলে। আমি তবু নিস্পন্দ বসে থাকি। নিস্পন্দ আমাকে দেখতে লাগে, ভেতরে আমার উঁকি দিচ্ছে একটি ইচ্ছের অঙ্কুর। আমি তো চেষ্টা করলে নিজেই একটি কবিতা পত্রিকা বের করতে পারি। পারি না কি? পারি। মন বলে পারি। ডলি পালের বাড়ি থেকে ভেসে আসা উলুধ্বনির শব্দ আমাকে সচকিত করে। দশদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। কী নাম দেব পত্রিকার? কী দেব নাম? আমাকে দুদিন কিংবা তিনদিন ভাবতে হয় না। মন বলে, সেঁজুতি! হ্যাঁ সেঁজুতিই। সন্ধ্যাপ্রদীপ। চন্দনার কাছে চাওয়ামাত্র কবিতা পাঠিয়ে দেয়, ইশকুল শেষ হওয়ার পরও বাংলার শিক্ষিকা সুরাইয়া বেগম আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, তাঁকে দিয়ে নতুন একটি কবিতা লিখিয়ে নিই আর ছোটদাকে বলে শহরের কিছু কবির কবিতা আনিয়ে শখের বশে সুখের ঘোরে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলি সেঁজুতির, কিছু টুকরো খবর শেষের পাতায়, সাহিত্যের সাহিত্যিকের, সাহিত্যের কোন ছোট পত্রিকা কোত্থেকে কারা বের করেছে, কেমন হয়েছে ভাল না মন্দ, মন্দ হলে কেন ভাল হলে তাই বা কেন, এসব। দাদা বললেন আমার একটা কবিতা ছাপা। তাঁর কবিতার খাতা থেকে সবচেয়ে ভাল কবিতাটি নিই। আমার খবরটাও লেইখা দে। লেইখা দে পাতা পত্রিকার সম্পাদক ফয়জুল কবীর নোমানএর প্রথম কবিতার বই পারাপার শিগরি বেরোচ্ছে। তাও লিখে দিই। দাদা খুশি। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাজানোর সময় হয়ে এল, কে টাকা দেবে, কে প্রেসে যাবে, কে ছেপে আনবে সেঁজুতি! পারাপার নামে দাদা কোনও বই লেখা শুরুই করেননি, তবু তাঁর অনুরোধে খবরটি দেবার কারণেই সম্ভবত তিনি বললেন ঠিক আছে যা, আমি তর এই সেঁজুতি ছাপার খরচ দিয়াম নে। প্রেসের সবাইরে তো আমি চিনি, পাতা পত্রিকা ছাপানোর কারণে। দাদার কানের কাছে পিনপিন করে বেজেই চলল আমার গানা ও দাদা, ও দাদা, তুমি তো কইছ ছাপাইয়া দিবা, দেও।
ধৈর্য ধর। ধৈর্য ধর।
ধৈর্য আর কত ধরাম?
আরও ধৈর্য ধর। আরও।
কতদিন?
আরও কিছুদিন।
ধৈর্য ধরা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। দিন দিন অস্থির হতে থাকি। শেষ অবদি ছোটদার হাতে পাণ্ডুলিপি দিই। ছোটবাজারের একটি ছাপাখানায় সেঁজুতি দিয়ে আসার পর ছোটদার লেজে লেগে থাকি, কবে ছাপা হবে? ছাপার দেরি আছে। কত দেরি? সামনের মাসে ছাপা হইব। উফ এত দেরি! প্রেসের কি আর কাজ নাই নাকি?
আমারে একদিন নিয়া যাইবা ছাপাখানায়? তুই যাইতি কেন? আমিই ছাপাইয়া নিয়া আসব।
ছাপাখানায় যাওয়ার ইচ্ছেজ্ঞটর গলা ধরে দাদা ধাক্কা দেন, প্রেসে যাইবি কেন?
কেমনে ছাপায় দেখতে ইচ্ছা করতাছে।
মেয়েরা প্রেসে যায় না।
কেন যায় না?
যায় না।
কোনও কারণ আছে?
মেয়েদের প্রেসে যাইতে হয় না।
কেন হয় না? গেলে কি হয়?
অসুবিধা হয়।
কি অসুবিধা? মাইনষে চাক্কাইব?
চাক্কাইব না হয়ত, কিন্তু হাসব।
হাসব কেন? হাসির কি আছে? আমি সম্পাদনা করতাছি পত্রিকা, আমি কেন প্রেসে যাব না?
সম্পাদনা ঘরে বইয়া করা যায়। পুরুষমানুষের মত প্রেসে দৌড়ানোর দরকার নাই। দাদা আমার উৎসাহ নিবৃত্ত করতে পারেন না। ছোটদার সঙ্গে প্রেসে আমি যাই যে করেই হোক যাই। কালো কালো কাত করা ঘরকাটা বড় টেবিল মত, তার সামনে বসে লোকেরা এক একটি ঘর থেকে এক একটি ক্ষুদ্র বণর্ নিয়ে লোহার পাতে রাখছে। তুমি লিখতে গিয়ে, ত এর ঘর থেকে ত তুলে,ুর ঘর থেকেু তারপর একটি িনিয়ে তার পাশে ম বসাচ্ছে। এক তুমিতেই চারবার হাত বাড়াতে হয়। কি করে লোকেরা জানে কোন ঘরে ত আছে, কোন ঘরে ম, কি করে হাতগুলো এত দ্রুত সঞ্চালিত হয়! ইচ্ছে করে সারাদিন বসে প্রেসের কাজ দেখি, দেখি কি করে অক্ষর জুড়ে শব্দ বানায় ওরা। ছাপার মেশিনটি ঘড়ঘড় শব্দে ছেপে যাচ্ছে বিড়ির কাগজ, আগরবাতির কাগজ, মলমের কৌটোর কাগজ,বিয়ের কাডর্, রাজনৈতিক পোস্টার। সেঁজুতির পাণ্ডুলিপি দেখে প্রেসের মালিক হরে কৃষ্ণ সাহা অন্যরকম কিছুর স্বাদ পেয়ে অন্যরকম হাসি হাসলেন। ছেপে দেবেন শীঘ্র বললেন। প্রতি ফর্মা দুশ টাকা। কেবল দুশ টাকাই কি! আছে কাগজ কেনার টাকা। বাড়ি ফিরে শিশিবোতলকাগজঅলার কাছে বাড়িতে আস্ত অনাস্ত যত কাগজ আছে, পুরোনো চিত্রালী পূর্বাণী রোদে শুকিয়ে উই ঝেড়ে, পুরোনো রোববার সন্ধানী বিচিত্রার মায়া কাটিয়ে বিক্রি করে টাকা জমা করি। মার আঁচলের খুঁট থেকেও কিছু অর্জন হয়। এদিক ওদিক থেকে আরও কিছু যক্ষের ধন মুঠো করে ছোটদাকে সঙ্গে নিয়ে হরে কৃষ্ণ সাহার ছাপাখানার পাশেই কাগজের দোকান থেকে পছন্দ করে কাগজ কিনে দিয়ে আসি ছাপাখানায়। এরপর বাড়িতে ছোটদা প্রুফ নিয়ে এসে প্রুফ কি করে দেখতে হয় শিখিয়ে দেন। নিজে তিনি পত্রিকায় কাজ করেন, জানেন। ছাপার টাকার জন্য দাদার ওপর ভরসা করি, একবারে টাকা পাওয়া না গেলেও কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা মেলে।
