ফালাইতাম কেন? কি হইছে?
ফালা। ফালা। এক্ষুনি ফালা।
কি এইটা?
হারামজাদা কুত্তা বেডা পচা জিনিস পাডাইছে, ফালা।
কি ফেলব তা না বুঝে আমি বিমূঢ় বসে থাকি। কৌতূহল আমাকে এমন গিলে খায় যে জিনিসটির দিকে আমি না চাইলেও আমার হাত চায় যেতে। চন্দনা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার হাত সরিয়ে নেয় জিনিসটি থেকে। জিনিস আমার হাত থেকে কোলে, কোল থেকে মুখ থুবড়ে পড়ে মাটিতে।
কি এইটা?
বোকা চোখদুটো একবার মাটির জিনিসে, আরেকবার চন্দনায়, চন্দনার বিবমিষায়। বুঝস না কি এইটা?
না তো!কি এইটা?
এইটা প্যান্টি। শিগরি ফালাইয়া দিয়া আয়।
দৌড়ে গিয়ে আবর্জনার স্তূপে প্যাকেটসহ উপহারটি ফেলে দিই। বিবমিষা আমার দিকেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে আসতে থাকে। চন্দনা মাঠের কিনারে বসে সত্যি সত্যি উগলে আসা বমন ত্যাগ করে।
চন্দনার এমন হয়।কামনা বাসনা শ্রীমতী নামের পর্নো ম্যাগাজিনগুলো সম্পর্কে ও বলে, আরে শালা একদিন পড়ছিলাম, ঘেন্নায় বমি করলাম। তারপর বাংলা সাবান দিয়া হাত ধুইয়া আবার লাক্স সাবান দিয়া হাত ধুইলাম। খাওয়ার সময় মনে হইতাছিল পেটে না আবার ঢুইক্যা যায়। সেই হাতে আর কোনওদিন ওসব নোংরা জিনিস ওঠেনি। আমরা যে জীবনের স্বপ্ন দেখি, সে জীবনে ন্যাংটো হওয়া নেই। পুরুষের শরীর চন্দনার কাছে বড় কদাকার একটি জিনিস। তবে ভালবাসায় ভীষণ রকম বিশ্বাসী সে।
চন্দনা প্লেটোনিক লাভ এর কথা বলতে শুরু করেছে। জিজ্ঞেস করেছি, এইটা আবার কি?
এইটা হইল লাভ, ভালবাসা, যেই ভালবাসায় শয়তানি নাই, নোংরামি নাই।
চন্দনার উজ্জ্বল দুটি চোখে আমার মুগ্ধ দুটি চোখ।
০৭. সেঁজুতি
আমাকে হঠাৎ একা করে দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর চন্দনা চলে গেল। চন্দনা তো আর গেল না, ওকে ঘাড় ধরে নিয়ে গেলেন ওর বাবা ডাক্তার সুব্রত চাকমা, পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি, চন্দনাকে জন্ম দেবার পর দু দুটো ছেলে-বাচ্চার জন্ম দিয়ে স্বামীর আশা পূরণ করেছিলেন যে মলিনা সেই মলিনার মলিন স্বামী; কুমিল্লায়। কুমিল্লা যাওয়ার আগে দাদা আমাকে আর চন্দনাকে নিয়ে ঢাকা বোর্ড থেকে সার্টিফিকেট তুলতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সকালে যাওয়া বিকেলে ফেরা। মতিঝিলে টাই টুং চিনে রেস্তোরাঁয় দুপুরে আমাদের খাওয়াতে নিয়ে দাদা বললেন, কি চন্দনা, তোমরা চোখ কান খোলা রাখো না কেন?
কেন,কি দেখি নাই কি শুনি নাই?
একটা সুন্দরী মেয়ে দেখবা না আমার জন্য? কলেজে দুইটা বছর পড়লা!
আমরা ছেলেদের দিকে তাকাইয়াই সময় পাই না। মেয়েদের দিকে কখন তাকাবো! চন্দনা হেসে ফেলে। অনাত্মীয় পুরুষদের মধ্যে চন্দনা আমার দাদাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি য়চ্ছন্দ। চাকমা রাজা দেবাশীষের কথা মনে করে চুক চুক দুঃখ করে দাদা বলেন, যে ভুলটা তুমি করছ, পরে কিন্তু এর জন্য পস্তাইবা। একটা রাজারে পাত্তা দিলা না!
চন্দনা জোরে হেসে ওঠে।
দাদার দুঃখ শেষ হয় না। আমরা রাঙামাটিতে গেলে রাজার বাড়ির অতিথি হইয়া থাকতে পারতাম! এই সুযোগটা নষ্ট কইরা দিলা।
চন্দনা আবারও হাসে।
না জানি তোমার কপালে কোন ফকির আছে!
রাঙামাটির গল্প বলতে গিয়ে দেবাশীষের চেয়ে ও বেশি বলে চেরাগ আলীর কথা। রাঙামাটিতে এক দারোগা আছে, দারোগার নাম চেরাগ আলী, চেরাগ আলী বলেন, তিনি দিনেও জ্বলেন রাতেও জ্বলেন। চন্দনা খানিকপর গম্ভীর হয়ে বলে, তবে চেরাগ আলী ইদানিং কিছু কম জ্বলেন, কারণ তাঁর চাকরিটি চলে গেছে। যদিও অল্প সময় ঢাকায়, তবওু চন্দনা আর আমি ময়মনসিংহের চেনা পরিবেশ থেকে দূরে যেতে পেরে সুখের দোলনায় দুলি। কুমিল্লা যাওয়ার আগে বলেছিলাম চন্দনাকে, যাইস না, তুই গেলে বাঁচবাম কেমনে? চন্দনারও একই প্রশ্ন ছিল, আমাদের প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই কারও কাছে। সুব্রত চাকমাকে চন্দনা এমনও বলেছে সে ময়মনসিংহ ছেড়ে যাবে না, এখানে আমার সঙ্গে অবকাশে থেকে লেখাপড়া করবে।তিনি রাজি হননি। চন্দনার আধবোজা চোখ লাল হয়ে ছিল যাবার দিন। আমার কানে কানে বলেছে, দেখিস আমি পলাইয়া একদিন চইলা আইয়াম তর কাছে। আমরা দুইজন সারাজীবন একসাথে থাকবাম। কুমিল্লা থেকে দিনে দুটি তিনটি করে চিঠি লিখছে চন্দনা। লম্বা লম্বা চিঠি। প্রতিদিনের প্রতিটি ঘটনা, দুর্ঘটনা। প্রতিদিনের মন কেমন করা। প্রতিদিনের নিঃসঙ্গতা। প্রতিদিনের হাহাকার। বাড়ির কাছে কৃষ্ণচুড়া ফুটে লাল হয়ে আছে, গাছটির দিকে যখনই তাকায় ও, আমাকে মনে পড়ে। মনে পড়ে ফেলে যাওয়া জীবনের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কুঁড়ি, প্রতিটি ফুল। জীবনটি ওর আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। চন্দনার এই যাওয়াকে আমার যাওয়া বলে মনে হয় না। মনে হয় আবার ফিরে আসার জন্য গেছে সে। এ যাওয়া সারাজীবনের মত চলে যাওয়া নয়। আমাদের আবার দেখা হবে, আমরা আবার দুলব আনন্দ দোলনায়। আবার সেই নৌকোর গলুইয়ে বসে আমি আকাশের রং দেখব, আর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে চন্দনা বৈঠা বেয়ে চলে যাবে বহু দূরে, সীমানা পেরিয়ে। এমন একটি জগতে যেখানে কোনও পাপ নেই, পঙ্কিলতা নেই, হিংসা নেই, ঘণৃা নেই, নিষ্ঠুরতা নির্মমতা নেই, যেখানে কোনও অন্যায় নেই, বৈষম্য নেই,যেখানে কোনও রোগ নেই, শোক নেই, মৃত্যু নেই। যেখানে শুভ্রতার ঘ্রাণ নিতে নিতে সুন্দরের সঙ্গে বাস করব আমরা, ভালবাসা আমাদের চৌহদ্দি ছেড়ে কোথাও যাবে না। চন্দনা ভাল না লাগায় ভগু তে ভগু তে লেখে আমার ভাল লাগছে না, আমি যেন জাগতিক সবকিছুর ঊর্ধে। ভাল লাগা ভালবাসা এসব শব্দগুলো সব পুরোনো মনে হচ্ছে। আমি তোকে বোঝাতে পারছি না। কেবল মনে হচ্ছে আমি যেন আমাতে নেই। আজ সারাদিন মন খারাপ, সামান্য আঘাত লেগে মেহগিনি পাতাগুলো যখন ঝিরঝির ফুলের মত প্রশান্তির মত ঝরে পড়ে তখন ইচ্ছে করে কোনও জিনস জ্যাকেটের পিঠে মাথা রেখে হোন্ডায় চড়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাই। আমি জানি, কি নির্মম ভাবে জানি অথচ বলিনি কারও কাছে এসব আমার জন্য কেবল অলীক স্বপ্ন মাত্র। আমাকে আঘাত কর তুই, চোখে জল না থাকলে আমি ভাল থাকি না তো, কিছুতেই না, আসলে আমার কি হয়েছে আমি তোকে বলতে পারব না, তাহলে জেনে যাবে, সবাই জেনে যাবে। আমি কেবল ছটফট করছি, আকুল হয়ে মরছি অথচ কি জানিস পুরো ব্যাপারটা তুই জানবি না, নেভার, তুই আমার এত আপন, এত ঘনিষ্ঠ, হৃদয়ের এত কাছে থাকিস তুই, তবু বলা হবে না। হায়রে মন। এই মনটাই আমার শত্রু। সব যখন ঠিকঠাক চলে, ঠিক সে মুহূর্তেই আমি বদলে যাই। মন নামক এই পদার্থটি বিট্রে করে বসে আমার সঙ্গে। আমি ভাল নেই, একদম না, চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়, একধরনের ঈর্ষায় হিংসেয় আমি ছিন্নভিন্ন হই অবিরত, অথচ বোঝাতে পারি না। বুঝতেও পারি না এই ঈর্ষা কার বিরুদ্ধে, এই দ্বন্দ ্ব কেন। তবে কি আমি আমার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই? আমি কি আমাকে আর ভালবাসি না? কি জানি .. যদি কোনও এক নীল চোখের গ্রীক যুবক, যদি কোনও এপোলো আমাকে ভালবাসার কথা বলত ..! আমার ভেতর সবকিছু ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে। আমি আর কোনওকিছুতে আনন্দ পাই না। মনে পড়ে আসামী হাজিরের সদানন্দ কি এক অব্যক্ত যনণ্ত্রায় আর্তনাদ করত, মনে কর তেমন কোনও অব্যক্ত যন্ত্রণায় আমি আর্তনাদ করছি। এই একঘেয়ে জীবন আর ভাল লাগে না। তুই আমাকে মনোহর উত্তরণে নিয়ে যেতে পারবি? মন কাঁদে, তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার, তাই জনম গেল শান্তি পেলি না রে মন মনরে আমার। বুঝতে পারিস কি বললাম? বুঝিস না? আমি তোকে কাছে পেতে চাইছি। আমি কেবল তোকেই চাই, কতকাল দেখিনি তোকে। এই সংসার এই মায়ার বন্ধন ছেড়ে চল ঘুরে বেড়াই বাউলের একতারা নিয়ে, তুই হবি বৈষ্ণব আমি বৈষ্ণবি, টুং টাং শব্দ তুলে আমরা গাইব দুজনেই, পাখি ছটফটাইয়া মরে, শিকল ছিঁড়িতে না পারে, খাঁচা ভাঙিতে না পারে, পাখি ছটফটাইয়া মরে। অথবা চোক্ষেরই নাম আরশিনগর, একদিন ক্ষইয়া যাবে, পোড়া চোখে যা দেখিলাম তাই রইয়া যাবে।
