আমি রা করি না।
হেসে বলে, ন্যাংটো।
যে যাই শব্দটি আমার জিভের ডগায় আসে আর যায় করছিল, সেটি এবার এসে যায়।
আমি যাই বলে য়চ্ছন্দে চলে যাই। পেছনে হতভম্ব বসে থাকে সেলিম।
ছোটদা সেদিনই খবর নিয়ে এলেন,তুই নাকি তাজমহলে গেসিলি?
কে কইল তুমারে?
কোন বেডার সাথে নাকি বইয়া আলাপ করছস? শহরে রইটা গেছে খবর। সীমা ছাড়াইয়া যাইতাছস।
সীমা ছাড়িয়ে গেছি তা বুঝি। কিন্তু সীমা ছাড়ানো মেয়েটিকে একটি গণ্ডমূখর্ বলে মনে হয়। কেন সেলিমের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি সে! রেস্তোরাঁ থেকে হঠাৎ চলে গিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছে? সে কি বোঝাতে চেয়েছে যে সে বাজে মেয়ে নয়, সে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দেয় না!বড় ভদ্র ঘরের মেয়ে, ভাল মেয়ে, তাই ছেলেপিলের সঙ্গ এড়িয়ে চলে! সেলিমের সঙ্গে নিতান্তই বসতে হয়েছে সে ঢাকা থেকে এতদূর এসেছে বলে, নয়ত এতদূর পা বাড়াত না! এই কী! নাকি ওই ন্যাংটো শব্দটি শুনে তার গা ঘিনঘিন করেছে! পরদিন দুটো টাকা খামে ভরে একটি চিঠি পাঠিয়ে দেয় সে সেলিমকে—আমি খুব দুঃখিত, চায়ের পয়সা মিটিয়ে আসতে ভুলে গিয়েছিলাম, এই নাও পয়সা। বোধহয় এ বোঝাতেই যে সে পরখাওয়ইয়্যা নয়! না হলে দুটো টাকা এমন কোনও টাকা নয় যে সেলিমের পকেট থেকে গেলে সেলিম সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে, আর তাকে ডাকে টাকা পাঠাতে হবে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায়!
দেখা হওয়ার পর সেলিমের চিঠিতে আকস্মিক ভাবে আবেগ বেড়ে ওঠে। সমুদ্রে আরও ঢেউ ওঠে। আমি পিছু হটছি, কারণ তার ঠোঁটকে ঠোঁট বলে মনে হয়নি, মনে হয়েছে আস্ত না হলেও আধখানা তন্দুরের রুটি। সেলিমকে লেখা কমিয়ে দিতে থাকি, একদিন সেলিমও লেখা বন্ধ করে দেয়। কোনও চিঠি নেই, নেই তো নেইই। অনেকদিন পর হঠাৎ সুইৎজারল্যান্ড থেকে লেখা একটি চিঠি পাই সেলিমের, যদি কোনওদিন পারি যেন জুরিখ যাই, পৃথিবীতে নাকি আশ্চর্য সুন্দর এক শহর জুরিখ। জুরিখ নামটি দেশবিদেশ-লুডুর কথা মনে করিয়ে দেয়। জুরিখ আসিলে জুরিখ হাসপাতাল দর্শনে যাইতে হইবে, পাঁচ না পড়িলে গুটি বাহির হইবে না, আমার গুটি প্রায়ই জুরিখ গিয়ে পৌছত, আর পাঁচ পড়ার অপেক্ষায় থাকত। চিঠি কেবল সেলিমকে নয়, অনেককেই কমিয়ে দিয়েছিলাম। তবে কমানোর আগে চিঠির ওপারের মানুষটিকে বরাবরই রাজপুত্র মনে হয়েছে, রূপে গুণে এক নম্বর মনে হয়েছে। হাতে গোনা কিছু পত্রমিতা তখনও আছে আমার,কারও সঙ্গে বন্ধুত্বের বাইরে কোনও সম্পর্কে গড়ে ওঠেনি। কেউ লাফ দিয়ে ময়মনসিংহে আমাকে দেখতে চলে আসার বায়না ধরে না। ওই তাদেরই একজনকে রাতের পড়া সেরে খাওয়া সেরে বাবার বিছানায় বুকের নিচে বালিশ দিয়ে শুয়ে,একটি শাদামাটা কেমন আছ ভাল আছি জাতীয় কিছু লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দরজায় বাবার আসার শব্দ পেয়ে ঘুম- চোখে বাবার বিছানা ছেড়ে নিজের বিছানায় শরীরটিকে ছুঁড়ে দিই। চিঠি বাবার বিছানার ওপর ওভাবেই পড়েছিল। বাবা মধ্যরাতে আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে মেঝেয় ধাক্কা দিয়ে ফেললেন। ফেলেই তাঁর জুতো খুলে পেটাতে শুরু করলেন, কেন পেটাচ্ছেন কী অন্যায় আমি করেছি তার কিছু আমাকে না জানিয়ে। আমার বোঝার ক্ষমতা নেই কী কারণে বাবা এমন উন্মাদ হয়েছেন। আমার অস্ফুট বাক্য কী করছি আমি, কী হইছে? হারিয়ে যায় বাবার তর্জনের তলে। আস্ত একটি দৈত্য হয়ে উঠলেন তিনি। চুলের মুঠি ধরে শূন্যে ছুঁড়ে মারলেন, উড়ে গিয়ে আবার বাটার শক্ত জুতো পিঠে, ঘাড়ে, মাথায়, বুকে, মুখে। বাবা পেটান আমাদের, ঘুমের মেয়েকে তুলে এভাবে মধ্যরাতে আগে কখনও পেটাননি। বাবাকে ফেরাতে গিয়েছিলেন মা, মাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ফেলে দিয়ে আমাকে খামচে ধরেছেন আবার। হাতে পায়ে শক্তি ফুরোলে তিনি থেমেছেন। আমাকে মেঝে থেকে তুলে মানুষটার আন্দাজ বরাদ্দ কিচ্ছু যদি থাকত! মাথায় মারলে মাথা যে নষ্ট হইয়া যাইব তা জানে না। এইভাবে মারার চেয়ে একেকবারে মাইরা ফেলায় না কেন। মাইরা ফেললেই তো ঝামেলা যায় বলতে বলতে বিছানায় শুইয়ে দিলেন মা। সারারাত পাশে বসে ইস্ত্রির তলে কাপড় রেখে গরম করে করে আমার শরীরের নানা জায়গায় স্যাঁকা দেন। ঘুম চোখে ছিল না আমার, এক ফোঁটা জলও কিন্তু ছিল না। বিছানায় পড়ে থাকা আমার চিঠিটিই এসবের কারণ, ঠিক বুঝি। বাবা মেরে আমার চামড়া তুলে ফেলুন, আমার হাড়গোড় সব ভেঙে ফেলুন, তবু এতে আমার এই ধারণা মরে যায়না যে ছেলে মেয়েতে বন্ধুত্ব হয়, ছেলেদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে বা প্রেমের সম্পর্কে ছাড়াও কেবল বন্ধুত্বের সম্পর্কে হতে পারে, মেয়েতে মেয়েতে অথবা ছেলেতে ছেলেতে যেমন হতে পারে।
আমার ঠিকানা এখন আর ছোটদার বন্ধুর কাগজকলমের দোকান নয়, পোস্ট বক্স নম্বর ছয়। তাঁর নিজের চিঠি কাগজকলমের দোকান থেকে মার যাচ্ছে আশংকা করে ছোটদা পোস্টাপিসে একটি বাক্স নিয়েছেন, ওটিই আমি আর ছোটদা ব্যবহার করতে শুরু করেছি। বিচিত্রা থেকে আমার কাছে ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিভাগীয় সম্পাদকের চিঠি আসে। অনুরোধটি পুলকিত করে আমাকে কিন্তু বিজ্ঞাপনের পথ মাড়ানোর কোনওরকম ইচ্ছে আমার জাগে না। যদিও ভুলে থাকি বিজ্ঞাপনের জগত, জগতের আর লোকেরা আমাকে ভোলে না। আমি নেই, তবু আমাকে আছে করে রাখে বিজ্ঞাপনের পাতায়। নববর্ষের নামকরণের সময় হারিয়ে যাওয়া আমার জন্যও একটি নাম বরাদ্দ থাকে। কেউ নাম দেয় সুগন্ধী গোলাপ, কেউ দেয় গোলাপ তো নয়, গোলাপের কাঁটা। ঘণৃা এবং ভালবাসা দুটোতেই ওরা দোলায় আমাকে, যদিও ওদের কারও সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমার উল্লেখ না হলে অনেকের চলে না। বিস্তর চিঠি আসে আমার ঠিকানায়। বেশির ভাগই চিঠিতেই বন্ধুত্বের আহবান। কিছু অন্ধ অনুরাগীরও আবির্ভাব ঘটেছে। কলেজে আমার এক ক্লাস নিচে পড়া শাহিন প্রতিদিন ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আমার অপেক্ষায়। ফুলের সঙ্গে চিঠি, আমাকে সে দেবী বলে মানে। মেয়েটি বড় লাজুক, নতমুখে নতচোখে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, এক হৃদয় উষ্ণতা আর এক শরীর শৈত্য নিয়ে আমি নিশ্চপু , মেয়েটি কি জানে তার চেয়েও বেশি লজ্জাবতী তার দেবী! চট্ট গ্রাম থেকে পাহাড়ি কুমার নামে এক ধনকুবের চিঠি লেখে সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে, সগু ন্ধে ডোবানো নীলাভ কাগজে। চন্দনা সেদিন অবকাশে, পাহাড়ি কুমারের উপহারের প্যাকেটটি যেদিন দিয়ে যায় ডাকপিয়ন। আমরা দুজন মাঠে বসে গল্প করছিলাম, প্যাকেট আমাদের গল্প থামিয়ে দেয়। যেহেতু এটি প্যাকেট, যেহেতু এটি আমার হাতে দিয়ে আমার সই নিতে হবে, তাই ডাকপিয়ন আরোগ্য বিতানে না নিয়ে প্যাকেট বাড়িতে এনেছে। বড় প্যাকেটের ভেতরে ছোট প্যাকেট, ছোট প্যাকেটের ভেতর আরও ছোট প্যাকেট, সেই প্যাকেটের ভেতর আরেক, শেষ প্যাকেটের ভেতর থেকে প্রাণভ্রমরাটি বেরিয়ে আসতেই চন্দনা লাফিয়ে উঠে এক হাত দূরে ঝটিতি সরে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ফালা এইটা।
