পরীক্ষা সামনে। সাধুতে যদি হায়ার সেকেন্ডারি, চলতিতে ইন্টারমিডিয়েট, আর পুস্তকি বাংলায় উচ্চ মাধ্যমিক। দেবনাথ পণ্ডিত সপ্তাহে তিনদিনের বদলে পাঁচদিন আসতে শুরু করেন। তিনি তো পড়াতে আসেন না, আসেন কিলিয়ে আমাকে মানুষ বানাতে। বাবার মত দেবনাথ পণ্ডিতেরও চোখ যায় ছোটখাট কাগজপত্রে। কোনও এক পত্রমিতাকে লেখা শেষ না হওয়া চিঠি অঙ্ক বইয়ের ভেতর থেকে একদিন টুপ করে পড়ে। পড়ে যাওয়া চিঠিটি সরাতে গেলেই দেবনাথ পণ্ডিত খাবলা মেরে চিঠিটি নিয়ে নেন, আগাগোড়া পড়েন চিঠি, পড়ে শার্টের বুক পকেটে রেখে দেন। এ কি! তিনি ঠিক বাবার মতই আচরণ করছেন, এই চিঠির কারণে কি এখন উঠোনের খড়ি ভাঙবেন আমার পিঠে! খানিক পর পর তিনি নিজের বুক পকেটে হাত দিয়ে অনুভব করছেন আধলেখা চিঠির অস্তিত্ব, চিঠিটি কোথাও উড়ে না গিয়ে যে পকেটেই আছে, তা জেনে একধরণের আনন্দ হচ্ছিল দেবনাথ পণ্ডিতের। সেই আনন্দ জ্বালা ধরানো, পেচ্ছাব পাওয়া কিন্তু ঠিক পাওয়া নয়, লোমকপূ অনেকটা দাঁড়িয়ে যাওয়া, অনেকটা বসে যাওয়া, মাথা ঝিমঝিম করেও না করার আনন্দ। দেবনাথ পণ্ডিতের পড়ানো হয় না, ডানে বামে নড়েন, সামনে পেছনে নড়েন। মন উতলা। আমাকে যে অঙ্ক করতে দিলেন, তা সারা হল আমার, অঙ্কে কোনও ভুল নেই। হঠাৎ দশ আঙুলে পদার্থবিজ্ঞান বইটি আঁকড়ে ধরে, যেন বইটির পাখা আছে, আঙুল ঢিলে করলেই উড়ে যাবে, পাতা উল্টো কঠিন কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন, সেসবেরও, কার কপৃায় জানি না, সঠিক উত্তর দিই। রসায়নএও একই ভাগ্য আমার। এরপর অঙ্ক,রসায়ন পদার্থবিজ্ঞান বই তিনটে দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড এক ঘুসি মারলেন মাথায়, কপালের ডানে। কেন! না কোনও কারণ নেই। বললেন কাইল যে অঙ্কগুলা দিয়া গেসিলাম করতে, তা করছ না কেন!
করছি তো।
করছ তো দেহাও না কেন? মন কই থাহে?
এই মোক্ষম সুযোগ আধচিঠির শাস্তি দেওয়ার। আমি অঙ্কের খাতা সামনে মেলে ধরলাম। মেলে ধরার পরও পিঠে আচমকা একটি কিল। ফুসফুস ক্যাৎঁ করে ওঠে। মার্জিন রাইখা অঙ্ক করার কথা আর কত কইয়া দিতে হইব?
মার্জিন রেখে অঙ্ক করার কথা এই প্রথম বললেন তিনি। যা হোক। এবার আসল কথা পাড়লেন।
চিঠি কারে লিখছ?
কোন চিঠি?
এবার একটি চড় উড়ে এল গাল বরাবর।
কোন চিঠি যেন জানো না? এই চিঠি।
বুক পকেট থেকে বের করলেন অর্ধেক পাতায় লেখা চিঠিটি।
জুয়েল কেডা? কই থাকে? কী করে?
ঢাকায় থাকে। কী করে জানি না।
জানো না? আমার সাথে ফাতরামি কর?
ফাতরামি আমি দেবনাথ পণ্ডিতের সঙ্গে করতে যাব, এমন সাহস আমার নেই। দেবনাথ পণ্ডিত তাঁর বিশাল শরীর, বিশাল বপু কলাগাছের গায়ের মত বাহু, আর শক্ত সাগর কলার মত আঙুল সামনে নিয়ে বসে থাকেন, আর আমি যতটা সম্ভব মৃত তৃণের মত পড়ে থাকি তাঁর পায়ের কাছে। চিঠিটি ছিঁড়ে টুকরো করে আমার মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তিনি বেরিয়ে যান। দেবনাথ পণ্ডিতের কিল চড়, বাবার ধমক, মার ঘ্যানঘ্যান, ছোটদার নিরানন্দ, গীতার অভিমান, দাদার দাদাগিরি এসবের মধ্যে আমি একা বসে থাকি। মুখ গুঁজে রাখি বইয়ে। পরীক্ষা সামনে। পরীক্ষা সামনে তা জানি, কিন্তু ছোটদার বন্ধুরা বাড়িতে বেড়াতে আসে, জ্যোতির্ময় দত্তের ছেলে বাবুয়া দত্ত, তকবীর পত্রিকার সম্পাদকের ছেলে পলক ফেলা যায় না এমন সুদর্শন তফসির আহমেদ, লেডিকিলার বলে খ্যাত সাহেব কোয়ার্টারে থাকা ডিসির ছেলে সোহান, যাকেই দেখি তার প্রেমে পড়ে যাই মনে মনে, মনে মনে তার মনের কথা শুনি,কোথায় পাব কলসি কন্যা কোথায় পাব দড়ি, তুমি হও গহীন গাঙ, আমি ডুইবা মরি। অথচ আমার দিকে ফিরে তাকায় না কেউ, নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে কৎু সিত মেয়ে বলে মনে হতে থাকে।
চিত্রালী পুর্বাণী যেমন বন্ধ হয়, পত্রমিতাদের কাছে চিঠি লেখাও ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। কেবল ভাল কিছু সুন্দর হাতের লেখার, কাব্যময় ভাষার চিঠিগুলোর উত্তর দিই। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র কামরুল হাসান সেলিম চিঠি লেখে আশ্চর্য সুন্দর, যেন আকাশপার থেকে স্বপ্নের কথা বলছে। বাছাইয়ে সেলিমকে রাখি, চিঠি লিখতে থাকি কোনওদিন সমুদ্র না দেখা মেয়ে সমুদ্রপার থেকে। যেন এ জগতের নয়, অন্য কোনও জগতে আমরা আপন দুজন মানুষ মুখোমুখি বসে স্বপ্নের কথা বলছি। ওই স্বপ্নের জগতে কোনও মানুষ নেই, ঘরবাড়ি নেই, কেবল আকাশ আর সমুদ্র, সমুদ্রের ধারে নানার রঙের ফুল, প্রজাপতি, আকাশ জুড়ে কেবল সপ্তবণর্ রং, তুলোর মত মেঘ আর লেজঅলা পাখি। এভাবেই চলতে পারত, কিন্তু একদিন হঠাৎ, হঠাৎই কলেজ গেটের কাছে এক দীর্ঘাঙ্গ যুবক এসে সামনে দাঁড়ায়, আমার মাথার চুল তেলে চোবানো, শক্ত করে বেণী গাথাঁ, নিশ্চিত শাকচুন্নির মত দেখতে লাগছে আমাকে। সামনে দাঁড়ানো দুজন ছেলের মধ্যে একজন সেলিম। কাছে এসে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর ছিটকে সরে গিয়ে দ্রুত একটি রিক্সা নিয়ে ধুকপুক বুক নিয়ে বাড়ি ফিরি। সেলিম সেদিন ঢাকা ফিরে গিয়ে চিঠি লেখে ময়মনসিংহে তার এক বন্ধুর কাছে সে এসেছিল, আমার সঙ্গে একবার দেখা হলে মন্দ হয় না বলেই বন্ধুকে নিয়ে সে কলেজ গেটে দাঁড়িয়েছিল আমার অপেক্ষায়, কথা বলিনি বলে মন খারাপ করে ফিরে গিয়েছে। দেখা না করার কি আছে, শব্দের সাহসী মেয়েটি বুক ফুলিয়ে বলে দেয়, এসো দেখা হবে। কোথায় দেখা হবে? এ এক সমস্যা বটে। স্টেশন রোডের তাজমহল রেস্তোরাঁয় শহরের কবিকুল আড্ডা দেয়, অবশ্য কোনও মেয়ে ওখানে একা যায় না, প্রশ্ন ওঠে না, ওখানেই সেলিমের সঙ্গে আমার দেখা হবে জানিয়ে দিই। ছোটদা এক বিকেলে গীতা আর আমাকে নিয়ে সেই রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন। যেহেতু ছোটদার সঙ্গে মেয়েমানুষ আছে, আমাদের বসতে দেওয়া হয়েছিল পর্দার আড়ালে। মেয়েমানুষ এলে এরকমই নিয়ম, দূরে যাও,আড়ালে যাও। তাজমহলের লোকেরা উঁকি দিয়ে বারবারই দেখেছে আমাদের। সেলিম আমার চিঠি পেয়েই ময়মনসিংহে কবে কখন আসছে জানিয়ে চিঠি লিখল। দেখা হওয়ার দিন আমি সেজেগুজে চন্দনার জন্মদিনে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে যাই। তাজমহলের দরজায় সেলিম দাঁড়িয়ে আছে। বুকের কাপঁুনি সমস্ত শক্তিবলে থামিয়ে আমি ঢুকি রেস্তোরাঁয়, পর্দার আড়ালে কেবিনে বসতে হয়। সেলিমের মুখোমুখি বসি যদিও, চা খাব বলে দুজনের জন্য দুটো চা চাই যদিও, তার চোখের দিকে আমার তাকানো হয় না, তার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি নীরবতা, হ্যাঁ, হুঁ, না, নেই আর দুএকটি ভাববাচ্যে বাক্য ছাড়া আর কিছু উচ্চাজ্ঞরত হয় না, কেবল মৌনতার সঙ্গেই বাচাল হয়ে উঠি। যদিও চিঠিতে তুমি লিখি, সামনে তুমি বলা, লক্ষ করি, অসম্ভব। ওই চা পর্যন্তই, চা শেষ হলে আমি উসখুশ করি। চা তো শেষ হল, এবার কি, এবার উঠে পড়া ছাড়া আর কি হতে পারে! জিভের ডগায় যাই শব্দটি আসে আর যায়। আমার কোনও এক চিঠিতে অহল্যা শব্দটি ছিল। সে কারণেই কি না জানি না, হঠাৎ একটি প্রশ্ন সেলিম করে অহল্যা শব্দের মানে কি জানো?
