কলেজে বছর শেষে প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার একটি পরীক্ষা হবে। দেবনাথ পণ্ডিত বাড়ি এসে পড়তে বসিয়ে কিল ঘুসি চড় আমার মাথায় মুখে পিঠে ইচ্ছেমত ঢেলে মনের সাধ মিটিয়ে চলে যান। চন্দনার দেবনাথ পণ্ডিতের ঝামেলা নেই। দিব্যি আছে সে। লেখাপড়া জাতীয় বিষয়ের ওপর চন্দনার বরাবরই বড় অনাসক্তি। আমারও হত, কিন্তু বাবার কারণে হওয়ার উপায় নেই। বাবার ইচ্ছেয় আমাকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে হচ্ছিল। ছোটদা এই মাধ্যমে পড়েছেন, তাঁর কিছু বই পড়ে ছিল বাড়িতে, ঝেড়ে মুছে সেগুলোই সাজিয়ে রেখেছিলাম টেবিলে। দেবনাথ বাবু পরীক্ষার আগে আগে বাবাকে জানিয়ে দিলেন, বাংলায় পড়াই ভাল, এর দ্বারা ইংরেজি পোষাবে না। ইংরেজি বাদ দিয়ে বাংলায় বই কেনা হল। তাড়াহুড়ো করে বই শেষ করতে হবে, পরীক্ষা সামনে। দেবনাথ পণ্ডিত, আমি জানি না কি কারণে, পরীক্ষার আগে আগে হঠাৎ অসময়ে এসে—উস্কোখুস্কো চুল, পকেটের কালো কলম থেকে কালি চুইয়ে শার্ট প্রায় অর্ধেক ভিজে গেছে- আমাকে কিছু প্রশ্ন লিখে রাখতে বলেন, বলেন এইসবের উত্তরগুলা ঠাইস্যা পড়বা। ব্যস, ঠাইস্যা পড়ে গিয়ে দেখি পরীক্ষায় প্রায় ওই প্রশ্নগুলোই এসেছে। পরীক্ষা হল, ফল বেরোল, আমি প্রথম হলাম। কলেজে আমার নাম হয়ে গেল। প্রধান শিক্ষিকা আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে বললেন তুমি হলে কলেজের গবর্, ভাল করে পড়াশুনা করতে থাক, ফাইনালে খুব ভাল রেজাল্ট চাই। খবরটি শুনে বাবা কিন্তু আদৌ তুষ্ট নন আমার ওপর। বাড়ির ঠিকানায় আমার নামে মেলা চিঠি আসে তিনি লক্ষ করেন। দাদাকে জিজ্ঞেস করেন, নাসরিনের কাছে চিঠি কারা লেখে?
পেনফ্রেন্ডরা।
পেনফ্রেন্ড মানে কি?
দাদা নিরাসক্ত কণ্ঠে বলেন, চিঠিতে ফ্রেন্ডশিপ।
চিঠিতে ফ্রেন্ডশিপ মানে?
দাদা কোনও উত্তর দেন না।
কি লেখে চিঠিতে? বাবার সর্বাঙ্গে বিস্ময়।
কি জানি আমি ত জানি না।
জানি না মানে?
আমারে তো দেখায় না চিঠি।
দেখায় না কেন? কি আছে চিঠিতে?
দাদা চপু ।
কার কাছে চিঠি লেখে?
জানি না।
এই মেয়ে কার কাছে চিঠি লেখে, কি লেখে, কেন লেখে, এইসব জানতে হবে না?
তেমন কিছু না। এই নরমাল ফ্রেন্ডশিপ!
বাবার ক্রমে উত্তপ্ত হতে থাকা মেজাজে দাদা অনুত্তপ্ত পরশ বুলোতে চেষ্টা করেন, কাজ হয় না। বাবার গলার স্বর ধাই ধাই করে ওপরে ওঠে।
নরমাল ফ্রেন্ডশিপ মানেটা কি?
শাদা দেয়ালের দিকে বোধবুদ্ধিহীন তাকিয়ে থাকেন দাদা।
মেয়ে না পুরুষলোক, কার সাথে?
দুই ধরনেরই আছে।
ও কি পুরুষলোকের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে নাকি?
দাদার কোনও উত্তর না পেয়ে তিনি হাপাঁতে হাপাঁতে বলেন, বিয়া বইতে চায় নাকি ও?
দাদা বলেন, না, বিয়া না।
তাইলে কি?
এমনি।
এমনি মানে? এমনি কি?
এমনি লেখে।
এমনি কেন লেখে? কি দরকারে লেখে?
না, কোনও দরকারে না।
দরকার না থাকলে লেখে কেন?
জানি না।
জানস না কেন?
বাবা রক্তচোখে বিস্ফারিত চোখে গিলে খাবেন-চোখে দাদাকে প্রশ্ন করে যান। প্রশ্নের অত্যাচার থেকে বাঁচতে দাদা পায়খানার বেগের কথা বলে গোসলখানায় গিয়ে বসে রইলেন। বাবা তাঁর চশমা ঘন ঘন খুলে, পরে; ঘন ঘন ঘরের বারান্দার এমাথা ওমাথা হেঁটে আমার টেবিলে এসে বইখাতা ঘাঁটেন। প্রতিটি বই, প্রতিটি খাতা। টেবিলের তলে পড়ে থাকা প্রতিটি টুকরো কাগজ। এমনকি বিছানার চাদরের তল, বালিশের তল, তোশকের তল। তিনি খোঁজেন কিছু।
এই ঘটনার পর বাড়িতে আমার চিঠিপত্তর আসা বন্ধ হয়ে গেল। চিঠি চলে যেতে থাকে নতুন বাজারে আরোগ্যবিতানের ঠিকানায়। ডাকপিয়নকে বাগিয়ে নিয়েছেন বাবা। নিশ্চিত হই ছোটদা যেদিন আরোগ্য বিতানে ঢুকে যেই কি না বাজারের দিকে বাবা পা বাড়িয়েছেন, ড্রয়ার খুলতেই অবকাশের ঠিকানায় আমার নামে আসা অনেকগুলো চিঠি খামখোলা পড়ে আছে দেখে এসে আমাকে খবর দেন। একটি জিনিসই আমার তখন মনে হয়েছে, এ অন্যায়। বাবা না হয় বাবা হওয়ার কারণে কোনও অন্যায়কে অন্যায় মনে করেন না। কিন্তু ডাকপিয়ন এই অন্যায়টি করবে কেন! সমস্যাটি কারও কাছে জানিয়ে আমি যে উপকার পাবো না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই চিঠিটি লিখি। বিচিত্রার পাঠকের পাতায় লেখাটি আমার ছাপা হয় পরের সপ্তাহে। অবকাশ, আমলাপাড়ার ঠিকানায় আসা চিঠিগুলো ৬৯, রামবাবু রোডের ঠিকানায় যাচ্ছে, ডাকবিভাগের অসততা সীমা ছাড়িয়ে গেছে ইত্যাদি ..। চিঠি ছাপা হওয়ার দুদিন পর আমার খোঁজে ডাকবিভাগের একজন কর্তা আসেন অবকাশে। তিনি একটি বাধাঁনো লম্বা খাতায় আমার অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে এসেছেন। এসে কিন্তু নিজের অভিযোগের কথাই বর্ণনা করলেন। তাঁর অভিযোগটি আমার অভিযোগ নিয়ে। আমার চিঠি কোনও অচেনা দুর্বৃত্তের কাছে যাচ্ছে না, আমার আপন পিতার কাছেই যাচ্ছে। অবকাশের মালিক এবং আরোগ্য বিতানের মালিক এক ব্যক্তি। সুতরাং মালিকের আদেশে এক ঠিকানার চিঠি আরেক ঠিকানায় যেতেই পারে। এর উত্তরে আমি বলি, কিন্তু চিঠি তো আমার বাবার নামে আসছে না। আসছে আমার নামে। আমি তো পোস্টমাস্টাররে বলি নাই আমার চিঠি অবকাশে না দিয়া আরোগ্য বিতানে দিতে।
যেইখানেই দিক, তিনি তো আপনার বাবা।
মৃদু কণ্ঠে ভুল শুধরে দিই, হ্যাঁ তিনি আমার বাবা, তিনি আমি নন। আমি এবং আমার বাবা এক এবং অভিন্ন নই। লোকটি চলে গেলেন। সমস্যার কোনও সমাধান হল না। এই অবস্থা থেকে ছোটদা আমাকে উদ্ধার করেন তাঁর এক বন্ধুর খাতা কলমের দোকানের ঠিকানা আমাকে ব্যবহার করতে দিয়ে। পত্রমিতাদের জানিয়ে দিই আমার নতুন ঠিকানা। ছোটদা নিষ্ঠ ডাকহরকরার মত কর্তব্য পালন করেন। তাঁর সঙ্গে আমার বেশ ভাব। আমরা ঈদসংখ্যা বিচিত্রার গল্প উপন্যাস একসঙ্গে পড়ি, পড়া মানে আমি সশব্দে পড়ি আর ছোটদা শোনেন। গল্পের বইগুলোও প্রায়ই ওভাবেই পড়া হয়। কিছু কিছু বই আবার ছোটদার পছন্দ হয় না, সেগুলো আমি নিভৃতে পড়ি। ছোটবেলার দস্যু বনহুরের পাট চুকেছে, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, বিমল মিত্র, জরাসন্ধকে বিদেয় দিয়েছি অনেক আগে। বঙ্কিম শরৎচন্দ্রের আর কিছু বাকি নেই। রবীন্দ্রনাথ নজরুল অনেক হয়েছে। মাইকেল হয়েছে, জীবনানন্দও হয়ে গেছে। বিভূতিভুষণ, মানিক বন্দোপাধ্যায়ও। শক্তি, সুনীল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ থেকে শুরু করে হালের নির্মলেন্দু গুণেরও যে বইগুলো এ অবদি বেরিয়েছে পড়া হয়ে গেছে। নতুন রকম বই চাই। আঁতি পাঁতি করে খুঁজি নতুন কিছু। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে গাঙ্গিনার পাড় মোড়ের বইয়ের দোকানগুলোয় থেমে বই খুঁজি। গদ্যপদ্যপ্রবন্ধের নানারকম বই আমাকে টানে। কিন্তু বই কেনার পয়সা যথেষ্ট নেই। এ দুরবস্থা থেকেও ছোটদা আমাকে উদ্ধার করেন। এক বিকেলে পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়ে যান। লাইব্রেরির ভেতর ঢুকেই পঈচ্ছত প্রশান্তি আমাকে আলিঙ্গন করে। ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু তাকে বই। চারদিকে বই। মাঝখানে পড়ার টেবিল, পিন পতনের শব্দ নেই কোথাও, দএু কজন মন দিয়ে পড়ছে। ইচ্ছে করে সারাদিন মন্দিরের মত পরিচ্ছত বইএর এই নিরুপদ্রব ঘরটিতে কাটিয়ে দিই। লাইব্রেরির সব বই যদি বাড়ি বয়ে এনে পড়ে ফেলা যেত আজই! সেদিনই সদস্য হয়ে দুহাতে যত বই ধরে, নিয়ে আসি। বইগুলো আমার হাত থেকে যেতে থাকে চন্দনার হাতে, চন্দনার হাত থেকে আবার আমার হাতে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক শেষ হলে সতীনাথ ভাদুড়ি, নরেন মিত্র, জগদীশ গুপ্তে। ফেরত দিয়ে আরও বই। গোগ্রাসে পড়তে থাকি দুজন। যেন অতি শীঘ্র পাবলিক লাইব্রেরির বইগুলোর ওপর একটি জরুরি পরীক্ষা দিতে বসব।
