কলেজ প্রাঙ্গণে আমাদের অন্যরকম জগত নিয়ে আমরা একা হতে থাকি, আমি আর চন্দনা। কখনও কখনও মেয়েদের আড্ডায় যে নাক গলাতে চাই না, তা নয়। একবার ক্লাস নেই,একদঙ্গল মেয়ের আড্ডায় বসে শুনি কোন মেয়ের কবে বিয়ে হচ্ছে, কবে কাকে দেখতে আসছে কোন ছেলে, ছেলের নাম ধাম, ছেলে কোথায় থাকে, কি করে ইত্যাদি কথা। চন্দনা আর আমার দুজনের ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দেয় ফুলকি ফুলকি হাসি। হাসিটি কোনও মেয়েরই পছন্দ হয় না। হাসছি কেন এই প্রশ্নের উত্তর ওদের একজন জানতে চায়।
হাসছি এই বিচ্ছিজ্ঞর জিনিসটি নিয়ে তোমরা কথা বলছ বলে।
বিচ্ছিজ্ঞর জিনিস? মেয়েদের কারও চোখ কপালে, কারও নাকে, কারও চোখ বেরিয়ে এসেছে চোখের কোটর থেকে। যেন আমি আর চন্দনা মোটেই মানুষ নামের পদার্থ নই, অন্য গ্রহ থেকে অন্য কোনও কিম্ভূত জীব এসেছি।
একজন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, বিচ্ছিজ্ঞর কেন হবে?
বিচ্ছিজ্ঞরই তো। চন্দনা বলে।
ভাবটা এমন যেন তোমাদের কোনওদিন বিয়ে হইব না।
হইবই ত না। বিয়ে করলে তো হইব বিয়ে! করতাছে টা কে! আমি বলি।
চন্দনা বলে, ফুঁ:, পাগল হইছি নাকি যে বিয়ে করতাম!পাগল আর বোকা ছাড়া কেউ বিয়ে করে না।
কোনওদিন বিয়ে করব না—আমাদের এ ঘোষণাটি শুনে মেয়েরা জানতে চেয়েছে, বিয়ে না করার পেছনে আমাদের যুক্তিটি কি।
বিয়ে করার কি কোনও যুক্তি আছে, যদি থাকেই, যুক্তিটা কি?
সংসার হবে। সংসারের তো দরকার আছে।
সংসারের দরকার কি? সংসার না হইলে কি মানুষ বাঁচে না?
বাচ্চাকাচ্চা হবে।
বাচ্চাকাচ্চা না হইলে কি হয়!
খাওয়াবে কে? পয়সা দেবে কে?
লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করব। টাকা পাব। একলা থাকব। খাব দাব। ঘুইরা বেড়াবো। আনন্দ করব। যা মন চায় তা করব।
তাই কি হয় নাকি!
হবে না কেন! নিশ্চয় হবে, ইচ্ছে থাকলে সবই হয়।
আমরা সরে আসি, একসঙ্গে অনেকগুলো চোখ আমাদের দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে, টের পাই। চন্দনা আমার হাতটি হাতের মুঠোয় নিয়ে শিমুল তলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে, পিছনে তাকাইস না। আমরা এভাবেই হাঁটি দুজন, হাত ধরে, কোমর জড়িয়ে ধরে, কাঁধে হাত রেখে পরস্পরের, পেছনে না তাকিয়ে। কলেজে এ কোনও নতুন দৃশ্য নয়, বান্ধবীরা এভাবেই কথা বলে অবসর কাটায়। কিন্তু চন্দনা আর আমার গ্রীবায় অদৃশ্য এক অহঙ্কার, মেয়েরা বলে, বসে থাকে।
চন্দনা আর আমার কাছে প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে কবিতা। প্রতিদিন কবিতা লিখতে থাকি, প্রতিদিন গল্প। যা কিছুই লিখি না কেন, চন্দনার লেখার কাছে আমার সব লেখাই মলিন ঠেকে, ও যদি একটি কৃষ্ণচূড়া তৈরি করে তো আমি নিতান্তই একটি হেলে পড়া পত্রপুষ্পহীন চারাগাছ। এত মগ্ধু আমি ওর সৌন্দর্যে, ওর রঙে, রসে, ওর অসম্ভব বৈচিত্রে যে এতটুকু যদি ঈর্ষার লেশ জন্মে কখনও মনে, নিমেষে হাওয়া হয়ে যায়। আমার আর চন্দনার চিপাচসের সদস্য হওয়া হয় না, কোনও সভা সমিতিতে যাওয়া হয় না, আমরা ও কাজের জন্য নই, আমাদের জগত আলাদা। নিরবধি নিরুদ্বেগে নিরিবিলি শব্দের নিরঞ্জন খেলায় মাতি, শব্দ নিয়ে মিছিলে নামি না, রাজনীতিও করতে জানি না। ওই ধুমসে কবিতা লেখার সময়ই একদিন শফিকুল ইসলাম নামের এক মোটা কাচের চশমা পরা, শরীরের চেয়ে মাথাটি বড়, তারের মত শক্ত চুল মাথা ভরা, দেখলে মনে হয় দঞ্চু বছর গোসল করেনি, জামাও পাল্টায়নি, অনর্গল আঞ্চলিক সুরে এবং স্বরে কথা বলা বাচালকে বাড়ি নিয়ে এলেন ছোটদা, আমাকে দেখেই বলে সে, কি ব্যাপার তুমি তো বিখ্যাত হইয়া গেছ! আমি একটা লিটল ম্যাগাজিন বাইর করি। একটা কবিতা লিইখা দেও তো। শফিকুল ইসলামের অনুরোধে এক বিকেলে বসে নতুন একটি কবিতা লিখে ফেলি, নাম মুক্ত বিহঙ্গ। অনেকটা এরকম, জানালাটি খুলে দাও, আমি যাব, আকাশ জুড়ে উড়ব আমি। সম্ভবত মার হঠাৎ হঠাৎ বাড়ির বারান্দায় বসে গেয়ে ওঠা আমি মুক্ত বলাকা, মেলে দিই পাখা ওই দূর নীল আকাশে গানটি শুনতে শুনতে এই হয়। দুসপ্তাহ পর শফিকুলের কবিতা পত্রিকা বেরোল, আমার কবিতা ওতে। পদ্মরাগ মণিও কবিতা লিখেছে। পদ্মরাগ মণি মাঝে মধ্যে ছোটদা আর গীতার সঙ্গে দেখা করতে অবকাশে আসে। চোখকাড়া সুন্দরীটির সঙ্গে আমার দূর থেকে কিছুটা চোখাচোখি, মিটিমিটি হাসাহাসি, দুচারটে কথা ছোঁড়াছুঁড়ি হয়েছে। শফিকুলের কবিতা পত্রিকাটি হাতে আসার পর আরও আরও কবিতা-পত্রিকা আমার কাছে উড়ে, দৌড়ে, হামাগুড়ি দিয়ে আসতে থাকে। শহরের কবিদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে নানা রকম ছোট পত্রিকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন ছোটদা। প্রায়ই আমাকে তাগাদা দেন, দে তো লেইখা বাংলার দর্পনের জন্য একটা কবিতা। লিখে দিই, ছাপা হয়ে যায়। চন্দু মাস্তানরে ক একটা কবিতা দিতে। চন্দনাও লেখা দিতে থাকে ছোটদার হাতে, ছাপা হতে থাকে। সেই যে এক ভোরবেলা চন্দনা সাইকেল নিয়ে চলে এসেছিল অবকাশে, সেই থেকে ছোটদা ওকে চন্দু মাস্তান ডাকে, চন্দনা অখুশি হয় না। দৈনিক জাহান থেকেও ছোটদার কাছে বলা হয় আমি যেন কবিতা পাঠাই, চন্দনাও। কবিতার পার্থিব জগতে সেই আমার হাঁটি হাঁটি পা পা প্রবেশ। চন্দনারও। আমাদের কবিতার খাতা উপচে পড়তে থাকে শব্দে। ফিকে হয়ে যায় চিত্রালী পূর্বাণী। ওসবে লেখা তো হয়ই না, ওসব কেনাও হয় না। বিচিত্রায় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দেওয়ার কথা ভুলেও মনে পড়ে না। বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ উঠলে চন্দনা বলে, বিজ্ঞাপনে বিপদ আছে। চব্বিশ বছর বয়স্কা বীরাঙ্গনা ছাপার ভুলে হয়ে যেতে পারে বিয়াল্লিশ বছর বয়স্কা বারাঙ্গনা। সুতরাং বিজ্ঞাপন বাদ। পাঠাতেই যদি হয় কিছু কবিতা পাঠাবো, পাঠাবো রোববার অথবা সন্ধানীর সাহিত্যপাতায়।
