ছোটদার মিনতিতে তাঁর বাচপুান কা দোস্তকে চিঠি লেখে চন্দনা। ধীরে ধীরে হাসান মনসুর খোকন চন্দনার এক নম্বর পত্রমিতা হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করে। খোকন নামের মধ্যে খোকন খোকন করে মায় খোকন গেল কাদের নায় গন্ধ আছে বলে চন্দনা খোকন নাম বাতিল করে সম্বোধনের জন্য হাসান বেছে নিল।না সজনী না জানি জানি সে আসিবে না গানটি শুনতে শুনতে সজনী নামটি সবে নিজের নামের লেজে জুড়েছে ও।চন্দনা নামটি ওর ভাল লাগে না, চাকমা নামটি তো নয়ই। কিন্তু এ দুটোকে ফেলতে পারে না নিজের নাম বলে। ভূতনি যার নাম, তাকে তার ভূতনি নামটিই রাখতে হয় নিজের নাম বলে। হাসানের চমৎকার চমৎকার চিঠি পড়ে চন্দনা সজনী হাসান নামটি কাগজে লিখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মন্দ লাগে না দেখতে। জাফর ইকবাল সুদর্শন বটে, কিন্তু তার চিঠির বানান ভুল ভাষার ভুল একদিন দুদিন ক্ষমা করে দেওয়া যায়, প্রতিদিন যায় না। চন্দনা হাসানে মগ্ন হয়। হাসান যেমন কাব্য করে অরণ্য আর সমুদ্রের কথা, কোনও এক অচেনা দ্বীপে কোনও একদিন হারিয়ে যাওয়ার কথা লেখে, চন্দনাও রঙিন আকাশে পালকের মত উদাসীন ভেসে ভেসে লেখে ওর সুচারু সুন্দর স্বপ্নের কথা। চন্দনা হাসানকে কি লিখছে, হাসানই বা চন্দনাকে কি, সব আমাকে পড়ে শোনায়। চন্দনা আর আমার মধ্যে এক বিন্দু গোপন কিছু নেই। চন্দনা, আমার বিশ্বাস হয় না, যাকে ও লেখে, তাকে কখনও বাস্তবে দেখতে চায়। ওর শব্দ নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে খেলতে ভাল লাগে, ও খেলে। হাসানের বাঁকা হাসিটি দেখলে বুকের ভেতর কেমন জানি করত, চন্দনাকে সে কথা বলি। বলি যে হাসান দেখতে সুন্দর, বলি যে সেই শৈশবেই আমার মনে হত জগতে বুঝি হাসানের চেয়ে সুদর্শন আর কেউ নেই। চন্দনা আমার কথা মন দিয়ে শোনে,শুনতে শুনতে দূর এক অরণ্যে ও হাসানের হাত ধরে হাঁটে, মনে মনে। সেই হাসান চন্দনার চিঠি পড়েই প্রেমে অর্ধউন্মাদ হয়ে একদিন ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ চলে এল চন্দনাকে দেখবে বলে। কিন্তু দেখা হবে কি করে, হাসান দেখা করতে এসেছে শুনেই তো ও শামুকের মত গুটিয়ে গেল। মেঘলা আকাশ থেকে একটি রঙিন নরম পালক একটি বোধহীন পাথরের সঙ্গে শুকনো মাটিতে এসে সশব্দে পড়ে চন্দনার নিমগ্নতা নষ্ট করে। এই রুখো বাস্তবতা চন্দনাকে বিবণর্ করে তোলে। ছোটদার পীড়াপীড়িতে আমি নিরাসক্ত নিস্তেজ বিবর্ণকে যে করেই হোক হাসানের সঙ্গে অন্তত একটিবার দেখা করতে বলি। রাজি হলে ছোটদা আমাদের দুজনকে নিয়ে ময়মনসিংহ প্রদর্শনীতে যান, সঙ্গে গীতা, বার্মা কোরিয়া থেকে ফিরে ময়মনসিংহে থিতু হয়ে বসা গীতা। প্রদর্শনীতে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হাসানের সঙ্গে চন্দনার অনানুষ্ঠানিক দেখা হওয়া। হাসান আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনী মানে যাত্রা সার্কাস, জলহীন কুয়োর ভেতর মোটর সাইকেলের চক্কর, দোকানপাট, ঝলমল আলো, হাউজি নামের জুয়ো। মাঠে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে গীতার হঠাৎ হাউজি খেলার শখ হয়। গীতার শখ মেটাতে ছোটদা পাঁচ পায়ে খাড়া। তিনি দল নিয়ে হাউজিতে ঢোকেন। ওখানে আর কোনও মেয়ে নেই, আমরাই কেবল। হাউজিতে পঁচাত্তর টাকা জিতে গীতা হৈ হৈ রৈ রৈ করে খুশিতে নেচে ওঠে। রেস্তোরাঁয় পরোটা মাংস খেয়ে পঁচাত্তর টাকার অনেকটাই নাশ করা হয়। চন্দনাকে দেখার পর হাসান আর চোখ ফেরাতে পারেনি চন্দনা থেকে। চন্দনা কিন্তু আড়চোখে একবার হাসানকে দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। হাসানের দএু কটি প্রশ্নের উত্তরে কেবল হ্যাঁ বা না বলেছে। ভাল আছ? হ্যাঁ। শরীর ভাল? হ্যাঁ। মন ভাল? হ্যাঁ। পড়াশোনা ভাল হচ্ছে? না। কিছু কিনবে? না। সাভার গেছ কোনওদিন? না। চন্দনার লাজুক লাজুক হাসি দেখে সবাই অনুমান করে যে হাসানকে চন্দনার খুব পছন্দ হয়েছে। প্রেমে হাবুডুবু খেলে এমন লাজুকই তো দেখতে লাগে মেয়েদের। চন্দনা সারাক্ষণই আমার হাত ধরে ছিল, হাতে বার বার চাপ অনুভব করছিলাম ওর হাতের। চাপের অনুবাদ করছিলাম, দেখ দেখ হাসানের চোখ দুইটা কি সুন্দর! হাসিটা দেখ, এমন সুন্দর হাসি কি কেউ হাসতে পারে! পকেটে হাত রেখে হাঁটছে, কী চমৎকার হাঁটার ভঙ্গি!আহ, মরে যাই! সে রাতে ধুলোয় ভিড়ে চন্দনার উচ্ছঅ!স দেখার সুযোগ হয়নি। পরদিন ঝাঁপিয়ে পড়ি ওর থরথর আবেগের শব্দাবলী শুনতে।
তরে ত আগেই কইছিলাম হাসান খুব সুন্দর,দেখলি তো!
চন্দনা সশব্দে হেসে ওঠে।
ক। তাড়াতাড়ি ক।
কি কইতাম?
হাসানরে কিরম লাগল, ক।
ধুর বেডা পচা! বেডার ভুড়ি আছে।
হাসান বাদ। আমি নিজেও আবার হাসানকে লক্ষ করে দেখি, বেডার ঠিকই ভুড়ি আছে। চন্দনা আমার চোখ খুলে দেয়, মন খুলে দেয়। আমি স্পষ্ট বুঝি, আমার আর চন্দনার সবাইকে ভাল লাগে, আবার কাউকেই লাগে না। আমরা প্রেমে পড়তে চাই, আবার চাইও না। প্রেম জিনিসটি ঠিক কি, সে সম্পর্কে আমরা জানি,পড়েছি, দেখেছি, কিন্তু নিজের জীবনে এ জিনিসটির উপস্থিতি আমাদের সয়, আবার সয়ও না। ভাল লাগা আর না লাগায় আমরা দুলি। আমি আর চন্দনা।
ক্লাস ফাঁকি দিয়েও গগন দারোয়ানকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে কলেজ মাঠের শেষ কোণে কাঁটা ঝোপঁ আবিষ্কার করে তার তল দিয়ে গা কাঁটায় ছিঁড়ে হলেও আমি আর চন্দনা একদিন বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। বেরিয়েছি, এবার যাব কোথায়? আগুনে রোদ্দুর হাতে নিয়ে থমকে আছে নির্জন দুপুর। চন্দনা পার্কে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। পার্কের কথায় বুক ঢিপঢিপ করে। আবার যদি পাল পাল ছেলের পাল্লায় পড়ি! হাত ধরে আমাকে সামনে টানে চন্দনা, ওর স্পর্শই যথেষ্ট আমাকে আরও চঞ্চল, চপল, আরও চলমান করার। চন্দনার সাহসের ডানায় বসে আপাতত ছেলের পালের কথা ভুলে সেই লেডিস পার্কে যাই। অশ্বত্থ গাছের তলে দুজন বসি পা ছড়িয়ে, ব্রহ্মপুত্র তার জল থেকে শীতল স্নিগ্ধতা তুলে আমাদের স্নান করাতে থাকে। একটি ডিঙি নৌকো ডেকে নৌকোওলাকে গলুইয়ে বেকার বসিয়ে রেখে চন্দনা নিজে বৈঠা বাইতে থাকে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে, জলের সঙ্গে বৈঠার এই শব্দ যেন আদৌ কোনও শব্দ নয়, যেন এক ধ্রুপদী সঙ্গীত। আমি জলে পা ডুবিয়ে আকাশ জুড়ে মেঘ ও রোদের খেলা দেখতে থাকি, দেখতে দেখতে আর ওভাবে ভাসতে ভাসতে বিকেল হয়ে আসে। বিকেলের সপ্তবণর্ রং দেখি কেবল আকাশে নয়, আমাদের সর্বাঙ্গে। আমারও চন্দনার মত নৌকো বাইতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হয় জলে ভেসে বেড়াই, সঙ্গীতের তালে নৌকো দুলুক সারাজীবন, কোথাও না পৌঁছুক, কোনও পারে, এভাবেই ভেসে যাক জীবন। ইচ্ছে হয় আলটপকা দুটো পাখাও গজিয়ে যাক আমার, পাখির মত উড়ে বেড়াই আকাশ জুড়ে, ওই রংগুলোর খুব কাছে চলে যাই, একটু একটু করে মিশে যাই ওই রঙে। চন্দনা, তোর কি কখনও পাখি হতে ইচ্ছা করে রে? ইচ্ছে করে চন্দনাকে প্রশ্নটি করি। ওরও নিশ্চয় পাখি হতে ইচ্ছে করে, ওর ইচ্ছেগুলো আমার ইচ্ছের মত। তবু মনে হয়, চন্দনা যা চায় তার অনেকটাই ও করে ফেলে, অবাক করে দেয় সব্বাইকে। ও হয়ত সত্যিই একদিন আকাশে উড়ে উড়ে সূর্যাস্তের রঙের অনেক কাছে চলে যেতে পারবে। ব্রহ্মপুত্রের জল ছেড়ে আমাদের উঠে আসতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু উঠে আসতেই হয়। তার চেয়ে আমাদের যদি কোথাও দ্বীপান্তর হত, আমি আর চন্দনা দুজনই ভাবি, বুঝি সুখের সমুদ্রে সত্যিকার অবগাহন হত।
