জিজেস করি কে এসেছিল।
কামালরে খুঁজতে আইছিল।
কে? কি নাম?
চিনি না, নাম কয় নাই।
কি ক্ইল?
জিগাইল, আপনে কে? আমি কইলাম আমি কেউ না, এই বাসায় কাজ করি।
এইটা কইলা কেন?
কামালের মা পরিচয় দিলে এই ছেলেই হয়ত অবাক হইত। ছিঁড়া ময়লা শাড়ি পিন্দা রইছি।
আমি চপু হয়ে যাই। মা হয়ত ঠিকই করেছেন মিথ্যে বলে, মনে হয়। ছোটদার ইজ্জত বাঁচিয়েছেন মা। মা যদি বলতেন তিনি কামালের মা, তবে আমার আশংকা হয় যে ছোটদার সঙ্গে দেখা হলে ওই ছেলে বলত, তোমার বাসায় দেখলাম একটা কাজের বেটি, বলল সে নাকি তোমার মা লাগে! কাজের বেটিদের আজকাল স্পর্ধা বাড়ছে অনেক।
মাকে রাখতেও পারি না, ফেলতেও পারি না। মা আমাদের জন্য রান্না করবেন, ক্ষিধে না লাগার আগে খেতে দেবেন, বাবা মারমুখি হলে বাবাকে সরিয়ে নেবেন বলে বলে যে, মেয়েরা হইল ঘরের লক্ষ্মী,ওদের গায়ে হাত তোলা ঠিক না, ওরা আর কয়দিন আছে, পরের ঘরে ত চইলা যাইব। মার হস্তক্ষেপে বাঁচি বটে, কিন্তু পরের ঘরে চইলা যাইব, বাক্যটি আমার গায়ে এত বেশি জ্বালা ধরায় যে হিংস্র বাবার চেয়ে দরদী মায়ের ওপরই আমার রাগ হয় বেশি।
পরের ঘরে চইলা যাইব মানেটা কি?
পরের ঘরে তো যাইতেই হইব! বিয়া শাদি হইলে যাইতে হইব না!
না যাইতে হইব না।
তা কি হয় নাকি?
হয়। অবশ্যই হয়।
সারাজীবন কেউ কি বাপের বাড়িতে থাকে?
থাকে। আমি থাকি। আমি থাকব।
বিয়ে শব্দটি শুনলে আমার গা রি রি করে ওঠে।
বিয়া হইয়া গেলেই তো মেয়েরা পর হইয়া যায় মা। মেয়েরা হ্ইল বাপের বাড়িতে একরকম অতিথি, যত পারো তাদেরে আদর যত্ন কর, পরে কপালে কি আছে সখু না দুঃখ,কে জানে!
নরম সুরে বলা হলেও মার শব্দগুলো বিষলাগানো তীরের মত বেঁধে আমার গায়ে। জন্মানো হল, শেকড় ছড়ানো হল, এতটা বছর গায়ে গায়ে লেগে থেকেও আমি কি না পর, আর বাইরে বাইরে থাকা, বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া, বা বিয়ে করার স্বপ্নে বিভোর ছেলেরা আমার চেয়ে আপন মার! আমি তো বাবা সে যত পাষণ্ডই হোক, মা সে যত অসুন্দরী আর অশিক্ষিত হোক, ভাই সে যত হাড়কিপ্টে আর কুচুটে হোক, বোন সে যত বেয়াদপ আর বাচাল হোক, কাউকে পর ভাবতে পারি না। এরাই আমার সবথেকে আপন। অন্য এক অচেনা লোক আলটপকা এসে এদের চেয়ে বেশি আপন হয়ে উঠবে আমার! অসম্ভব! মাকে ইচ্ছে করে ঠেলে সরিয়ে দিই। ইচ্ছে করে মার মুখের ওপর ঠকাস করে দরজা বন্ধ করে দিই। মা খাবার দাও, মা আমার জামাটা কই, গোসলের সাবানটা আবার কই গেল মা, রিক্সাভাড়া হাতে না থাকার পরও মার ভরসায় রিক্সা চেপে বাড়ি এসে, মা তিনটা টাকা দাও তো অথবা মা গো, আমার জ্বর আসতাছে বললে মা কপাল ছোঁবেন, শুইয়ে দেবেন, শীতে হি হি করা শরীর ঢেকে দেবেন গরম লেপে,বাবাকে খবর পাঠাবেন জ্বর দেখে যেতে, ওষধু দিয়ে যেতে—এররকম ছোটখাট ব্যাপার ছাড়া মাকে জীবনের অন্য কিছুতে আমার মনে হয় না, কিছুমাত্র প্রয়োজন।
কালো ফটকের শব্দ হলে, বাবার ফটক খোলার শব্দ বাড়ির যে কোনও জায়গা থেকেই টের পাই যদিও, সামান্য সন্দেহ হলে আগে জানলা থেকে দেখি এল কে, সে যদি বাবা হয়, দৌড়, দৌড়ে যে যার নিজের জায়গায়।মুশকিল হল, দুপুর দুটো আড়াইটায় বই সামনে বসে আছি দেখতে পেলে ঠিক ধরে ফেলেন, তাঁর আসার শব্দ শুনে বসেছি, তখন উল্টোটা হয়,মনীষীদের বাণী ঝাড়ার আগে খিস্তি ঝেড়ে নেন। অবশ্য পরীক্ষার আগে আগে হলে দুপুর দুটো কী রাত দুটো হোক, ওখানেই বসে থাকা চাই। বাবা বলেন, চেয়ারে জিগাইরা আঠা লাগাইয়া বইয়া লেখাপড়া কর। আড়াইটায় বাবা এলেন। বাবা এলে কেবল নিজে সতর্ক হব তা নয়, বাড়ির সবাইকেই সতর্ক করতে হয়। কারণ আমি না হয়, যে সময়ে যেখানে থাকা দরকার সেখানে আছি, পড়ার ঘর থেকে সাদাসিধে ভালমানুষের মত বেরিয়ে কাঁধে গামছা নিয়ে গোসলখানায় যাচ্ছি, দপু রে নাওয়া বা খাওয়া ব্যাপারগুলো যেহেতু চলে বলে বাবা মনে করেন, কিন্তু ইয়াসমিন হয়ত আমগাছের মগডালে বসে আছে অথবা রান্নাঘরে অথবা ছাদে, যেসব, বাবা কিছুতেই মানেন না যে চলে, এবং যা চলে না তার কিছু কোথাও হতে দেখলে যেহেতু বাড়িতে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দেবেন—ইয়াসমিনের পিঠে তো পড়বেই কিছু আমার পিঠও বাদ যাবে না, তাই বাবাকে দেখে, আমি জানিয়ে দিই, আসলে যেই দেখে, তারই একরকম অলিখিত দায়িত্ব চেঁচিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বাবার আগমন বার্তা ঘোষণা করে দেওয়া, সাধারণত ঘর থেকে বারান্দা অবদি দৌড়ে বাবা আইছে, বললেই বাড়ির প্রাণীগুলো যে যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, ঊর্ধশ্বাসে ছুটে যাকে যেখানে বাবা ভাবেন যে মানায়, যায়, যেমন, বাড়ির কাজের মেয়েটি যদি বারান্দায় জিরোতে থাকে, সে ছুটে রান্নাঘরে সেধোঁয় বাসনপত্র মাজতে, নয়ত জল ভরতে কলপারে যায় কিছু একটা করতে, বাবা যেহেতু কারও বসে থাকা বা শুয়ে থাকা সইতে পারেন না। জানিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসমিন উঠোনে স্তূপ করে রাখা নারকেল পাতা ছিঁড়ে মাথার মুকুট বানাচ্ছিল, ফেলে দৌড়ে ঘরে ঢোকে, ঘোষণা কে শুনেছে না শুনেছে কে কোথায় অবস্থান নিল না নিল জানার আগে দ্রুত নিজের অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, নিজের চরকায় তেল তো দিতে হবে না কি! ঘোষণা সেরে, গামছা কাঁধে যখন আমি গোসলখানার দিকে হাঁটছি, দেখি, মা খাচ্ছিলেন, বন্ধ করে ছুটে রান্নাঘরে ঢুকে আধখাওয়া থালা রেখে হাত ধুয়ে নিলেন। আমি গোসলখানায় ঢুকে গেলাম, ইয়াসমিন অঙ্ক করতে বসল, আর মা হাত ধুয়ে কুলোয় চাল নিলেন বাছতে, রাতের রান্নার প্রস্থুতি। গোসলখানা থেকে বেরিয়ে মাকে গলা চেপে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা গেছে গা?
