আমি হতবাক, আমিই তো বাড়ির বড় ছাত্রী, বাবা কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না! দরজার পর্দা আঙুলে পেঁচানো বাদ দিয়ে বাবার চোখের সামনে দাঁড়াই যেন স্পষ্ট দেখেন, এমনিতেও একেবারে চোখের সামনে না দাঁড়ালে তিনি কোনও দাঁড়ানোকেই ঠিক দাঁড়ানো মনে করেন না।
আমার দিকে চোখ রেখেই বলেন, বড় ছাত্রীরে ডাকো।
আমি তো এইখানে। আমি বলি।
বাবা বলেন, তুমি কি পি এইচ ডি দিতাছ?
না।
একজন যে পি এইচ ডি দিতাছে, তারে ডাইকা লইয়া আস।
আমার তখনও মাথায় খেলে না বাবা কার কথা বলছেন। ইয়াসমিন বুদ্ধিতে আমার চেয়ে পাকা। ও চৌকাঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকল, মা, তাড়াতাড়ি আসো। বাবা ডাকতাছে। মা খাতা কলম বন্ধ করে বাবার সামনে এলেন। মা যে বাজারের লিস্টি দিয়েছিলেন, সেই লিস্টিটি হাতে নিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, লবণ শেষ হইল কেমনে?
মা শান্ত গলায় বললেন, রাইন্ধা।
কি এত রাজভোগ রান্ধ্যা যে আড়াই সের লবণ দুই দিনে শেষ হইয়া যায়?
এত জানার ইচ্ছা থাকলে পাকঘরে বইয়া থাইকা দেইখেন কেমনে শেষ হয়।
লবণের দাম সম্পর্কে কোনও ধারণা আছে?
মা কোনও উত্তর দেন না।
বাবা দাঁতে দাঁত চেপে বলেন, আমি পরের মাসে লবণ কিনবাম, এই মাস লবণ ছাড়া খাইতে হইব সবার।
আমি লবণ ছাড়াই খাইতে পারি, আপনের ছেলেমেয়েরা পারে না, সবার পাতে আলদা লবণ লাগে। বলে মা অন্য ঘরে চলে যান। বারান্দার টেবিলে মার বইখাতাগুলো পড়ে থাকে, হাওয়ায় উড়তে থাকে খাতার পাতা।
বাবা রাতে ফিরে জরির মাকে ডেকে গলা খাটো করে জিজ্ঞেস করেন, আইচ্ছা নোমানের মা কি পিঁয়াজ রসুন চাইল ডাইল তেল এইগুলা সরায়?
কি জানি আমি জানি না।
দেখ নাই কিছু নিয়া যাইতে?
কত কিছুই তো নেয়।
কি নেয়?
ব্যাগের মধ্যে ভইরা কি নেয়, তা কি আমি দেহি! আমি কামের মানুষ, কাম করি।
ব্যাগ লইয়া বাইর হয় নাকি?
তা কি আর বাইর হয় না! কুনুহানো গেলে তো হাতে ব্যাগ একটা থাহেই।
কত বড় ব্যাগ?
ব্যাগ কি আর ছোড হয়, ব্যাগ ত বড়ই।
জরির মা বাবার ঘর থেকে ফিরলে মা জিজ্ঞেস করেন, তোমারে ডাইকা কি জিগাইল?
জিগাইল আপনে চাইল তেল এইগুলা লইয়া বাপের বাড়ি যান কি না।
কি কইছ তুমি?
কইছি আমি এইতা জানি না।
মা ফুঁসে ওঠেন, তুমি জান না? আমার বাপের কি চাইল ডাইল নাই নাকি? আমার বাপ কি পথের ফকির হইয়া গেছে? বাপের বাড়িতে এহনও বিরাট বিরাট পাতিলে রান্ধাবাড়া হয়, খাওনের অভাব নাই ওইহানে। আমগোর বাজান দালান তুলে নাই, কিন্তু খাওয়া দাওয়ায় কাপড় চোপড়ে অভাব রাখে নাই কোনওদিন। বড় বড় রুইমাছ, বড় বড় পাঙ্গাস মাছ,কাতল মাছ কিইনা আনে, পচা মাছ বাড়িত পাডায় না। আমিই উল্ডা মার কাছ থেইকা টাকা পয়সা আনি। আমারে এত মিথ্যা অপবাদ দিতাছে, আল্লার গজব পড়ব, ধং্ব স হইয়া যাইব এই দুষ্ট লোকের দেমাগ।
মা অর্ধেক রাত অবদি বিড়বিড় করেন। জরির মা মেঝেয় হাঁটু মুড়ে বসে বিড়বিড় শোনে।
পরদিন রান্নাঘরে গিয়ে আলমারি খুলে আনাজপাতি কি কি আছে, কবে কি কিনেছেন, কবে কি শেষ হল তার পই পই হিশেব নিলেন বাবা। হিসেবে গরমিল হচ্ছে বলে তিনি বড় একটি তালা কিনে এনে রান্নাঘরের আলমারিতে লাগিয়ে দিয়ে বললেন এখন থেকে চাল ডাল, পেঁয়াজ রসুন যা লাগবে, তিনি তালা খুলে বের করে দেবেন। চাবি প্যাণ্টের পকেটে নিয়ে বাবা বেরিয়ে গেলেন। পরদিন বাড়ি থেকে বেরোবার আগে আলমারির তালা খুলে মাকে ডেকে, আজকে দুপুরে মাগুর মাছ রান্না হবে, এই ধর একটা পিঁয়াজ। আর মসুরির ডাল এক কাপ রানলেই চলবে, ডালের জন্য এই নেও দুইটা কাঁচা মরিচ, একটা রসুন বলতে বলতে হাতে দেন আনাজপাতি, এক ছটাক তেলও দিয়ে যান মেপে।
বিকেলে ফিরে রাতের রান্নার আগে হিশেব করে বের করেন, কি লাগবে এবং কতটুকু। চাল লাগলে চাল, ডাল লাগলে ডাল, আর চামচে করে লবণ। এভাবেই চলে।
মা মার মত বেঁচে থাকেন। মাকে খুব নজরে পড়ে না। পড়ার টেবিলে বসে যখন মখু গুঁজে রাখি বইয়ে, মা টেবিলে গরম দধু রেখে যান এক গ্লাস, দুপুরবেলায় রেখে যান শরবত, শরবতের বা দুধের গেলাসেই নজর পড়ে, মাকে নয়। মা যখন পায়খানা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে বসে পড়েন, মাথা বনবন করে ঘুরছে বলে উঠে দাঁড়াতে পারেন না,কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে ভাঙা কণ্ঠে বলেন, পাইলসের রক্ত যাইতাছে খুব বেশি, শরীরটা দুর্বল লাগতাছে, মার শরীর বা শরীরের দুর্বলতার দিকে নজর পড়ে না, পড়ে পাইলস শব্দটির দিকে।
পাইলস কি মা?
পায়খানার রাস্তায় একটা গুটি মত হয়, তারপর পায়খানা কষা হইলে রক্ত যায়।
পাইলসের চিকিৎসা কি?
তর বাপরে কত কইলাম, পাইলসটার একটা চিকিৎসা করাইতে। কই কিছু তো করে না।
হুঁ।
তাই ত কই, বেলের শরবত খাও, শাক সবজি বেশি কইরা খাও। শাক সবজি তো মুখেই তুলতে চাও না। শাক না খাইলে পায়খানা নরম হইব কেমনে! তোমারও ত কষা পায়খানা। পায়খানা নরম থাকলে অর্শ রোগ হয় না।
অর্শ রোগ কি?
ওই পাইলসের আরেক নাম অর্শ।
তাইলে যে রাস্তার কিনারে গাছে টাঙানো সাইনবোর্ড থাকে, এইখানে অর্শ রোগের চিকিৎসা হয়, সেইটা কি এই রোগ?
হ।
মা ধীরে সিঁড়ির কাছ থেকে শরীরটি তুলে ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে কড়িকাঠের দিকে মখু করে শুয়ে থাকেন। শরীর দুর্বল তাঁর। আমি পাশের ঘরে অর্শ শব্দটি নিয়ে ভাবতে থাকি, এত নোংরা একটি রোগের এত চমৎকার নাম কি করে হল!
মার এমনই জীবন। এই জীবন আমরা দেখে যেমন অভ্যস্ত, যাপন করেও অভ্যস্ত মা। একদিন কালো ফটকের শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখি, এক অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলে মা ফটক বন্ধ করলেন।
