যায় নাই, শুইছে।
তুমি না খাইতাছিলা, খাওয়া থেইকা উইঠা পড়লা যে!
মা চাল থেকে কাঠপোকা সরাতে সরাতে বললেন তর বাবা কোনওদিনই আমার খাওয়া সহ্য করতে পারে না।
তুমি ত আর না খাইয়া বাঁইচা রইছ না! এইডা কি বাবা জানে না?
জানে। তবু চোখের সামনে দেখলে চিড়বিড় করে।
বাবার ভয়ে আমরা খেলা ছেড়ে যেমন উঠে যাই, মা তেমন খাওয়া ছেড়ে উঠে যান। বাড়ির সবাইকে খাইয়ে মা রান্নাঘরে অবেলায় খেতে বসেছেন, কাজের বেটি বা মেয়ে যেই থাকে বসেছে সঙ্গে, এররকম দৃশ্য দেখেই আমি অভ্যস্ত এর বাইরে, উৎসব পরবের দিন হলেও বাবা বা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মা খেতে বসেন না। কেন, এই প্রশ্ন কেউ কখনও করেনি, কারও মনে এই প্রশ্নটি নেই বলেই করেনি। আমরা যখন খাব, মা পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের পাতে বেড়ে দেবেন খাবার, মা তাই করেন, এবং মাকে তাই করলে মানায় বলে বাবা যেমন জানেন, আমরাও জানি। মা চমৎকার রাঁধেন এবং বাড়েন বলে বাড়ির সবার বিশ্বাস।
ইশকুল থেকে বিকেলে ফিরে বেশ কদিন এমন হয়েছে যে ক্ষিধে পেটে খাচ্ছি, ওদিকে মা সারাদিন পর তখন দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন, ভাত মাখছেন, মার মুখে চোখ পড়তেই দেখি ঠোঁটের কোণে অপ্রতিভ একটি হাসি, ভাতের থালা নিয়ে শেষ অবদি আমার আড়ালে চলে যান অথবা পরে খাবেন বলে হাত ধুয়ে ফেলেন।
হেসে বলি, কি উইঠা গেলা যে! তুমি শরম পাও নাকি!
মা কোনও উত্তর দেন না। মার হয় না, আড়াল ছাড়া খাওয়া ব্যাপারটি মার একেবারেই হয় না। মা আসলেই শরম পান কারও সামনে খেতে। বাবা বাড়ি এলে অবশ্য মা আড়ালেও খান না, বাবার যে আবার আনাচ কানাচের খবর নেওয়ার অভ্যেস আছে, আড়াল বলে কিছুই এ বাড়িতে তখন থাকে না। বাড়িতে, ধরা যাক বাবা শুয়ে রইলেন, শুয়ে রইলেন বলে যে আমরা খেলতে নামব বা গল্পের বইয়ে হাত দেব তা অসম্ভব কারণ শোয়া থেকে উঠে যে কোনও মুহূর্তে তিনি বেড়ালের মত পা ফেলে ফেলে সারা বাড়ি বিচরণ করতে পারেন, সুতরাং তিনি বাড়িতে, সে যে অবস্থাতেই তিনি থাকুন, এমনকি ঘুমিয়ে, কেউ এমন কিছু করার উদ্যোগ নেয় না, যা বাবা মনে করেন, উচিত নয়। হঠাৎ হঠাৎ বিকেলে বাড়িতে ঢুঁ মারেন বাবা। এমনই একদিন ঢুঁ মারতে গিয়ে, কালো ফটকের শব্দও কেউ সেদিন পায় নি, কোনও ঘোষণাও কেউ দেয়নি সতর্কে হবার, বাবা রান্নাঘরে ঢুকে পেলেন মাকে, খাচ্ছেন।
এত খাও কি? সারাদিন খালি খাওয়া আর খাওয়া। শইলে তেল বাইড়া যাইতাছে খাইতে খাইতে।
শুনে, মা থালা সরিয়ে হাত ধুয়ে নিলেন।
আমি শুনলাম, বাড়ির সবাই শুনল। আমাদের কাছে, এ অনেকটা, রাতে পড়ার টেবিলে বসে ঝিমোতে থাকলে বাবা যেমন বলেন, এত ঘুম আসে কেন! দিন রাইত খালি ঘুম আর ঘুম, শইলে এত আরাম কোত্থে আইল? পিঠে মাইর পড়লেই আরাম ছুইটা যাইব র মত।
ছোটদার সঙ্গে শিল্পসাহিত্য নিয়ে যেমন, রাজনীতি নিয়েও আলোচনা জমে ওঠে।
আচ্ছা ছোটদা ক্যুর পর কেন মেজর ডালিম, রশিদ, ফারুকরে দেশ ছাইড়া যাইতে হইল?
আরে তলে তলে ত একটা সেকেন্ড ক্যু হইয়া গেছে। তখন তো আর ডালিমদের পাওয়ার নাই।
আর সফিউল্লাহ? সে তো সেনাবাহিনী প্রধান ছিল। তারে কেন মাইরা ফেলল না? সে তো মুজিবের পক্ষের ছিল।
মুজিব ত তারে ফোনও করছিল রাতে, বত্রিশনম্বরে আর্মি পাঠাইতে। সফিউল্লাহ জিয়ারে ডাকল, ভোরবেলা জিয়া আইসা কইল দরকার নাই বত্রিশ নম্বরে যাওয়ার। সফিউল্লাহরও করার কিছু ছিল না।
তখন সফিউল্লাহ বুইঝা ফেলছে যে জিয়া তার অর্ডার মানতাছে না!
বুঝব না মানে! সফিউল্লাহ তহন একরকম হাউজ এরেস্ট। আর্মি চিফের অর্ডার কেউ মানতাছে না।
জিয়ারে কে সেনাবাহিনীর প্রধান বানাইল? মোশতাক, নাকি জিয়া নিজেই নিজেরে বানাইল!
কনসপিরেসিতে এরা সবাই ছিল।
খালেদ মোশাররফ যে জিয়ারে বন্দি কইরা ক্ষমতা নিয়া নিল, সেই খালেদ মোশাররফরে তো তিনদিন পরই কর্ণেল তাহের মাইরা ফেলল। তাইলে জিয়া কেন মারল কর্ণেল তাহেররে? জিয়ার ভালর জন্যই তো কর্ণেল তাহের বিদ্রোহডা করছিল।
তাহের তো খালেদ মোশাররফরে সরাইয়া দিয়া জাতীয় সরকার গঠন করতে চাইছিল। জিয়ারে চায় নাই।
কর্ণেল তাহের তো মুক্তিযোদ্ধা ছিল। আবার তো যুদ্ধে পা-ও হারাইছিল। যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধারে কি ফাঁসি দেওয়া যায়? আইচ্ছা, কোনও রাজাকাররে কি ফাঁসি দেওয়া হইছে আজ পর্যন্ত?
না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ফাঁসি একটা মুক্তিযোদ্ধার হইল।
জিয়ার সাথে মেজর ডালিমের বিরোধটা আমি ঠিক বুঝতে পারতাছি না।
তখন আর্মির ল এন্ড অর্ডার নষ্ট হইয়া গেছে। জিয়া সফিউল্লাহরে বঙ্গভবনে বাইন্ধা রাইখা নিজেরে জেনারেল ঘোষণা করল, কিছু লোক তার পক্ষে আইল, কিছু বিপক্ষে গেল।
ডালিম কি বিপক্ষে গেছিল?
না। ডালিমরে বিদেশ পাঠাইয়া দেওয়ার মূল কারণডা হ্ইল, জিয়া চায় নাই, একবার যারা ক্যু এ সরাসরি জড়িত ছিল, তারা তার আশেপাশে থাক। ক্যু কইরা একবার অভ্যাস হইলে যে বারবার ক্যু করতে ইচ্ছা করে।
তাইলে রিস্ক সরাইয়া দিল?
হ। কইতে পারস। যাওয়ার আগে জেলহত্যা কইরা গেল। চারনেতারে খুন কইরা গেল। ওদেরে দিলও তো ভাল ভাল চাকরি দিয়া পাঠাইয়া, এমবাসাডার কইরা দিল ডালিমরে। ডালিমও খুশি রইল, জিয়াও যা পাইতে চাইছিল,পাইল।
মা আমাদের আলোচনার মধ্যে আচমকা ঢুকে বলে বসলেন ডালিম? ডালিম তো পাকছে গাছে, একটা খাইয়া ল না!
