কেবল যে আমার ডিউটি থাকে ওয়াডের্, তা নয়,অন্য ডাক্তারদেরও থাকে। গুরুতর জখম হওয়া এক রোগীর হিস্ট্রি লিখতে গিয়ে এক ডাক্তার বন্ধু লিখেছে, শি ওয়াজ বিটেন। সেটি কেটে দিয়ে নতুন কাগজে হিস্ট্রি লিখে দিই রোগীর ঘটনা বিস্তারিত জেনে।শি ওয়াজ ব্রুটালি হিট বাই হার হাজবেন্ড। দ্যা ক্রুয়েল ম্যান ইউজড অ্যাক্স এন্ড বাম্বু অন হার বডি। হি ওয়াণ্টেড টু কিল হার। হি ইভেন সেইড তালাক টু হার। হার ক্রাইম ওয়াজ দ্যাট হার ফাদার কুডনট পে দাউরি মানি ইন টাইম। ওষুধের লিষ্টিতে একটি এন্টি ডিপ্রেসেন্ট যোগ করে দিই। ডাক্তার বন্ধুটি আমার হিস্ট্রি লেখা দেখে মন্তব্য করে, কে মারল কি দিয়ে মারলো কেন মারল সেটা আমাদের জেনে কি দরকার! আমাদের কাজ হল চিকিৎসা করা। তা ঠিক, এ কথা সব ডাক্তারই বলবে আমি জানি। বাড়তি যে হিস্ট্রিটুকু লিখেছি আমি, লিখে আমার একধরনের তৃপ্তি হয়, মেয়েটিকেও বলেছি, লেইখা রাখলাম যে আপনের স্বামী আপনের এই অবস্থা করছে। হাসপাতালে কাগজে মেয়েটির করুণ দশার কথা লিখে মেয়েটির জীবনের কোনও পরিবর্তন হবে না জানি। তবু লিখলে ক্ষতি কি? ডাক্তারদের যে একেবারে কোনও সামাজিক দায়িত্ব নেই তা নয়। অপারেশনের পর রোগীদের ব্যথা কমাতে পেথিডিন দেওয়া হয়। পেথিডিন পেয়ে শরীর এমন ভাল-লাগায় ভগু তে থাকে যে ব্যথা কমে গেলেও রোগীরা কোঁকাতে থাকে পেথিডিন পেতে। রোগির যেন পেথিডিনে আসক্তি না হয়, ডাক্তার ডি-ডব ্লু ইনজেকশন দিতে নার্সকে ডাকেন। নার্স সিরিঞ্জে ডিসটিল্ড ওয়াটার ভরে রোগীর নিতম্বের মাংসে সুঁই ফুঁটিয়ে আসে। রোগিদের কোঁকানো আর থেকে থেকে নাসর্ বা ডাক্তারকে ডাকা বন্ধ হয়, এভাবেই পেথিডিনের নেশা হওয়া থেকে রোগীদের বাঁচায় ডাক্তার। এ নিশ্চয়ই সামাজিক দায়িত্ব।
ডাক্তার বটে আমি, ওয়াডের্ দিন রাত পড়ে থেকে রোগীদের চিকিৎসা করছি বটে, তবে সব রোগের চিকিৎসা করার অধিকার আমার নেই। গাইনিতে কেবল দিনে নয়, রাতেও ডিউটি পড়ে। সপ্তাহে তিন থেকে চার রাত কাটাতে হয় হাসপাতালে। তো এক রাতের ডিউটিতেই দুটো ঘটনায় আমার ওপর সমন জারি হয়। রাত বারোটায় রোগী এল রিটেইন্ড প্লাসেন্টা নিয়ে। বাচ্চা হয়েছে দুদিন আগে, জরায়ুর ফুল পড়েনি এখনো। রিটেইনন্ড প্লাসেন্টা এলে নিয়ম বড় ক্লিনিক্যাল এসিস্ট্যান্ট বা রেজিস্টারকে ডাকা। কাউকে না ডেকে আমি নিজে চেষ্টা করি ফুল বের করতে। জরায়ুর বন্ধ মুখ ধীরে ধীরে হাতে খুলতে চেষ্টা করে ঘন্টা খানিক পর সফল হই, ফুল বেরিয়ে আসে। সে রাতেই রাত আড়াইটার দিকে এক রোগী আসে, বাচ্চা বেরোচ্ছে না, পানি ভেঙে গেছে দুপুরে, বাচ্চার মাথা জরায়ুর মুখের কাছে এসে আটকে আছে ঘন্টা কয়েক। ভেতরে বাচ্চার অবস্থা যায় যায় প্রায়। যদি বড় ডাক্তারদের খবর দিতে যাই, ওরা ডক্টরস কোয়ার্টার থেকে হাসপাতাল অবদি আসতে আসতে বাচ্চা বেঁচে থাকবে না বলে আমার আশঙ্কা হয়। নিজেই হাতে ফরসেপ নিই। এতকাল অন্যকে দেখেছি ফরসেপ-ব্যবহার করতে, নিজে কখনও ব্যবহার করেনি। আমার সঙ্গে যে ডাক্তারদের ডিউটি ছিল, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আমার কাণ্ড দেখেছে। কাণ্ডটি ঘটার সময়ই একজন দৌড়ে গিয়ে সিএকে কল দিয়ে এসেছে। সিএ যখন এসেছে, বাচ্চাকে অক্সিজেন দিয়ে স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়ানো হয়ে গেছে। আমি তখন সেলাই করছি ফরসেপের জন্য প্রশস্ত করা যোনিদেশ। সকাল আটটায় অধ্যাপক আসেন। তিনি পৌঁছোনোর দুমিনিটের মধ্যেই তাঁকে ঘটনা জানানো হয়। ক্যান্টিন থেকে চা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে অধ্যাপকের সঙ্গে ওয়ার্ড রাউন্ড দিতে এসেছি, দিয়ে চলে যাবো বাড়িতে, ঘুমোতে। যদিও ডাক্তার হয়ে গেছি, জোবায়েদ হোসেনের সামনে কিন্তু আগের মতই, ছাত্রী। তাঁর পেছন পেছন ওয়াডর্গু লো ঘুরতে হয় সকাল বেলা, ঘোরার সময় ছাত্রী অবস্থায় বুক কেঁপেছে, ডাক্তার হয়েও কাঁপে। বাঘের সামনে দাঁড়ানো আর জোবায়েদ হোসেনের সামনে দাঁড়ানো এক কথা। অধ্যাপক জোবায়েদ হোসেন রাউন্ড দিতে শুরু করে দিয়েছেন। আমি রাউন্ডে ঢুকতে গেলেই তিনি আমার দিকে এগোন। চশমার তলে বাঘের দৃষ্টি। আমাকে এক্ষুনি ভক্ষণ করার মত কি কাণ্ড ঘটেছে, তা ঠাহর করার আগেই তিনি বললেন, তুমি রিটেইন্ড প্লাসেন্টা ম্যানুয়েলি রিমুভ করছ? হ্যাঁ স্যার।
জোবায়েদ হোসেনের পেছনে থেকে পঁচিশ জোড়া চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সুন্দরবনের মাচায় বসে বাঘের হরিণ খাওয়া দেখতে যেমন উৎসুক চোখ, সে রকম। আবারও জোবায়েদ হোসেনের গলা থেকে হালুম হালুম,তুমি ফরসেপ ডেলিভারি করেছ?
হ্যাঁ স্যার।
কেন করেছ?
বাচ্চার অবস্থা খারাপ ছিল।
রিটেইন্ড প্লাসেন্টা ম্যানুয়ালি রিমুভ করছ কেন?
রোগির অবস্থা খারাপ ছিল। তাই..
যদি কোনও এক্সিডেন্ট হত?
রোগি ভাল আছে। একটু আগে দেখে এসেছি। বাচ্চাও ভাল আছে।
রোগি ভাল আছে, এটা কোনও এক্সকিউজ না।
আমাকে বাহা−ন্নাটি চোখের সামনে মাথা নত করতে হয়। সেই সকালেই জোবায়েদ হোসেন বড় একটি নোটিশ ঝুলিয়ে দেন প্রসুতি কক্ষে, ইন্টানির্ ডক্টরস আর নট এলাউড টু ডু এনিথিং উইদ ফরসেপ ডেলিভারি এন্ড রিটেইন্ট প্লাসেন্টা।
সেই জোবায়েদ হোসেনই, পরদিন প্রসুতিকক্ষে এক রোগী এপিসিওটমির জন্য বসে ছিল অপেক্ষায়, ডাক্তার নেই ডাক্তার নেই! কোথায় ডাক্তার! হাতের কাছে একজনকে পাওয়া গেলেই খপ করে ধরে রোগী পড়ে আছে কেন লেবার রুমে জিজ্ঞেস করতেই ডাক্তার ইতিউতি তাকিয়ে ঢোক গিলতে গিলতে যখন বলল, স্যার তসলিমার কথা ছিল এপিসিওটমি করার, তিনি দাঁত খিঁচিয়ে বললেন,তসলিমাকে দোষ দিতে চাও তো! শোনো, ওরই সাহস আছে কিছু করার। কারেজিয়াস মেয়ে। সেই পারবে ডাক্তারি করে খেতে। তোমার মত মূষিক পারবে না।
