চৌদ্দটা না, তেরোটা।
কি পার্থক্য? চৌদ্দটা না কইরা তেরোটা করলে তোমার কাছে ভাল মনে হয়? বাবা দুইটা বিয়া করছে, খবর শুইনা ত তুমি বাবারে অমানুষ বইলা গাল দেও। তোমার নবীজিরে গাল দেও না কেন?
তখনকার সময় আর এখনকার সময় এক না। তখন সমাজের অবস্থা অন্যরকম ছিল।
এহন সমাজের অবস্থা কি রকম? এহন তো চারটা বিয়া করতে পারে পুরুষ মানুষ! বাবা যদি তিনটা বউ আইনা বাড়িত রাখে, তুমি কি করবা? থাকতে পারবা তিন সতিন নিয়া?
মা মুখ বিষ করে কোরান বন্ধ করে রেখে বলেন, নবীজি কাউরে এক বাড়িতে রাখেন নাই।
এক বাড়িতে রাখেন নাই, তাতে কি হইছে? এক বাড়ি থেইকা আরেক বাড়িতে তো গেছেন। বিবিদের চাকরানিদেরও ওপর তো লোভ করছেন! তাদেরও তো ভোগ করছেন। কাউরে তো ভোগ করতে বাদ রাখেন নাই!
যা করছেন আল্লাহর হুকুমে করছেন।
আল্লাহ এইরকম জঘন্য হুকুমই বা দিছেন কেন? প্রেরিত পুরুষ! মহানবী! সকলের শ্রদ্ধার মানুষ! তার চরিত্রটা তো আল্লাহ একটু ভাল বানাইতে পারতেন।
নাসরিন, তুই নবীজিরে নিয়া বাজে কথা বলতাছস। তর তো দোযখেও স্থান হইব না। তর যে কি হইব? তর কপালে যে কি আছে!
মার সঙ্গে এরকম কথা হওয়ার পর মা বারান্দায় একলা বসে থাকেন অথবা জানালার দিকে মুখ করে চুপচাপ শুয়ে থাকেন। আমি অনুমান করি মা ভাবছেন প্রেরিত পুরুষের কথা, কেন আল্লাহর প্রেরিত পুরুষটি কোনও আদর্শ চরিত্রের হলেন না! কেন তিনি সমালোচনার উর্ধে ওঠার মত হলেন না! এধরনের কথা হওয়ার পর মা অনেকক্ষণ পর আমার কাছে এসে আমার বুকে মুখে সুরা পড়ে ফুঁ দেন। নরম গলায় বলেন, তওবা করো আল্লাহর কাছে। বল যে ভুল হইছে তোমার। ভুল করছ। আল্লাহ ক্ষমা কইরা দিবেন। আল্লাহ থাকলে তো ক্ষমা করবেন?
যদি থাকেন! যদি থাকেন! যদি আল্লাহ থাকেন? তাইলে কি করবি? তাইলে কি অবস্থা হইব তর, একবার চিন্তা করছস?
মা যখন খুব মন দিয়ে ফরজ সুন্নত নফল সব রকমের নামাজ পড়তে থাকেন, আর আমি যখন বলি, কেন যে এইসব পড়! কি লাভ? মরার পর দেখবা আর জীবিত হইতাছ না। ফক্কা। কোনও দোযখও নাই। কোনও বেহেসতও নাই। তহন?
মা বলেন, হ যদি দেখি কিছু নাই, তাইলে তো নাইই। আমার সব ইবাদত বথৃা গেল। কিন্তু, যদি থাকে? যদি থাকে সব?
মা এই যদির ওপর আশঙ্কা করে নামাজ রোজা করেন। যদি শেষ বিচারের দিন বলে কিছু থাকে, তবে যেন ভাল ফল পান। আমার মনে হয় কেবল মা নন, আরও অনেকে এই যদি র কারণেই আল্লাহ রসুল মেনে চলে। মার সঙ্গেও তর্কে বেশিদূর এগোয় না।
হাসপাতালের রোগীদের ওপর, যেহেতু রোগিরা আল্লাহর পরই যে মানুষকে বিশ্বাস করে, সে হল ডাক্তার, খানিকটা কঠোর হই। ডাক্তারদের আদেশ উপদেশ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। করলে কি!বালিশের নিচে মৌলানার ফুঁ দেওয়া গাছের শেকড় রাখে, অসুখ ভাল হলে ডাক্তারের চিকিৎসায় নয়, শেকড়টির কারণে অসুখ ভাল হয়েছে বলে বিশ্বাস করে। এক রক্তশূন্যতার রোগিকে সন্ধানী থেকে যোগাড় করে চার ব্যাগ রক্ত দিয়ে আর ওষধু দিয়ে যায়-যায় হৃদপিণ্ডকে ভাল করে তোলার পর রোগিকে উঠে বসতে বলি। উঠতে গিয়ে লোকের বালিশ সরে যায়। বালিশের তলে একটি শেকড়।
এইটা কি?
দোয়া পড়া শেকড়।
এইটা কাছে রাখছেন কেন?
রোগি হেসে বলে, এইটা রাখলে রোগ বালাই দূর হয়, তাই রাখছি।
কি মনে হয় ডাক্তারের ওষুধে ভাল হইছেন নাকি ওই শেকড়ে?
রোগী বলে, এবারও হেসে, ওষধু দিয়া চেষ্টা করছেন ভাল করতে। কিন্তু আল্লায় ভাল করছে। আল্লাহ ছাড়া কেউ কি বাচাইতে পারে? শেকড়ডাতে আল্লাহর কালাম পইড়া ফুঁ দেওয়া আছে।
এরপর যে রোগিই আসে, আগে দেখি হাতে পায়ে কোমরে বাধাঁ কোনও তাবিজ আছে কি না, কোনও শেকড় আছে কি না। থাকলে ওগুলো নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পরে চিকিৎসা শুরু করি। বলে দিই তাবিজ কবজ কাছে রাখলে চিকিৎসা পাইবেন না। ওইসব যদি রোগ ভাল করে বইলা মনে করেন তাইলে বাড়ি যান। বাড়ি গিয়া শেকড় বালিশের নিচে রাইখা শুইয়া থাকেন। তাবিজ কবজ শরীরে বান্ধেন। যত মৌলবি আছে সবার ফুঁ লন। পড়া পানি খান। রোগ কি কইরা ভাল হয় দেখব।
এক এক ওয়ার্ডের এক এক দিন ভর্তির তারিখ থাকে। ওদিন নাগাড়ে রোগী আসতে থাকে। বিছানা ভরে যায়, এমন কি মেঝেও। প্রতিটি রোগীর হিস্ট্রি লেখা, প্রতিটি রোগীর মাথা থেকে পা অবদি পরীক্ষা করা, রোগ নির্ণয় করা, প্রতিটি রোগীর জন্য প্রাথমিক ওষধু লিখে দেওয়া,মরো মরো রোগী এলে নিজে সামলাতে না পারলে বড় ডাক্তারদের খবর দেওয়া ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। পুরুষ রোগীর চেয়ে মেয়ে রোগীর সংখ্যা কম হাসপাতালে। মেয়েরা মৃত্যপু থযাষনী হওয়ার আগে তাদের কেউ হাসপাতালে আনে না। বিষ খেয়ে মরছে কোনও মেয়ে, শরীরের কোথাও ছোট্ট কোনও পলিপ থেকে না- চিকিৎসায় না-চিকিৎসায় ক্যান্সার ঘটিয়ে আসা মেয়ে—প্রতিটি মেয়ের শরীরে রক্তশূন্যতা, পুষ্টিহীনতা। আমি এদের কাছ থেকে, কেবল ডাক্তার যেটুকু জানলেই চলে, তার চেয়ে, অধিক জানতে আগ্রহী। সংসারের সবাইকে ভাল খাইয়ে নিজেরা এঁটো কাঁটা খায়! অসুখ বিসুখ পুষে রাখে শরীরে। মেয়েদের অসুখ হলে সংসার চলে না, তাই। অসুখের কথা জানালেও বাড়ির লোকেরা তেমন গা করে না। অসুখ দেখতে গিয়ে ডাক্তাররা ছোঁবে মেয়েদের, এ জিনিসটিতে বাড়ির পুরুষেরা সায় দেয় না। তাই অসুখ পোষা ছাড়া মেয়েদের আর করার কিছু থাকে না। নিজেরা একা চলে আসবে হাসপাতালে এই সাহস তাদের নেই। বিবাহিত মেয়েরা অসুখ নিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি বেড়াতে গেলে, সাধারণত বাপের বাড়ি থেকেই তারা আসে হাসপাতালে, বাপের বাড়ির আত্মীয়রা নিয়ে আসে।
