ফিক্সড ডিউটিতে ব্যস্ত থাকার সময়ই মা একদিন বলেন, বাজানের শইলডা বালা না। কেন, কি হইছে?
চলতে ফিরতে পারে না। উল্ডা পাল্ডা কথা কয়।
কেন, সেইদিন না জাম্পার লইয়া আইল!
নানা পকেটে করে বা প্যাকেটে করে কিছু না কিছু আনেন,সামান্য হলেও আনেন, যখন আসেন। মেয়ের হাতে একটি বিস্কুট হলেও দিয়ে বলেন, মা, তুমি খাইও। একগাদা লান্ডির জাম্পার দিয়ে গেছেন, ওগুলো দিয়েই আমাদের অনেকগুলো শীত চলে যাবে। নানা কেন অসুস্থ হবেন! মাত্র দু সপ্তাহ আগে নানিবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম, তিনি দিব্যি সুস।্থ খাচ্ছেন। পাতে মাছের ঝোল ঢেলে দিতে দিতে নানি বলছেন, দোকানে তো আয় তেমন হইতাছে না। নানার দাতা হাতেমতাই স্বভাব আর যারই পছন্দ হোক, নানির মোটেই পছন্দ নয়।
আয় লাগব না, যা আছে তাই ভাল। কই একটু নুন দেও ত! শীতল পাটিতে আসন করে বসে ভাত মাখতে মাখতে মাখতে বললেন নানা।
নানি নুনের বয়াম নানার দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, আয় না করলে চলব! পুলাপান খাইব কি!
পুলাপান কি না খাইয়া থাকে নাকি?
দোকানের বাবুর্চিরা নিজেরা বড় বড় দোকান দিয়া হাজার টাকা ঘরে নিতাছে। আপনের তো পসার কিছু হইল না।
ওরা চুরি করলে আমিও কি চুরি করুম নাকি?
আপনেরে চুরি করতে কইতাছি না। ব্যবসাডায় মন দিতে কইতাছি।
ব্যবসায় যে মন নেই নানার, সে নানি বেশ ভাল জানেন। সেদিনও দোকানে হুট করে ঢুকে দেখলেন রাস্তার তিনটে পাগল চেয়ারে ঠ্যাং তুলে হাপুস-হুপুস খাচ্ছে। নানা পাশে বসে পাগলদের পাতে বড় বড় মাংস তুলে দিচ্ছেন। নানি বললেন, গাহেকের খবর নাই, পাগল খাওয়াইতাছেন বওয়াইয়া? নানা ভেংচি কেটে বললেন, আমার দোকান, আমি যারে ইচ্ছা খাওয়াইয়াম। তোমার কি? যাও যাও বাড়িত যাও।
দুটো গ্রাস মুখে দিয়েছেন কি দেননি, নানি গেলেন কলতলায়, ঠিক পেছন পেছন তিনি ভাতের থাল হাতে উঠে পুরো পাতের ভাত ঢেলে দিলেন উঠোনে।
কী ব্যাপার ভাত ফালাইছেন কেন? কলতলা থেকে চেঁচিয়ে নানি বলেন।
কুত্তা টুত্তা আছে খাইব নে!
নানির কাছে এ নতুন নয়। প্রায়ই তিনি দেখেন নানা জানলা দিয়ে টুকরো টুকরো করে পাউরুটি ছুঁড়ছেন।
কি ব্যাপার পাউরুটি বাইরে ফেলতাছেন কেন?
নানা বলেন, পিপঁ ড়া পপু ড়া আছে, খাইব নে।
পুলাপান পাউরুটি পায় না, আর আপনে পিপঁ ড়ারে পাউরুটি দেইন!
খায়রুন্নেসা, ওরাও তো আশা করে। নানা মধুর হেসে বলেন।
পকেটের বাতাসাও পুকুর পাড় দিয়ে আসার সময় পুকুরে ছুঁড়ে ফেলেন।
কেন?
মাছ টাছ আছে, খাইব। ওরাও তো আশা করে।
অবকাশেও এরকম ঘটে। মা ভাত বেড়ে দিলেন, বড় রুই মাছের টুকরো পাতে দিয়ে ডাল আনতে গেলেন বাটি করে। এসে দেখেন নানার পাতের মাছ পাতে নেই, পাতে শাদা শুকনো ভাত। রুই মাছ টেবিলের তলায়, বেড়ালে খাচ্ছে।
কি বাজান,মাছ বিলাইয়ে খায় কেন?
নানা হেসে বললেন দেখি তো তুমার ডাইলডা। কেমন রানছ দেখি।
ডাইল দিতাছি। কিন্তু মাছ ফালাইয়া দিছেন কেন?
আরে ফালামু কেন? বিলাইয়ের কি পছন্দ অপছন্দ নাই! ওদের কি কাঁটা খাইতে ইচ্ছা করে! মাছ টাছ ওরাও তো আশা করে!
কলতলা থেকে ফিরে এসে গামছায় মুখ মুছতে মুছতে নানি বললেন, মানুষের খবর নাই, আছে কুত্তা বিলাই লইয়া। রাস্তার পাগলা খাওয়াইয়া দোকানের বারোডা বাজাইছে। শান্তি আর এ জীবনে হইল না।
ততক্ষণে নানা নকশি কাথাঁর তলে। বিছানায়। ঘুমোচ্ছেন। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর নানা লম্বা ঘুম দেন, ঘুম থেকে উঠে আবার দোকান। নতুন বাজারের মুখে পৌঁছলেই নানার পেছন পেছন ও পাড়ার যত পাগল আর ভিখিরি পিছু নেবে। টাকা পয়সা পাউরুটি বাতাসা বিলিয়ে হাঁটতে থাকবেন তিনি, দোকান অবদি পৌঁছলে পকেটে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, তখন হাত দেবেন ক্যাশবাক্সে, মুঠি ধরে দেবেন দবির পাগলকে। দবির পাগল নানার খুব প্রিয় পাগল। ওই দবির পাগলের জন্যই নানা একবার খালি গায়ে বাড়ি পৌঁছেছিলেন।
কি ব্যাপার, পাঞ্জাবি কই?
দবিরডার পরনের জামা নাই। রাস্তায় আধা ল্যাংডা খাড়োইয়া রইছে।
তাই বইলা নিজের পরনের পাঞ্জাবি খুইলা দিয়া আইছেন?
না দিলে এই শীতের মধ্যে ও বাঁচব কেমনে!
আর এই শীতের মধ্যে আপনে কেমনে খালি গায়ে রইছেন?
আরে শীত কই তেমন! হাইটা আইছি ত। হাঁটলে শরীর গরম থাকে খায়রুন্নেসা।
নানি আর কথা বাড়ান না। লাভ নেই বলেই বাড়ান না। নানাকে তিনি চার যগু হল চেনেন। টিনের এই চৌচালা ঘরে সংসার পেতেছিলেন সেই কবে, ছেলে মেয়ে হল, তাদের বিয়ে হল, নাতি নাতনি হল, পুতিও হল, কিন্তু চালা ঘর ঠিক তেমনই আছে, যেমন ছিল। একটি খুঁটিও পাল্টোনি। চোখের সামনে ধাঁ ধাঁ করে এ বাড়ির চাকর বাকররাও বড়লোক হয়ে গেছে, রীতিমত দালান তুলেছে বস্তিতে। নানির অবশ্য দালানের লোভ নেই। কোনওভাবে খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেন। নানির ভাবনা টুটুমামা আর শরাফ মামাকে নিয়ে। এ দুজন লেখাপড়া ছেড়ে পীরবাড়িতে ভিড়েছিল। সংসার চালানোর কোনও ক্ষমতা না থাকলেও হুট করে বিয়ে করেছেন, কদিন পর পর এখন নানির কাছে হাত পাতেন। শেষ পর্যন্ত দুই ছেলের হাত পাতার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে নানি নিজে গিয়ে আমিরুল্লাহকে ধরেন, কিছু একটা গতি করুইন বেয়াই সাব, টুটু আর শরাফ আল্লাহর পথে আইছিল দুনিয়াদারির লেহাপড়া ছাইড়া। এহন তো চাকরি বাকরি পাওনের যোগাড় নাই। পয়সাকড়ি না থাকলে খাইব কি! আপনে একটা ব্যবস্থা কইরা দেন।
