এমনি।
কেউ এমনি এমনি সাজে না। কোনও কারণ থাকে।
কোনও কারণ ছাড়া কি সাজা যায় না?
পিছনে কারণ থাকেই। তুই চাস তর রূপ দিয়া মানুষরে মগ্ধু করাইতে। ঠিক না?
না ঠিক না। আমার ভাল লাগতাছে সাজতে, তাই সাজতাছি।
তাইলে তুই ঘরে যখন থাকস, তখন এইরকম সাজস না কেন? ঘরের বাইরে বার হওয়ার জন্য তর খয়েরি ঠোঁটটারে লাল করস কেন?
ইয়াসমিন কোনও উত্তর দেয় না। আমি −শ্লষ গলায় বলি, তুই কি ভাবছস মুখে রং মাখলে তরে সুন্দর লাগে দেখতে? মোটেই না। নিজের যা আছে, তা নিয়া থাকাই সবচেয়ে ভাল। নিজের আসল চেহারা রঙের মুখোশ পইরা নষ্ট করিস না। কৃত্রিমতার আশ্রয় নেওয়ার দরকার কি তর! তর অভাব কিসের? নিশ্চয়ই ইনফিরিওরিটি কম−প্লক্সে ভগু তাছস!
ইয়াসমিন আমার যুক্তি মেনে নেয় না, সেজে যায়।একটি শীত শীত ভয় আমাকে বুকে হুল ফোটাতে থাকে।
হাসপাতালে পোস্টমাস্টারের ঠিকানায় রুদ্রর চিঠি আসে, চিঠি পেয়েই ঢাকা চলে এসো। মেডিসিন ওয়াডের্ ডিউটি আমার। ডিউটি থেকে একদিন কেন, এক ঘন্টার জন্যও ছুটি নেই। ছুটি নেওয়ার জন্য আমি পরদিন থেকে চেষ্টা করতে থাকি। ছুটি তিনদিন পরও নেওয়া যায় না। ওদিকে বাবাও একটি চিঠি পেয়েছেন। রুদ্রর বাবা শেখ ওয়ালিউল্লাহর চিঠি। কি লিখেছেন তিনি, কিছুই আমার জানা নেই। রুদ্রও এ সম্পর্কে আমাকে কিছু বলেনি। মার কাছে শুনি চিঠির কথা। মাকে হুংকার ছেড়ে ডেকে নিয়ে বাবা চিঠি দেখিয়েছেন, আমার পথভ্রষ্ট পুত্র শহিদুল্লাহ অবশেষে আপনার কন্যাকে বিবাহ করিয়া সঠিক পথে চলিবে বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছে। তাহাদের বিবাহকে মানিয়া লইয়া তাহাদিগকে সুখে শান্তিতে বসবাস করিবার সুযোগ দিয়া বাধিত করিবেন ইত্যাদি। বাবা তাঁর কালো মিশমিশে চুল খামচে ধরে অনেকক্ষণ বসেছিলেন। এর পর বিকেলে রোগী দেখা বাদ দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে রইলেন বিছানায়। চোখ কড়িকাঠে। মা শিয়রের কাছে বসে বাবার মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে দেন। বাবা ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, চুলগুলা জোরে জোরে টাইনা দেও। জোরে চুল টেনে চুল ছিঁড়ে চলে আসে হাতে, তবু মাথার যন্ত্রণা বাবার মাথাতেই থাকে। ঘুমের ওষধু খেয়েও ঘুম আসে না।
কি কইরা বিয়া করল, কখন করল! কেন করল!
আমারে কি কয় কিছু এইসবের! যা ইচ্ছা তাই করে।
এত সাহস কি কইরা হইছে তার?
সাহস না। আসলে সরল সোজা পাইয়া মেয়েটারে পটাইছে। এমন সুন্দর ডাক্তার মেয়ের সামনে দাঁড়ানোর কি যোগ্যতা আছে ছেলের? নিজের সর্বনাশ করল নাসরিন। বাবা কড়িকাঠে চেয়েই অপলক চোখ রেখে বলে যান, তার বাপেই তারে কইল পথভ্রষ্ট ছেলে। একবার ভাবো, কতটুকু খারাপ ছেলে হইলে বাপে পথভ্রষ্ট ছেলে কয়। কামাল তো কইছে ছেলে নাকি সিগারেট খায় মদ খায়।
বাবার মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিজের আগুন-জ্বলা বুকে হাত ঘঁষেন, চোখ ভিজে ওঠে, চোখের জল গাল বেয়ে বুকে নামে,বুকের আগুন তবু নেভে না, এই বুকের মধ্যে রাইখা মেয়েটারে পালছি। আপনে বেডিগর পেছনে পেছনে ঘুরছুইন। মেয়েটারে কোলে নিয়া চোক্ষের পানি ফালাইছি। এই বুকটার মধ্যে দিন রাইত পইড়া থাকত। মেয়ে বড় হইছে, ডাক্তার হইছে। কত বড় অনুষ্ঠান কইরা কত আয়োজন কইরা দেইখা শুইনা একটা ভাল ছেলের সাথে বিয়া হইব। সারা শহর জানব যে বিয়া হইতাছে। আর কি ভাবে সে বিয়া করল?কারে করল, কি জানে এই ছেলের সম্পর্কে সে?
মার চোখের জল ফুরোয় না। বাবার ঘুমও আসে না। আমি অন্য ঘরে ব্যাগে কাপড় গুছিয়ে নিই। ঢাকা যাব।
বাবাকে বা মাকে কিছু না বলে আমি কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কার কাছে যাচ্ছি কবে ফিরব আমি ঢাকা রওনা হই। মেডিসিন বিভাগে ডিউটির কি হবে তাও আর ভাবি না। মা পথ আটকেছিলেন,পাশ কেটে আমি বেরিয়ে যাই। ঢাকা পৌঁছি দুপুরে। বাসস্ট্যান্ড থেকে রিক্সা করে তাজমহল রোডের বাড়িটিতে গিয়ে দেখি দরজায় তালা, রুদ্র নেই ঘরে। কিন্তু জানি সে ঢাকায় আছে, অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও পথ নেই। দ্বিতীয় দরজা যেটি ভেতর থেকে বন্ধ, আধঘন্টার পরিশ্রমে খানিক ফাঁক করে ফাঁকের ভেতর আড়াআড়ি বসানো খিলটি ওপরের দিকে তুলে দিতেই দরজা খুলে যায়। ভেতরে সব আছে, রুদ্র নেই। টেবিলে পড়ে আছে অপেক্ষার দিনলিপি,তুমি এখনো আসছো না কেন? আমি অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করছি। তুমিহীনতা ছড়িয়ে আছে সারা ঘরে। আমার ভাল লাগছে না। কখন এসে পৌঁছবে তুমি! সারাদিন ঘরে আর বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করি, অপেক্ষার হাঁটাহাঁটি। প্রতিটি মুহর্ত আমার অপেক্ষায় কাটে। বিকেল পার হয়। রুদ্র আসে না। ঘরে বসেই অপেক্ষা করতে হবে, দরজা খোলা রেখে কোথাও তাকে খুঁজতেও যেতে পারি না। অপেক্ষা করতে করতে সন্ধে পেরিয়ে যায়। রাত হয়। রাত সাতটা আটটা নটা দশটা হয়ে যায়, রুদ্র ফেরে না। বাড়িঅলার বাড়ি থেকে আমার জন্য থালায় করে খাবার আসে। রাত বারোটাও যখন বেজে যায়, বাড়িঅলার বউকে বলি, আমার খুব ভয় লাগছে ঘরে, আপনাদের বাতাসিকে দেবেন আমার ঘরে শুতে? বউটি ভাল মানুষ। কাজের মেয়ে বাতাসিকে কাথাঁ বালিশ দিয়ে পাঠিয়ে দেন। আমি বিছানায়, বাতাসি মেঝেয় কাঁথা বিছিয়ে। রাত পার হয়। ঘুম থেকে বাতাসি জাগে, আমার জাগার কোনও দরকার হয় না। জেগেই ছিলাম, মুখে পানি ছিটিয়ে দিন শুরু করি আবার। অপেক্ষার দিন। অপেক্ষার অসহ্য প্রহর। অপেক্ষা আমার কোনও কালেই ভাল লাগে না, মন দিতে চেষ্টা করি কবিতায়, পারি না। অক্ষরে চোখ, মন দরজায়। সারা বিকেল দাঁড়িয়ে থাকি ঝুল বারান্দায়। সারা বিকেল তাজমহল রোডের দিকে আসা প্রতিটি রিক্সায় বসা লোক দেখি, দেখি রুদ্র কি না। রুদ্র যদি একবার জানত আমি এসেছি, ছুটে চলে আসত খুিশতে! কেন সে ভাবছে না যে আমি এসেছি, কেন সে একবারও ভাবতে পারছে না! রুদ্র কোথায় রাত কাটিয়েছে তা আমার সমস্ত কল্পনা দিয়েও আমি অনুমান করতে পারি না। সন্ধে নেমে আসে,রুদ্র ফিরবে এক্ষুনি এই আশায় বসে থাকি। ঘরে ইঁদুর দৌড়োয়, বাইরে লোক হাঁটে, যে কোনও শব্দকেই রুদ্রর বাড়ি ফেরার শব্দ ভেবে ভুল করতে থাকি। যে কোনও রিক্সার টুং টং শব্দকে রুদ্রর রিক্সা ভেবে ভুল করতে থাকি। দিন পার হয়। আবারও রাত আসে। রাত সাড়ে দশটায় বাতাসি কাঁথা বালিশ নিয়ে এঘরে শুয়ে পড়েছে। আমি জেগে থাকি। সাড়ে বারোটায় দরজার শব্দে লাফিয়ে উঠি আনন্দে। হৃদপিণ্ডে উত্তেজনার ঢোল বাজে। দরজা খুলে রুদ্র ঢোকে। বাতাসি কাথাঁ বালিশ নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়। এ কে বেরোলো? এ কে? রুদ্র চেঁচাচ্ছে। এ বাতাসি। বাতাসি কেন? বাতাসি কি চায়? বাতাসি কিছু চায় না। ঘুমোতে এসেছিল। কেন ঘুমোতে এসেছিল? আমি ডেকেছিলাম। কেন? কে ডেকেছিলে? রাতে ভয় লাগে বলে। ভয়? কিসের ভয়? ভয় আবার কিসের? রুদ্র দরজা সশব্দে বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়ায়। এবার আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে সে। কিন্তু আমাকে জড়িয়ে ধরছে না, চুমু খাচ্ছে না। আমি রুদ্রর দিকে এগোতে থাকি, তার নাগালের দিকে যেন সে আমাকে স্পর্শ করতে পারে, যেন আমাকে তার উষ্ণ আলিঙ্গনে বেঁধে হৃদয় শীতল করতে পারে। আমার ঠোঁটজোড়া এগোতে থাকে তার ঠোঁটের নাগালে, যেন দীর্ঘ দিন পর আমার ঠোঁটজোড়া তার ঠোঁটের ভেতর নিয়ে উষ্ণ উষ্ণ লালায় ভিজেয়ে −তঁতুলের মত চুষে রক্তহীন করে দিয়ে সুখ পেতে পারে। আমার মসণৃ কন্ঠদেশ এগোয়, যেন সে দাঁতে ঠোঁটে জিভে চেপে রক্ত জমাট করে আনন্দ পেতে পারে।যেন তার অপেক্ষার কষ্টগুলো শরীর থেকে মন থেকে একটু একটু পলেস্তারা খসার মত খসে যায়। এই আমি রুদ্র। তোমার অপেক্ষার দিন ফুরিয়েছে, আমাকে নাও।কিন্তু আমার মুখোমুখি যে লোকটি ,সে কি সত্যিই রুদ্র! বিশ্রি গন্ধ বেরোচ্ছে মখু থেকে। কড়া স্পিরিটের গন্ধ।যেন গ্যালন গ্যালন নেল পালিশের রিমোভারে স্নান সেরে এসেছে সে। টলছে সে। টলতে টলতে কিছু বলতে চাইছে। শব্দ জড়িয়ে যাচ্ছে মুখে। আমি থমকে দাঁড়িয়ে থাকি, হৃদপিণ্ডে উত্তেজনার ঢোল আচমকা বন্ধ হয়ে গেছে, একটি আতঙ্ক হিশহিশ করে এগোচ্ছে। সামনে নয়, পেছনে ফেলতে থাকি পা। পা দু পা করে পেছনে। গন্ধ থেকে পেছনে, রক্তচোখ থেকে পেছনে। আমাকে ধরতে রুদ্র হাত বাড়ায়। যেন হাডুডু খেলছে, খপ করে ধরে ফেলে জিতে যেতে চাইছে। দূরে সরতে থাকি আমি। রুদ্রকে মোটেও চেনা কোনও মানুষ মনে হয় না।মাতাল কোনও লোক আমি আমার জীবনে এর আগে কখনও দেখিনি। এই প্রথম। এই প্রথম কোনও মাতাল লোক দেখা, ভয়ে আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপে। আমাকে পেছনে হটতে দেখে জোরে হাসছে সে, হাসিটি বীভৎস। গভীর জঙ্গলে যেন আটকা পড়েছি কোনও হায়েনার হাতে। এমন করে রুদ্রকে আমি হাসতে দেখিনি কখনও। পেছোতে থাকি। হৃদপিণ্ডে ঢিপঢিপ ধিকধিক বাড়ছে। রুদ্রর শব্দ একটির ওপর আরেকটি ঢলে পড়েছে। জড়ানো শব্দে চেঁচাচ্ছে,কেন তোমার আসতে দেরি হল? দেরি হল বলে সে অদ্ভুত অচেনা চোখে তাকাচ্ছে, কর্কশ কণ্ঠে কদাকার চিৎকার। এগোচ্ছে আমার দিকে। আমি পালাবার কথা ভাবি। দৌড়ে গিয়ে বাড়িঅলার বাড়িতে আশ্রয় চাওয়ার কথা ভাবি। দেয়াল ঘেঁষে নিজেকে হাডুডুর খপ থেকে সনপ্তর্ ণে বাঁচিয়ে দরজার দিকে যেতে নিলেই রুদ্র আমাকে খামচি দিয়ে ধরে, চুল ধরে হেঁচকা টানে কাছে আনে। সেই উৎকট গন্ধের মধ্যে আমাকে ডুবিয়ে বলে, কেন দেরি করলে? কেন যেদিন চিঠি পেয়েছ সেদিনই আসনি? কণ্ঠ কাঁপে যখন বলি, ছুটি পাইনি। কেন পাওনি? আবারও চিৎকার। কদাকার। রুদ্রর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পেছনে যেতে যেতে দেয়ালে আটকে থাকি। জানালার কিনারে রাখা থালবাসন তছনছ করে কিছু খোঁজে সে। তোশকের তল, চৌকির তল, খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় ছুরি, মহররমের মিছিলে যেমন আকাশের দিকে তুলে তলোয়ার নাচায় হায় হাসান হায় হোসেন করা ধর্মান্ধগুলো, তেমন করে রুদ্র তার হাতের ছুরিটি নাচায়। ছুরিটি দেখে আমার চোখ বুজে আসে। আমি কান্না আটকে রাখি। শ্বাস আটকে রাখি। সে কি আমাকে খুন করবে এখন! করবে। খুনের নেশায় উদ্বাহু নৃত্য করছে সে। এই তাজমহল রোডের বাড়িটিতে আজ রাতে আমাকে মরে যেতে হচ্ছে। আমার জীবনের এখানেই সমাপ্তি। কেউ জানবে না, আমার বাবা মা ভাই বোন কেউই কোনওদিন জানবে না এই বাড়িটিতে কি করে মরতে হয়েছে আমাকে। কেউ হয়ত জানবেও না যে আমি মৃত। খবরটি ওদের কে দেবে! রুদ্র আমাকে বস্তায় পুরে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে হয়ত! একবার কেন আমাকে রক্ষা করতে বাড়িঅলার বাড়ি থেকে কেউ আসছে না! রুদ্র আমার বুকে ছুরি তাক করে ধেয়ে আসতে থাকে দেয়ালে আটকে থাকা আমার দিকে। এই মুহূর্তে হাতের কাছের দরজাটি খুলে ঝুল বারান্দা থেকে নিচের রাস্তায় ঝাপঁ দেওয়া ছাড়া আমার আর পথ নেই যাওয়ার। আমার সামনে মৃত্যু, পেছনে মৃত্যু। একা অসহায় দাঁড়িয়ে থাকি। আমার কথা বলার, কাঁদার, এমনকি শ্বাস ফেলারও কোনও শক্তি নেই। রুদ্রর হাত থেকে এই ছুরি আমি শক্তি খাটিয়ে নিতে পারব না, অসুরের শক্তি এখন তার দেহে। তার এক হাতে ছুরি আরেক হাতে আমার হাত, হাতটি টেনে সে দ্বিতীয় ঘরটির দরজার মুখে এনে বিছানায় ধাক্কা দিয়ে ফেলল। আবারও একই প্রশ্ন, কেন দেরি হল আমার ঢাকায় আসতে। আমি ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিই, একই উত্তর দিই, ছুটি পাইনি। আবারও তার এক প্রশ্নই, কেন পাইনি। ফাঁক খুঁজি, তাকে বসিয়ে শান্ত করে শান্ত স্বরে কেন পাইনি ছুটি তার কারণটি বলতে, যেন খুনের ইচ্ছেজ্ঞট মাতাল-মাথা থেকে দূর হয়। মাতালের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আমি কোনও নিয়ম জানিনা, অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কোনও পদ্ধতি শিখিনি। অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকি ছুরিটির দিকে। শানানো ছুরিটির শরীর থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে চিকচিক আলো। ছুরিটি আমার গলায় নাকি বুকে বসাবে রুদ্র। আমি চোখ বুজি, যেন আমাকে দেখতে না হয় প্রেমিকের হাতে খুন হওয়ার দৃশ্যটি। হঠাৎ ছুরি ফেলে সে পেচ্ছাবখানার দিকে দৌড়োয় রুদ্র। বুকের মধ্যে কোত্থেকে জানিনা প্রাণপাখি উড়ে আসে। চকিতে ছুরিটি নিয়ে দৌড়ে যাই বারান্দায়, রাস্তায় ফেলে দিতে। কিন্তু আমাকে থামায় একটি ভাবনা, যদি ছুরি ফেলে দিয়েছি বলে রেগে গিয়ে আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলে! ছুরিটি আমি খাটের তলে একটি চালের কৌটোর ভেতর লুকিয়ে রাখি। ছুরি পেলে আমাকে খুন করবে না, এই শতর্ যদি দেয়, দেব। এই মুহুর্তে কোথায় পালাব আমি। বাড়িঅলার বাড়ি কড়া নাড়লে ও বাড়ির কেউ দরজা খোলার আগে রুদ্র আমাকে ধরে ফেলতে পারে। এই পালানোর শাস্তি তখন মৃত্যুই। তার চেয়ে ঘরে বসে বুঝিয়ে তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করি, তার মাথা থেকে মদের বিষ নামাতে চেষ্টা করি। ছলে বলে কৌশলে প্রাণপাখিটিকে বুকের খাঁচায় আটকে রাখতে হবে আমার। মানুষের জীবন একটিই, এ জীবনটি শত চাইলেও আর ফেরত পাবো না। ঘরে এসে রুদ্র ছুরি খোঁজে। ছুরি কোথায়? আমার ছুরি কোথায়? চিৎকারে বাড়ির পলেস্তারা খসে। চিৎকারে বাড়িঅলার বাড়ির লোকেরা জানে। ওই চিৎকারে আমি হু হু করে কেঁদে বলি, ছুরি নেই। ছুরি চাইছো কেন? আমাকে মেরে ফেলতে চাও? কেন মারবে? কি করেছি আমি। ছুরি আমি ফেলে দিয়েছি! ভেতরে আর কান্না আটকে রাখা সম্ভব হয় না আমার। রুদ্র তার ক্রন্দসী প্রেয়সীর গলা টিপে ধরে। হাতদুটো শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সরিয়ে দৌড়ে অন্য ঘরে গিয়ে দরজার ছিটকিনি আটকে দিই। অনেকক্ষণ দরজায় সে লাথি দেয়। খোল খোল বলে তারস্বরে নিঝুম নিথর রাতটির ঘুম ভাঙায়। জাগায়। রাতটিতে লণ্ডভণ্ড করে। একসময় আর কোন শব্দ নেই। দরজার ফুটো দিয়ে দেখি বিছানায় ওভাবেই শার্ট প্যান্ট জুতো পরে শুয়ে আছে রুদ্র। আর কোনও শব্দ নেই। নৈঃশব্দের সঙ্গে আমার চোখের জলের ফিসফিস করে কথা হয়। ভোর হওয়ার জন্য প্রকৃতির কাছে প্রাথর্ণা করতে থাকি। এই দুঃসহ কালো রাত পার যেন হয়। এত দেরি করে কোনও রাতকে আমি পার হতে দেখিনি এর আগে। ভোরবেলা ব্যাগটি নিয়ে আলগোছে দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে রুদ্রর ওই অপেক্ষার দিনলিপির পাশে লিখে রাখি, রোদ, দুদিন থেকে অপেক্ষা করেছি তোমার জন্য। তুমি আসোনি। কাল রাতে একটি অচেনা লোক ঘরে এসেছে, লোকটিকে আমি চিনি না। আমি চলে যাচ্ছি। যেখানেই থাকো তুমি, ভাল থেকো। তোমার সকাল।
