এত ভোরে রাস্তায় বেশি যানবাহন থাকে না। দএু কটি রিক্সা মন্থর গতিতে চলছে। একটি মন্থরকে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছোই। ভোরবেলার প্রথম বাসটি ঘুম ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে আছে। বাসের দরজায় পা রাখতেই কনডাকটর জিজ্ঞেস করে সঙ্গে পুরুষলোক নাই?
না।
এই লেডিস একটা।লেডিস একটা। কনডাকটর চেঁচিয়ে বলে। কাকে বলে কে জানে। লেডিস একটা মানে সতর্কে করে দেওয়া সবাইকে যে আমাকে নিরাপদ একটি জায়গায় বসতে হবে। লেডিসের নিরাপত্তা হল লেডিস সিটে, ড্রাইভারের পাশের জায়গাগুলোকে বলা হয় লেডিস সিট। মেয়েরা একা বাসে উঠলে ওখানেই, ওই জায়গায় বসারই নিয়ম। বাসে, লেডিসের সঙ্গে লেডিসকে না বসালে লেডিসের জন্য যাত্রা নিরাপদ হয়না বলে ভাবা হয়। লেডিস সিট ভরে যাওয়ার পর যদি বাড়তি লেডিস উদয় হয় তখন তাকে অলেডিস সিটে বসিয়ে দ্বিতীয় লেডিসের অপেক্ষা করতে থাকে কনডাকটর যেন প্রথম লেডিসের পাশে দ্বিতীয়টিকে বসিয়ে দিতে পারে। সেদিন লেডিস সিটে জায়গা নেই, অপেক্ষা করেও কোনও দ্বিতীয় লেডিসএর টিকিটি দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি করা? মাঝবয়সী স্বামী স্ত্রী বসে আছে পাশাপাশি, কনডাকটর স্বামীটিকে বলল, ভাইজান আপনে অন্য সিটে বসেন, আপনের লেডিসের সাথে এই লেডিসরে বসাইয়া দেই। আমি বললাম, না থাক, ওদেরে উঠাইয়েন না। সমস্যা সমাধানের আরও উপায় বাসের কনডাকদের জানা আছে। লেডিসের পাশে বসার জন্য কোনও লেডিস অগত্যা পাওয়া না গেলে বাসে যে পুরুষটি সবচেয়ে বুড়ো বা যে ছেলেটি একেবারে বাচ্চা, দাড়িমোচ ওঠেনি, তার সঙ্গে বসিয়ে দেওয়া। কোনওভাবেই কোনও যুবকের পাশে নয়।
লেডিস সিট খালি নাই। ছোট কনডাকটর বড়টিকে বলে। বড়টি এরপর খুঁজে পেতে এক বুড়োকে আবিস্কার করে জিজ্ঞেস করে, চাচা আপনে একলা?
হ।
যান ওই চাচার সাথে বসেন গিয়া। আমাকে নির্দেশ।
আমি মেয়ে বলে আমার সিট পছন্দ করে দেওয়ার দায়িত্ব তাদের। কোনও এক বুড়ো চাচার পাশে বসিয়ে কনডাকটর ভেবেছে আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে সে। কোনও পুরুষ বাসে উঠলে সে তার পছন্দ মত জায়গা বেছে নিয়ে বসে। কিন্তু একা কোনও মেয়ে এলে তাকে অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না কনডাকটর তার বসার আয়োজন করে। আমাকে নিরাপদ সিটে বসার ব্যবস্থা করে ছোট এবং বড় দু কনডাকটরই স্বস্তি পায়। বাসের জানালায় মাথা রেখে আমি ভাবি, পরপুরুষের পাশে বসা নিরাপদ নয় বলে বাসে এই নিয়ম চালু করা হয়েছে, মেয়েদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ,লোকে জানে যে আপন পুরুষ। সবচেয়ে নিরাপদ স্থানটি আপন পুরুষের ঘর! স্বামীর ঘর। কনডাকটরটি যদি জানত, আমার জন্য ওটিই কত অনিরাপদ!
অবকাশে ফিরে নিরাপদ বোধ করি। অবকাশের চারদিকে উঁচু দেয়াল, দেয়ালের ওপর ভাঙা কাচ বসানো। তার ওপর আরও উঁচু করে দেওয়া কাঁটাতারের বেড়া। বাইরের জগত থেকে আলাদা করা এই বাড়িটিকে একসময় কারাগার বলে মনে হত আমার। এখন মনে হয় এখানেই থোকা থোকা শান্তি লুকিয়ে আছে। মা আমার দিকে তীক্ষ ্ন একটি দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন যদিও, বুঝি ওই দৃষ্টির আড়ালে ওত পেতে আছে স্নেহ। যত দুর্ঘটনাই আমি ঘটাই না কেন, ওই স্নেহ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেই। নার্গিসকে দিয়ে মা ভাত পাঠান আমার ঘরে। ভাতের সঙ্গে আমার প্রিয় বেগুন ভাজা, খাসির মাংস। খুব যতে ্ন বেড়ে দেওয়া। মা কি করে জানেন, এই সকালে আমার পেটে ভাতের ক্ষিধে! মা মানেই কি এই, মা সব বুঝে নেবেন, কোনও কিছু বলার দরকার হবে না! ইয়াসমিন ওর নতুন তোলা একটি গান গাইছে বিছানায় বসে। সুহৃদ একটি প্রজাপতির গা রং করছে জল রংএ, আর বলছে, প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে তুমি এমন রঙিন পাখা! সুমন ইয়াসমিনের গান শুনতে শুনতে বলছে, ইয়াসমিন আপা তুমি এত সুন্দর গান গাইতে পারো তা আগে জানতাম না। সুমন হাশেমমামার ছেলে, একটিই ছেলে হাশেমমামার, বাকি সব মেয়ে। গতকাল এ বাড়িতে হাশেমমামা সুমনকে রেখে গেছেন। আকুয়া রেললাইনের ওপর কিছুদিন আগে একটি চৌদ্দ পনেরো বছর বয়সের ছেলেকে সমবয়সী কিছু ছেলে খুন করেছে। খুন করতে কোনও পিস্তল বা বন্দুকের প্রয়োজন হয়নি, একটি ছুরিই যথেষ্ট ছিল। খুনের আসামিদের তালিকায় সুমনের নামটিও আছে। হাশেমমামা মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে আওয়ামি লিগের আকুয়া ইয়নিয়ন শাখার সভাপতি হয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা নাম ভাঙিয়ে অনেক সুবিধে লুটেছে। টাকা করেছে অনেকে অনেক রকম উপায়ে। অনেকে মন্ত্রী হয়েছে, বিদেশে রাষ্ট্রদূত হওয়ার চাকরি পেয়েছে। হাশেমমামার কিছুই হয়নি। তিনি এসবের পেছনে দৌড়োননি। জীবিকার জন্য কায়ক্লেশে নতুন বাজারে ভাত মাছ বিক্রি করার ছোট্ট একটি দোকান কিনেছেন। এই করে ঘরের পারুল বউ আর পাঁচটি মেয়ে একটি ছেলেকে নিয়ে তিনি গাদাগাদি করে থাকছেন সেই খুপড়ি একটি ঘরে। যে ঘরে বিয়ের পর থেকেই থাকছেন। এতগুলো ছেলেমেয়ে হল, ছেলেমেয়ে বড়ও হয়েছে, কিন্তু তিনি আজও সেই ঘরে। টাকা পয়সা বাড়ি গাড়ি সম্পত্তির কোনও মোহ নেই। নিজের লেখাপড়া হয়নি হাশেমমামার, ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। মেয়েগুলো পরীক্ষায় ভাল ফল করে, কেবল ছেলে নিয়েই ঝামেলা। পাড়ায় ছেলের বন্ধুবান্ধব বেশি, লেখাপড়ায় মন নেই। বন্ধু হলে শত্রু হয়। কোনও এক শত্রু সুমনের নামটি আসামির তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। হাশেমমামা ছেলেকে বংশের বাতি বলে মনে করেন না। ননীটা ছানাটা খাইয়েও একে মানুষ করতে হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। পনোরো ষোল হলেই মেয়েদের এক এক করে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কথা কখনও ভাবেন না। মেয়ের চেয়ে ছেলেকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষপাতি নন তিনি। এই সমাজে বাস করে হাশেমমামা সমাজের আর দশটা লোকের মত নন। এই অন্যরকম হাশেমমামার প্রতি আমার বিষম আগ্রহ। খুব ইচ্ছে করে তাঁকে জিজ্ঞেস করি, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। কি করে ভারত চলে গিয়েছিলেন, কি করে ওখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন যুদ্ধের, কি করে মুক্তিযুদ্ধের গ্রুপ-কমান্ডার হয়ে তিনি জঙ্গল পার হয়ে নদী সাঁতার কেটে দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গিয়েছেন! কি করে তিনি পাক সেনাদের দিকে গুলি ছুঁড়েছেন, কটাকে কুপোকাৎ করেছেন কোনওদিন জিজ্ঞেস করা হয় নি। সুমনকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে হাশেমমামা হন্যে হয়ে ঘুরছেন। এক আশ্চর্য সততা সম্বল করে হাশেমমামা বাঁচেন। তিনি মিথ্যে মামলা থেকে ছেলেকে রক্ষা করতে পারেন না। কারাগারের মত এই বাড়িটি আপাতত তাঁর ছেলেকে বাঁচাবে বলে পুলিশের হাত থেকে না হলেও পাড়ার শত্রুদের হাত থেকে, হাশেমমামা বাবাকে অনুরোধ করেছেন সুমনকে এ বাড়িতে কদিন রাখার। বাবা রাজি হয়েছেন। কিন্তু ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর সুমন আর ইয়াসমিনকে নিয়ে গান কবিতায় হাসি ঠাট্টায় গল্পেগাছায় খেলায় ধুলায় মেতে থেকে প্রমোদে মন ঢেলে দিয়ে ঠিক দুদিন পর এই আমি রাজি হইনা সুমন অবকাশে আর একটি মুহূতর্ থাকুক। কারণটি হল একটি অসহায় মেয়ের থরথর কাপঁুনি দেখেছি আমি মধ্যরাতে। নার্গিসের দৌড়ে আসার শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গিয়েছে আমার। ওর ভয়াতর্ শ্বাসের শব্দে আমি চোখ খুলেছি। আমার দরজায় দাঁড়ানো কাঁথা বালিশ হাতে, কাপঁ ছে ও। শরীর কাপঁ ছে। চোখ বিস্ফারিত।
