মা বলেন, সুহৃদের সাইকেলটা নাকি কামাল সিঙ্গাপুর থেইকা আনছে। এইরম সাইকেল তো দেশেই পাওয়া যাবে না।
সমস্যার সমাধান সুহৃদই করে। সে নতুন আনা সাইকেলটির ওপর আকর্ষণে নতুন সাইকেলটি চালাতে থাকে। শুভ চালায় সিঙ্গাপুরি। হাসিনার দেখে খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু খুশি হয় না। তার মুখে হাসি মোটেও ফুটতে চায় না। হাসি ফোটানোর জন্য মা পরিশ্রম করেন। মা তাকে ছোটদার আনা আপেল আঙুল কমলালেবু দিতে থাকেন। মাছ মাংস রান্না হলে হাসিনাকে সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে ভাল টুকরোগুলো দেওয়া হয়। হাতে টাকা পয়সা এলে হাসিনা আর শুভর জন্য বাজার থেকে কিছু না কিছু উপহার কিনে নিয়ে আসেন। হাসিনার হাসি নেই তবু। দাদাকে তিনি অহর্নিশি বলতে থাকেন, কি নড়ো না কেন! মরার মত শুইয়া থাকলেই হবে? ফকিরের মত টিনের ঘরে আর কতদিন পইড়া থাকবা। আলদা বাসা নেও। আমার ছেলেরে তোমার এই গুষ্ঠি থেকে দূরে সরাইতে হবে।
সুহৃদ সংসারের কোনও কুটকচাল বোঝে না, শুভর জন্য সুহৃদের মমতা অনেক। শুভকে পারলে সে তার নিজের যা কিছু সম্পদ সব দিয়ে দেয়। কিল চড় আঁচড় এগুলো সুহৃদের শরীরে বসাতে শুভ সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। একবার ধাক্কা দিয়ে সুহৃদকে ফেলে দিয়েছিল খাটের রেলিং থেকে, মাথায় চোট পেয়ে সুহৃদ পুরো চব্বিশঘন্টা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। মা পাগল মত হয়ে গিয়েছিলেন। মার ভয় কখন না আবার কি দুর্ঘটনা ঘটে যায়। তিনি ছোটদাকে বলেছেন, এই পরিবেশে সুহৃদরে মানুষ করা যাবে না। তুই ওরে ঢাকায় নিয়া যা। ছোটদা মার এই প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি মুখ শুকনো করে বলেন, হ নিয়া যাইতে হইব। ঢাকায় নিয়া ইশকুলে ভর্তি করাইতে হবে। সুহৃদকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হলও এরপর। মা গেলেন সঙ্গে। দু সপ্তাহ পর মা ফিরে এসে সুহৃদের জন্য চোখের জল ফেলতে থাকেন। কেবল চোখের জলই নয়। হাঁউমাউ কান্না। কেঁদে কেটে নিজেই তিনি উন্মাদিনীর মত ঢাকা চলে যান, সুহৃদকে ফের অবকাশে ফেরত আনেন। সুহৃদ মহাসুখে অবকাশে দিন যাপন করতে থাকে। ওকে নিয়ে প্রায় বিকেলেই বেড়াতে বেরোই। রিক্সা করে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো। কখনও কখনও বান্ধবীদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া। ওর আবদারের খেলনা কিনে দেওয়া। আজ চাবিঅলা গাড়ি কিনে দিলাম তো কাল চাবিঅলা উড়োজাহাজ লাগবে। নিজের জন্যও রেডিমেড টু পিস থ্রি পিস কিনি। দুটো জামা, একটি ধোব, আরেকটি পরব, বাবার এই নিয়ম ভেঙে আমার জামা পাজামার সংখ্যা দাঁড়িয়ে যায় দশাধিক। শখ করে নীল জিনসের কাপড় কিনে দরজি দিয়ে একটি প্যান্টও বানাই। এবার দরজিকে বলি, সামনের দিকে বোতাম বা চেইন দিবেন, কিনারে না। লপু দিবেন। যদি বেল্ট পরতে ইচ্ছে হয়, পরব। রেডিমেড ছাড়া কখনও যদি কাপড় কিনে জামা বানাই, দরজির ফিতে নিজের হাতে নিয়ে বুকের মাপ দিই। ইয়াসমিনকে বলে দিই, এখন থেইকা নিজে মাপ দিবি। ইয়াসমিনকে বলা হয় না কেন ওর নিজের এ কাজটি করা দরকার, কেন দরজির নয়। সম্ভবত ও বুঝে নেয়। হাসপাতাল থেকে ফিরেই ওর সঙ্গ চাই আমার। জগতের সকল কথাই হয় ওর সঙ্গে, কেবল শরীরের কোনও গোপন কিছু নিয়ে কোনও কথা নয়। আমরা দুজন যেন আজও শিশু। আমরা হাসি আনন্দ করি, কবিতা পড়ি গান গাই। ঘুরে বেড়াই। যেদিন জিনস প্যান্ট পরেছি, বাবা দেখে বলেন, এইডা কি পরছস। এক্ষুনিখোল। খুইলা পায়জামা পর। আমি বলি, জিনস প্যান্ট সবাই পরে। মেয়েরাও পরে।
না মেয়েরা পরে না। এইসব ছেলেদের পোশাক।
বাবার প্রতিবাদ করি না আমি, সরে আসি সামনে থেকে। কিন্তু জিনস খুলে রাখি না, পরে থাকি। পরদিনও পরি। আমার কাপড় চোপড় ইয়াসমিনের গায়ে আঁটে। সে নিজেও আমার জামা কাপড় অবলীলায় ব্যবহার করতে থাকে। আমি না করি না। বাবা ইয়াসমিনকেও জিনস পরতে দেখে দাঁত খিচোন, কি হইছে এইগুলা? বড়টার শয়তানি তো ছোটটারেও ধরছে। যেইদিন ধরব আমি, সেইদিন কিন্তু পিটাইয়া হাড্ডিা গুড়া কইরা দিয়াম। হাড্ডি গুঁড়ো হোক, ইয়াসমিনকে বলি খুলবি না। খুলবি না বলি, কারণ আমি কোনও যুক্তি দেখি না জিনস পরা মেয়েদের জন্য অনুচিত হওয়ার। এটি পরলে আমি যে ছেলে বনে যাবো, তা তো নয়। এর ভেতরে যে শরীর, সে তো ঠিকই থাকছে। সেটি ঠিক রাখার জন্যই যদি বাবার আদেশ হয়ে থাকে। ইয়াসমিনকে ছোট বাজারের সুর তরঙ্গ থেকে একটি পুরোনো হারমোনিয়াম কিনে দিই। গানের মাস্টারও রেখে দিই। একটিই শতর্ আমার, ও যেন রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। ঈশান চক্রবর্তী রোডের একটি দেয়াল ফুঁড়ে বটগাছের চারা ওঠা পুরোনো বাড়িতে ময়মনসিংহ সঙ্গীত বিদ্যালয়, ওতে ভর্তি করিয়ে দিই ওকে। গেল, কিন্তু সাতদিনের মাথায় বলে দিল ওর ভাল লাগছে না ওখানে। ঠিক আছে ইশকুলে যদি ভাল না লাগে বাড়িতে এসে মাস্টার গান শেখাবে, এই ভেবে সুনীল ধরের কাছে নাকি মিথুন দের কাছে! কার কাছে যাবো! শেষ অব্দি ঠিক হল, বাদল চন্দ্র। সঙ্গীত বিদ্যালয়ের গানের মাস্টার বাদল চন্দ্রর বাড়ি কোথায় খোঁজ নিয়ে জেনে ইয়াসমিনকে নিয়ে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করি গান শেখাতে। বাদল চন্দ্র দের ছোট ভাই সমীর চন্দ্র দে ওরফে কটন এককালে ছোটদাকে গিটার শেখাতেন। শহরের এক নম্বর গিটার শিল্পী। বাদল চন্দ্র দে বিয়ে থা করেননি। তাঁর ঘরটিতে তানপুরা হারমোনিয়াম তবলা সেতার বীণা নানা রকম যন,্ত্র ঘরের এককোণে একটি তক্তপোষ। এত অল্পে কি করে যে মানুষের জীবন যাপন চলে!ভোগ বিলাসের চিহ্ন নেই বাড়িটিতে। একটি উঠোন ঘিরে টিনের কতগুলো ছোট ছোট ঘর। পৈতৃক ভিটে। ভাইরা বিভিন্ন ঘরে থাকেন, ছেলেমেয়েও বড় হয়ে গেছে। সকলে সঙ্গীত সাধনায় উৎসর্গ করেছে জীবন। বাদল চন্দ্র আমাদের দুজনকে তক্তপোষে বসিয়ে নিজে একটি মোড়ায় বসে সঙ্গীতের গভীর কথা শোনাতে থাকেন, কতক বুঝি, কতক বুঝি না। তিনি কাউকে শখের গান শেখাতে চান না, এ যদি সত্যিকারের সঙ্গীত সাধনার উদ্দেশ্য হয়, মন প্রাণ উৎসর্গ করা হয় সঙ্গীতে, তবেই তিনি ছাত্রী নেবেন। আমাদের, আমি জানি না কেন, পছন্দ হল বাদল চন্দ্রের। তিনি সপ্তাহে দু দিন ইয়াসমিনকে শেখাতে বাড়ি আসতে লাগলেন। দীর্ঘাঙ্গ ধবল শরীর বাদল চন্দ্রের। ধবধবে শাদা পাঞ্জাবি আর ধুতি পরনে। এক হাতে ধুতির কোচা ধরে তিনি ঢোকেন অবকাশে। বৈঠক ঘরে সা রে গা মা পা ধা নি সা চলতে থাকে সারা বিকেল। আমি ট্রেতে করে চা বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢুকি। বাদল ওস্তাদ আমাকে দেখলে কেবল সঙ্গীত নিয়ে নয়, সাহিত্য নিয়েও গল্প করেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলি মুখস্ত বলে যেতে থাকেন। কবিতা মুখস্ত করার মাথা আমার নেই, আমি মুগ্ধ শ্রোতার ভূমিকায়। ইয়াসমিনের সা রে গা মা বাদল চন্দ্রের কাছেই প্রথম শেখা নয়। ওর যখন পাঁচ কি ছয় বছর বয়স, বাবা ওকে রাজবাড়ি ইশকুলের শিক্ষিকা রোকেয়ার বাড়িতে নিয়ে যেতেন গান শিখতে, ও বাড়িটিও নাচ গানের বাড়ি ছিল। রোকেয়ার মেয়ে পপি নাচত। ছেলে বাকি গান গাইত। রোকেয়ার বোন আয়শা, বোনের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন, তিনিও শিক্ষিকা, নিজেও গান গাইতেন, মেয়ে দোলনকেও গান শেখাতেন। ইয়াসমিনকে ও বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, বাড়ি থেকে নিয়ে আসা এসব নিয়ে মা বলতেন, ইয়াসমিনরে গান শেখানোর উদ্দেশে ত তর বাপে ওই বাড়িতে যায় না, আয়শার সাথে রঙ্গরস করাই আসল উদ্দেশ্য। ইয়াসমিনকে ও বাড়িতে নিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে বসিয়ে দিয়ে অন্য ঘরে কোঁকড়া চুলের টানা টানা চোখের ফর্সা চামড়ার প্রায় গোলাপি ঠোঁটের ভরা বুকের যুবতী আয়শার সঙ্গে বাবা কথা বলতেন। বাবার রাজিয়া বেগমকে দিয়েও সাধ মেটেনি কোনওদিন। খুচরো আরও কিছু প্রেম বাবার এদিক ওদিক থাকতই। ইয়াসমিনের এক বান্ধবীর কৃকলাশ খালার সঙ্গেও, খালাটি উকিল, বাবাকে দেখা গেছে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে। ইয়াসমিন বাদল চন্দ্র দের কাছে সা রে গা মা যখন শিখছে, কলেজের কিছু গানের মেয়ের সঙ্গে নতুন পরিচয়ের পর খোঁজ দিল যে শহরে আনন্দধ্বনি নামে একটি গানের ইশকুল আছে, ওতে মেয়েরা যাচ্ছে। এই গানের ইশকুলটি ছুটির দিনে মহাকালি ইশকুলে বসে। আনন্দধ্বনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওস্তাদ ওয়াহিদুল হকের ইশকুল। ময়মনসিংহে ওয়াহিদুল হকের শিষ্য তপন বৈদ্য, নীলোৎপল সাধ্য, আর নূরুল আনোয়ার আনন্দধ্বনির ছাত্র ছাত্রীদের গান শেখান। ছাত্র ছাত্রীরা যে কোনও বয়সের। পাঁচও আছে, পঞ্চাশও আছে। একই সঙ্গে বসে তাল দিয়ে গান গাইছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাকে বাঁচিয়ে রাখে একরকম। দাদার সন্ধ্যা ফিরোজা হেমন্ত মান্না দে ডিঙিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতে বুঁদ হয়েছি বেশ অনেকদিন। বিশেষ করে কণিকা আর সুবিনয় রায়ে। মাঝখানে গণসঙ্গীতের ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু সরিয়ে রেখে আবার রবীন্দ্রসঙ্গীতে। এই এক সঙ্গীত, যে সঙ্গীতে মন দিলে জীবন বড় সুন্দর হয়ে ওঠে। জীবনের এমন কোনও অনুভবের কথা নেই, যা না বলা আছে এই সঙ্গীতে। কেবল সুখ বোধই নয়, দুঃখবোধও একরকম আনন্দ দেয়। ইয়াসমিনকে আনন্দধ্বনিতে ভর্তি করে দিই। বাদল চন্দ্রের বেতন, আনন্দধ্বনির বেতন মাস মাস দিতে থাকি আমি। আনন্দধ্বনিতে যাওয়া শুরু করার পর নীলোৎপল সাধ্যের নজরে পড়ে ইয়াসমিনকে, কোনও একদিন ও খুব বড় শিল্পী হবে আশায় নীলোৎপল সাধ্য ওকে যত্ন নিয়ে গান শেখাতে শুরু করেন। ইয়াসমিন একদিন তবলার আবদার করায় ভাল দেখে তবলাও কিনে দিই গোলপুকুরপাড়ে প্রমোদ বিহারির তবলার দোকান থেকে। বাদল চন্দ্র দের আগ্রহ ইয়াসমিনকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখাতে। ঘরে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চলল, বাইরে রবীন্দ্রসঙ্গীত। চারপাশের মানুষের ক্ষুদ্রতা নিচতা স্বাথর্প রতা থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখে ইয়াসমিনকে নিয়ে একটি চমৎকার জগত তৈরি হয় আমার। ইয়াসমিন যখন আনন্দধ্বনিতে শেখা গান গুলো গাইতে থাকে বাড়িতে, আমি মগ্ধু হয়ে দেখি ওকে। কোনও মন খারাপ করা বিকেলে, তোমার কাছে শান্তি চাব না, থাক না আমার দুঃখ ভাবনা.. গানটি আমাকে ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল ঝরাতে থাকে। ইয়াসমিন মাঝে মাঝে বাড়িতে নীলোৎপলকে নিয়ে আসে, সুদর্শন যুবক নীলোৎপল সাধ্য, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা, পায়ে শানিপ্তুরি চপ্পল, ঠোঁটে শান্তি ছড়ানো হাসি। আমার মনে হতে থাকে নীলোৎপল বুঝি মনে মনে ইয়াসমিনকে ভালবাসছে। ভয় হয়। ওর এক বান্ধবীর ভাই ইয়াসমিনের কাছে আসে মাঝে মাঝে তবলা বাজাতে, ইয়াসমিনের দিকে ছেলেটিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি। ভয় হয়। কলকাতা থেকে ইয়াসমিনকে গোটা গোটা অক্ষরে চিঠি লিখছে কৌশিক মজুমদার। কে এই কৌশিক মজুমদার? ইয়াসমিন বলে, ওই যে ধ্রুব। মৃত্যঞ্জয় ইশকুলের সামনে থেকে প্রায় বিকেলে যে হাফপ্যান্ট পরা বড় বড় কাজল কালো চোখের মিষ্টি চেহারার কালো একটি ছেলে এই পাড়ায় বিকেলে হাঁটতে আসত, ওই ধ্রুব। ইয়াসমিনও চিঠি লেখে কৌশিককে। কৌশিক একদিন ওকে আর ইয়াসমিন নামে সম্বোধন করে না, সম্বোধন করে মৌমি বলে। ইয়াসমিন নিজের নাম সেই থেকে মৌমি লিখছে। ভয় হয় আমার। ভীষণ ভয় হয়। কৌশিকের চিঠি এলেই আমি পড়ি। খুঁটিয়ে খুঁিটয়ে দেখি কোনও প্রেমের ইঙ্গিত আছে কি না। আসলে আগলে রাখি ওকে সকল সর্বনাশ থেকে, কারও প্রেমে যেন সে না পড়ে। কোনও মোহ যেন ওর সততা ও সারল্যকে, ওর সৌন্দর্যকে এতটুকু ম্লান না করে। আমার যা হয়েছে, হয়েছে। ওকে বাঁচাতে চাই সকল কৎু সিত থেকে। যখন ইয়াসমিন কলেজে যাবে বা আনন্দধ্বনিতে যাবে বা বান্ধবীর বাড়ি যাবে বলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজে, চোখে কাজল পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক। ধমক লাগাই, এত সাজস কেন?
