তা আমাকে আগে জানালে আমি কি আপত্তি করতাম রুদ্র?
কাবিন কত টাকার হবে?
টাকার অক কি দিতেই হবে?
হ্যাঁ দিতেই হবে।
শূন্য দেওয়া যায় না?
না।
তাহলে এক টাকা।
ধুর এক টাকা কি করে হয়!
যত ইচ্ছে তত দাও, এসবের কোনও মানে হয় না, তুমি কি ভাবছ আমাদের কোনওদিন তালাক হবে, আর হলে আমি কোনও টাকা দাবি করব?
আমি হেসে উঠি। সশব্দে নিঃশব্দে।
কাবিনের কি দরকার রুদ্র?
দরকার আছে।
কি দরকার?
এসব অর্থহীন জিনিস। দুজন মানুষকে একসঙ্গে বাস করাতে পারে কোনও কাবিননামা? নাকি ভালবাসা? আমি ভালবাসায় বিশ্বাসী, কাবিনে নয়। রুদ্র ভালবাসায় কতটা জানি না, তবে সে কাবিনে বিশ্বাসী, সে কাবিন করে। পরদিন ময়মনসিংহে ফিরে যাই। অপারেশন হয়েছে শুনে মা আমার যত্ন করেন, গরম জল গামলায় ঢেলে জলে ডেটল মিশিয়ে আমাকে বসিয়ে দেন দিনে চারবার। মাকে আমার পুরোনো নিউপারকেইনল মলমটি দিই। এনাল ফিশারের যন্ত্রণা কমার মলম। মা মলম পেয়ে ভাবেন, এটিই তাঁর রক্ত যাওয়া বন্ধ করবে। রক্ত যাওয়া বন্ধ হয় না মার। ভাবেন, কোনও একদিন নিশ্চয়ই বন্ধ হবে। মার আবদারের এক পোয়া দধু , দুটো কলা আর দুটো ডিমও পাওয়া হয় না। মা সম্ভবত আশা করেন, তাঁর মেয়েটি ডাক্তার হচ্ছে, উপার্জন করবে, সেই মেয়েই তাঁর চিকিৎসা করবে, সেই মেয়েই দুধ কলা কিনে দেবে। সেই মেয়ের ডাক্তারি পাশ হয়। সেই মেয়ের ইন্টারনিশীপ শুরু হয়। সেই মেয়ের হাতে টাকা আসে। টাকা পেয়ে আর যা কিছুই হয় তার মার দীর্ঘ দীর্ঘ দিনের আবদারের দধু ডিম কেনা হয় না। ভাগীরথীর মা আসে, দুই বাচ্চার জন্য দধু দিয়ে যায়। বারান্দায় বসে দুবাচ্চার দুধ মেপে দিয়ে জিজ্ঞেস করে প্রায়ই, ও মাসি, আরও এক পোয়া দধু রাখবেন বলিয়েছিলেন না! মা বড় শ্বাস ফেলে বলেন, না ভাগীর মা, দুধ খাওয়ার কপাল আমার নাই।
বিছানায় দু পা বিছিয়ে সেই পায়ের ওপর শুইয়ে মা হাঁটু ভেঙে ভেঙে দোল দিয়ে ঘুম পাড়ান সুহৃদকে,ছড়া বলতে বলতে। জানালায় উদাস তাকিয়ে ছিলেন মা, সুহৃদ ঘুমিয়ে গেছে পায়ে, তখনও ওকে পা থেকে আলতো করে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছেন না.. চোখের নিচে কালি পড়েছে,চোখদুটো ফোলা, জানালা থেকে চোখ সরিয়ে বলেন,নোমানের বউ আমারে বেডি কইয়া ডাকে।
কেমনে জানো?
পাকঘরে গিয়া শুনি লিলির মারে কইতাছে, ওই বেডি আমার ছেলেডারে দুই চোক্ষে দেখতে পারে না।
ও।
সাহস পাইছে তর বাপের কাছ থেইকা। তর বাপ ত সবার সামনেই বেডি কয়।
জানালায় আবার উদাস তাকিয়ে মা বলেন, শাশুড়ি আমি, আমারে গ্রাহ্যই করে না।
সুহৃদের ঘুমন্ত মখু খানার দিকে তাকিয়ে থাকি। অনেক সুন্দর বাচ্চা দেখেছি। সুহৃদের মত কেউ নয়। ঘুমিয়ে থাকলে মনে হয় না কি ভীষণ দুরন্ত ছেলে সে। প্রতিদিন খাট থেকে টেবিল থেকে সিঁড়ি থেকে ধুপ ধাপ পড়ে যাচ্ছে বাতাসের আগে ছুটতে যেয়ে। ভ্রুক্ষেপ নেই কোনও। শুভ একটি পা কোথাও দিলে আগে দেখে নেয় কোথায় দিচ্ছে, সাবধানী ছেলে, কোনও লম্ফ ঝম্ফ নেই। শুভর শরীরে কোনও চিহ্ন নেই কাটা দাগের। সুহৃদের আজ হাঁটু ছিলে যায় তো কাল কনুইএ কালশিটে দাগ পড়ে থাকে। সারা শরীরে তার দস্যিপনার চিহ্ন। সুহৃদ আধো আধো কথা বলে। শুভ কথা বলতে শেখা অবদি কোনওদিন কোনও আধো কথা বলেনি। সবসময় ষ্পষ্ট। খাওয়ার ব্যাপারে শুভর কোনও না নেই। সুহৃদের সবসময়ই না। মার ভোগান্তি বাড়ে। ছেলে যত বড় হচ্ছে, তত তাকে বাগে আনা মুশকিল হয়ে পড়ছে। দৌড়ে ছাদে চলে গেল। পেছনে পেছনে দৌড়োতে হয় মার, যদি আবার ছাদ থেকে লাফ দেয় নিজেকে সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান মনে করে! ফটক খোলা পেলে রাস্তায় চলে গেল, দৌড়ে ধরে আনতে হয়। মার যত না খাটনি, তার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা। ছোটদা অবকাশে এসে গন্ধ টের পান হাওয়ায়, গন্ধটি হাসিনার অসন্তুষ্টির। হাসিনার দৃঢ় বিশ্বাস, শুভর চেয়ে সুহৃদকে ভাল বেশি বাসা হচ্ছে। মা ছোটদাকে বলেছেন, সুহৃদের জন্য কিছু আনলে শুভর জন্যও নিয়া আসিস। হাসিনাকে তুষ্ট করতে বিদেশ থেকে আনা বাচ্চার জামা কাপড় খেলনা শুভর জন্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দিলেও হাসিনা জানে যে শুভর যা আছে তার চেয়ে অনেক বেশি আছে সুহৃদের। সুহৃদের জন্য ছোটদা তিন চাকার একটি সাইকেল এনেছেন। এটি ঘরে বারান্দায় মাঠে উঠোনে চালায় সে ঝড়ের বেগে চালায়। মা সুহৃদকে খানিক পর পর উঠিয়ে শুভকে দেন চালাতে, শুভ তো তোমার ভাই, ওরে চালাইতে দেও। সুহৃদের প্যারামবুলেটরটিও শুভকে দিয়ে দিয়েছিলেন মা। সুহৃদের ছ মাসের ছোট শুভ। প্যারামবুলেটর থেকে সুহৃদের নামা হয়েছে, শুভর ওঠা হয়েছে। কিন্তু হাসিনা দাদাকে বলেছে শুভর জন্য নতুন কিনে নিয়া আসো।
ময়মনসিংহে পাওয়া যায় না এইসব।
না পাওয়া যাক। ঢাকা যাও, ঢাকা থেকে কিনে নিয়ে আসো।
কি কও মুমু! ঢাকা যাব এইটা কিনার জন্য?
হ, এইটা কিনার জন্য তোমারে ঢাকা যাইতে হইব। আর যদি ঢাকায় না পাও তাইলে লন্ডন গিয়া হইলেও কিন্যা নিয়া আসতে হইব।
সুহৃদ সাইকেল পাওয়ার পর শুভকে ঠিক এরকম সাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য হাসিনা দাদাকে আবার ধরল। দাদা সারা শহর খুঁজে একটি তিন চাকার সাইকেল কিনে নিয়ে বাড়ি এলে হাসিনা সাইকেলটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, রাস্তা থেইকা টুকাইয়া আনছ নাকি?
এর চেয়ে ভাল সাইকেল আর নাই বাজারে। পারলে গিয়া দেইখা আসো।
