যক্ষা রোগিটি ওষধু পেয়ে কৃতজ্ঞতায় মিইয়ে যায়। রাতে আর সে ধোবাউড়া ফিরবে না, থেকে যাবে জুবলিঘাটের চিৎকাত হোটেলে। হোটেলে লম্বা টানা বিছানা পাতা, ভাড়া বেশি নয়,চিৎ হয়ে শুলে আটআনা, কাত হয়ে শুলে চারআনা। হোটেলগুলোয় লোকের গিজগিজ ভিড়, গ্রাম থেকে শহরে ডাক্তার দেখাতে,মামলা করতে আসা লোকেরা খুব দূরের যাষনী হলে দিন ফুরোলে আর নদী পার হয় না, ঘাটের হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে নৌকো ধরে।
মার পাইলসের চিকিৎসা হয় না। মার ইদানিং ধারণা জন্মেছে, মার রোগটি পাইলস নামক কোনও সাধারণ রোগ নয়, দুরারোগ্য কোনও রোগ এটি। মার সংশয় নিয়ে মা থাকেন, কারও সময় নেই রোগশোক নিয়ে ফালতু কথা শোনার। আমার আর্তচিৎকার ফালতু হওয়ার আগে, নিজেই ব্যবস্থা নিই। এনাল ফিশারের যন্ত্রণা যখন আমাকে ধরল, বেদনানিরোধক নিউপারকেইনল মলম ব্যবহার করেও সে যন্ত্রণা যখন কমেনি, হাসপাতালের সব চেনা ডাক্তারদের সামনে গোপনাঙ্গ প্রদর্শন যখন আমার পক্ষে অসম্ভব, অচেনা ডাক্তারের চিকিৎসা পেতে আমি ঢাকা যাই। বড় সার্জন দেখিয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির ব্যবস্থা করলেন ছোটদা। কেবিন পাওয়া শক্ত, কেবিন পাওয়ার জন্য মনি ্ত্র আমানুল্লাহ চৌধুরিকে ধরতে হয়েছে। দুদিন পর অপারেশন। ভর্তি হব হব, তখনই রুদ্র মোংলা থেকে ফিরে আমার চিঠি পেয়ে জেনে যে আমি এখন ঢাকায়, ছোঁ মেরে নয়াপল্টন থেকে তুলে নিয়ে গেল। ছোঁএর সময় ছোটদা বাড়ি ছিলেন না। গীতা হাঁ হয়ে ছিল। তার এক ডাক্তার-মামাতো ভাই ঢাকা মেডিকেলে চাকরি করছে, রুদ্র আমাকে সেই পঞ্চাশ লালবাগে নিয়ে গেল ডাক্তার ভাইটিকে বলতে আমার অপারেশনের সময় যেন থাকে সে। বৈঠকঘরের সোফায় তখন চুল এলিয়ে বসা ছিল নেলি। নেলিকে ওই প্রথম আমি দেখি। রুদ্রকে দেখি চোখ বারবার নেলির এলিয়ে পড়া চুলের দিকে যাচ্ছে, নেলির আলথুালু শাড়ির দিকে যাচ্ছে। দুজন গল্প করে, পুরোনো দিনের গল্প। হাসে। একটি পত্রিকা হাতে নিয়ে মুখ ডুবিয়ে রাখি, যেন কিছু দেখছি না, কিছুই আমার চোখে পড়ছে না, কথা বলতে বলতে তোমাদের দুজনের চোখে স্মৃতি যে কাপঁ ছে তা আমি দেখছি না, সেই সব উতল প্রেমের স্মৃতি, সেই সব চুম্বন, গোলাপের গন্ধে শরীরে শরীর ডুবিয়ে মাছ মাছ খেলা— দেখছি না, তোমাদের যে পরস্পরকে স্পর্শ করতে ইচ্ছে করছে খুব, আবার ইচ্ছে করছে জগতের সকল কিছু সকল সম্পর্কে তুচ্ছ করে আগের মত প্রেমের অথৈ জলে ঝাপঁ দিতে, চুম্বনে চুম্বনে প্রতি লোমকপূ কে আবার আগের মত জাগাতে, আবার আগের মত স্বপ্নের কথা বলতে বলতে খুব খুব গভীরে চলে যেতে শরীরের—দেখছি না। আমার চোখ পত্রিকাটির অক্ষরে, তোমরা নিশ্চিন্তে যে কথা বলতে ইচ্ছে করো, বলো। সেই সব স্বপ্নের কথা, সেই সেইসব ভীষণ আবেগের কথা, যে আবেগ নিয়ে তুমি নেলির বিয়ে ভেঙে দিতে গিয়েছিলে রুদ্র। আমি মন দিয়েছি অক্ষরে, আমি শুনছি না। অক্ষরগুলোয় তাকিয়ে থাকি, অক্ষরগুলো বৃষ্টিতে ভিজছে। ভেজা অক্ষরগুলো আমার দিকে চেয়ে থাকে, ভেজা অক্ষরগুলোর মায়া হতে থাকে আমার জন্য।
হাসপাতালে অপারেশন টেবিলে আমাকে অজ্ঞান করা। আমি যখন ঘুমিয়ে যেতে থাকি, কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে আমার নাম ঠিকানা, বলতে চেয়েও আমি বলতে পারছি না, কোত্থেকে এক পাখি এসে আমাকে ডানায় করে আকাশে উড়িয়ে নিতে থাকে, আমি মেঘের মত উড়তে থাকি, আমার ভাল লাগতে থাকে। ভীষণ ভাল লাগতে থাকে। জ্ঞান ফিরলে দেখি অন্য এক বিছানায় শুয়ে আছি। পাশে ছোটদা, গীতা, রুনুখালা। গীতা আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, ছোটদা রুনুখালা জিজ্ঞেস করেন, ব্যথা লাগতাছে? ব্যথা আছে কি বুঝতে পারি না, থাকলেও প্রিয় এই মখু গুলো ব্যথা কমিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ সবাইকে অপ্রস্তুত করে ঘরে রুদ্র ঢোকে। ছোটদা বেরিয়ে যান। কে এই রুদ্র, কি সম্পর্কে তার সঙ্গে আমার, এ কাউকে বলিনি। সকলে বুঝে নেয়। বেরিয়ে যাওয়া ছোটদাও বুঝে নেন। দুদিন থাকতে হয় হাসপাতালে, এই দুদিন গীতা আমার জন্য তিনবেলা খাবার আনে। বসে থেকে গল্প করে। গরম জলের গামলায় বসিয়ে রাখে। হাসপাতাল ত্যাগের দিন একদিকে ছোটদা, আরেকদিকে রুদ্র। ছোটদা বললেন, চল বাসায় চল।
আমি মাথা নাড়ি, না।
না মানে?
নিরুত্তর আমি। ছোটদা আমাকে হাত ধরে টানেন, বাসায় যাইবি না ত কই যাইবি তুই? ছোটদার হাতটি আমি ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নিই। নিরুত্তাপ শান্ত চোখ রাখি তাঁর কষ্টভাঙা চোখে। চোখের কোণে জল উপচে ওঠে তাঁর,আড়াল করে দাঁতে ঠোঁট চাপেন। আমি রুদ্রর সঙ্গে বেরিয়ে যাই। নিরুত্তর।
মুহম্মদপুরের বাড়িতে ফিরে একটি দুর্ভাবনার সঙ্গে আমি বসে থাকি চপু চাপ। রুদ্রর মামাতো ভাইটি যদি না জেনে থাকে আমাদের বিয়ে হয়েছে! রুদ্র বলে, তুমি তো কাউকে জানাতে চাও না বিয়ের কথা। অজ্ঞান করার পর আমার গোপনাঙ্গ নিশ্চয়ই আর গোপন থাকেনি কোনও ডাক্তারের কাছে, আর গোপন না থাকা মানে জেনে যাওয়া যে আমি কুমারী নই! অন্তত তাকে জানাও যে আমরা বিয়ে করেছি। তা না হলে ভেবে বসবে আমার বুঝি বিয়ের আগেই কুমারীত্ব গেছে ছি ছি। আমি মখু নত রাখি লজ্জায়। আমার লাজ রাঙা মখু টি রুদ্রর খুব পছন্দ। মখু টি দুহাতে নিজের দিকে ফিরিয়ে সে চুমু খায়। কথা দেয়, কালই সে জানাবে তার ভাইকে বিয়ের কথা। সে রাতটি যখন গভীর হয়ে আমাদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়, ঘুমে অচেতন করে রাখে, রুদ্রর বন্ধু মিনার দরজা ধাক্কিয়ে আমাদের ভাঙা ঘরে তুফান তোলে। সুন্দরী বউ কবিতাকে নিয়ে মিনার এসেছে ঘুমোতে, সারা শহরে ঘুমোনোর কোনও জায়গা পায়নি বলে। শোবার ঘরটি ছেড়ে দিই ওদের জন্য, রুদ্র আর আমি শুই শীতল পাটি বিছিয়ে অন্য ঘরে। ভোরবেলা দেখি রুদ্র নেই আমার পাশে। সে ঘুমোচ্ছে বিছানায় মিনার আর কবিতার সঙ্গে। কি হয়েছে? ঘটনা কি! তুমি এখানে কখন এসেছো? রুদ্রর সরল উত্তর, শীতল পাটিতে তার ঘুম আসছিল না। বুদ্ধি করে মিনারের পাশে শুয়েছে, কবিতার পাশে যদি মিনার আবিষ্কার করত তাকে, তবে নিশ্চয়ই বন্ধুটির কাণ্ডে অট্টহাসি হেসে সকালে বিদেয় হত না সস্ত্রীক। সেদিন সকালেই আমি রুদ্রর ড্রয়ারে চিঠি লেখার কাগজ খুঁজতে গিয়ে বিয়ের দলিলটি দেখি। দলিলে লেখা উকিলের সামনে বসে আমি নাকি এ দলিলে সই করেছি। আশ্চর্য এতে তো মিথ্যে কথা লেখা! বলতেই রুদ্র আমার হাত থেকে দলিলটি কেড়ে নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দেয়। শুয়ে বসে ঘর গুছিয়ে বাইরে খেয়ে আড্ডা দিয়ে কবিতায় সঙ্গমে দুদিন কাটার পর আমার মন কেমন করতে থাকে অবকাশের সবার জন্য। মার জন্য, ইয়াসমিনের জন্য, সুহৃদের জন্য, মিনুর জন্য। কি রকম আছে ওরা! আমার কথা মা নিশ্চয়ই প্রতিদিন বলছেন, বাবা প্রতিদিন, ইয়াসমিন প্রতিদিন, সুহৃদও বলছে দোলফুপু এখনো আসে না কেন? সুহৃদকে শিখিয়েছি আমাকে দোলফুপু ডাকতে। একদিন ওকে দোলনায় দোলাতে দোলাতে দে দোল দে দোল ফুপু দে দোল দে দোল বলতেই বলতেই। মন পড়ে থাকে অবকাশে। আমার এলোমেলো আবার খুব গোছানো জীবনে। মিনুর জন্যও কষ্ট হতে থাকে, নিশ্চয়ই সে ঘরে বারান্দায় ক্ষিধে পেটে হাঁটতে হাঁটতে আমাকে খুঁজছে, রাতে তার খুব খালি খালি লাগছে বোধহয়! ঢাকাকে আমার আপন শহর মনে হয় না। ঢাকায় কদিনের জন্য বেড়াতে আসা যায়। পাকাপাকি থাকার জন্য এ শহরটিকে আজও আমি মনে নিতে পারি না। ময়মনসিংহে ফিরে যেতে চাইলে রুদ্র আর একটি দিন থাকতে অনুরোধ করে। সেই একটি দিনের একটি বিকেলে আমাকে নিয়ে মগবাজার যায়, কাজির আপিসে। রুদ্রর দুটো বন্ধওু যায়। কাজির কাছে কাবিন হবে, দুই বন্ধু সাক্ষী। সারপ্রাইজ!
