ঝর্না শুভ কই?
শুভ খেলে।
শুভ খেলে কেন? শুভর তো এখন ঘুমানির কথা! মা ঘুম পাড়ায় নাই কেন শুভরে? দুপুর দেড়টার জায়গায় পৌনে দুটো হয়ে গেছে, শুভ ঘুমোয়নি। কি ব্যাপার? শুভর তো দেড়টার সময় ঘুমোনোর কথা। ঘড়ি দেখে ঠিক বারোটায় দধু খাবে, একটায় মুরগির সপু খাবে, একটা দশে ভাত মাছ সবজি খাবে, খেয়ে দেড়টায় ঘুমোবে। শুভকে দধু সপু ভাত সবই খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু না ঘুমিয়ে ছেলে খেলতে শুরু করেছে।
হাসিনার কর্কশ কন্ঠ, এইরকম অবস্থা হইলে তো আমার কলেজে যাওয়া হবে না। বাসায় বইসা বাচ্চা পালতে হবে।
হাসিনা পরদিন কলেজে যায় না।
কি শুভর মা, কলেজে যাইবা না?
নাহ! আজকে শরীরটা ভাল লাগতাছে না বলে সারাদিন শুয়ে থেকে শুভকে বিকেলে মার কোল থেকে তুলে নিয়ে নিজের ঘরে দুঃখী মখু করে বসে থাকে হাসিনা।
বাবা বাড়ি ফিরেই আজকাল বৌমা বৌমা বলে হাসিনাকে ডাকেন, প্রতিদিনই তিনি খবর নেন ক্লাস কেমন হচ্ছে, পড়াশোনা সে ঠিক ঠিক করছে কি না।
হাসিনা এবার মখু মলিন করে বলল, যাইতে পারি নাই কলেজে।
মানে? যাইতে পারো না ই মানে? কেন যাইতে পারো নাই? উত্তেজনায় বাবা চশমা খুলে ফেললেন।
শুভরে দেখতে হয়, তাই। ঝর্না তো আর শুভরে গোসল করাইতে খাওয়াইতে পারে না।
শুভর দাদি আছে না এইসব করার জন্য?
হাসিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। না,মা তো সময় পান না। মার তো সুহৃদরে দেখতে হয়।
যাও বেডিরে ডাকো।
কোন বেডিরে? লিলির মারে?
বাবা খেঁকিয়ে ওঠেন, লিলির মারে ডাকবা কেন? মাথায় বুদ্ধি সুদ্ধি নাই নাকি? নোমানের মারে ডাকো।
হাসিনা মাকে ডেকে আনে। ঠোঁটে চিকন হাসি তার।
বাবা দাঁতে দাঁত ঘঁষে মাকে বলেন, ছেলের মা যায় কলেজে,ছেলেরে তুমি রাখবা না তো রাখবে কে?
আমি তো রাখিই, শান্ত গলা মার, আমার গোসল করানি খাওয়ানি যদি শুভর মার না পছন্দ হয়, তাইলে আমি কি করতাম?
তুমি কি করতা মানে?
মানুষ রাইখা লন শুভরে পালনের লাইগা।। আমি দুই বাচ্চা আর কুলাইতে পারতাছি না।
দাদি থাকতে ছেলে কাজের মানুষের কাছে বড় হইব?
কামালরে খবর দেন। সুহৃদরে নিয়া যাক। আমার নিজের অসুখ । নিজের একটু বিশ্রাম নাই, ঘুম নাই। এত পারতাছি না।
দেখ দেখ কথার ছিরি দেখ। বাবা হাসিনার দিকে চেয়ে মাকে ইঙ্গিত করেন বাঁকা চোখে, বাঁকা ঠোঁটে।
চিকন হাসিটি দীর্ঘদীর্ঘদিন একটি নতুন বিμছুর মত সেঁটে থাকে হাসিনার ঠোঁটে।
সুহৃদকে ছোটদার কাছে দিয়ে দেওয়াও হয় না। শুভর জন্য আলাদা কাজের বেটি রাখাও হয় না। মা ই একা লালন পালন করতে থাকেন দুই নাতি। বালতি ভর্তি কাপড় ফেলে রাখে হাসিনা। লিলির মার তা ধুতে ধুতে বেলা যেতে থাকে, মাকে দৌড়ে রান্নাঘরে যেতে হয়। মাকে রাধঁ তে হয় বাড়ির সবার জন্য। মা পারেন না লিলির মাকে হাসিনার কাপড় ধোয়া থেকে তুলে আনতে। আমার মনে হতে থাকে, মা হাসিনাকে ভয় পাচ্ছেন। বাবাকেও মা সম্ভবত এত ভয় পান না। মার ভয় দাদাকে নিয়ে, দাদা যদি আবার বাড়ি ছেড়ে চলে যান, দাদা যদি হাসিনার মন খারাপ দেখলে অখুশি হন। দাদা যদি মাকে আর মা বলে না ডাকেন! মার রক্ত যাওয়া শরীরটি দুর্বল হতে থাকে। অথচ এই দুর্বলতা নিয়েই মা ভোরবেলা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকেন সংসারকাজে। বাবার কাছে বিনিয়ে বিনিয়ে বলেন, আমার ত রক্ত নাই শইলে আর। আমার তো কিছু ভাল খাইতে হইব। এক পোয়া কইরা দধু , দুইটা কলা,দুইটা ডিম আমার লাইগা কি দিবেন? বাবা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে মার স্পর্ধা দেখেন। মা যত না মার দাবিতে তার চেয়ে বেশি শুভকে রাখার দাবি নিয়ে বলেন, কি রে নোমান, তর বাপে তো কিছু দেয় না, তুই কি আমার লাইগা একটু দধু কলার ব্যবস্থা করতে পারবি? আমার ত শইল ভাইঙ্গা যাইতাছে।
দাদা হাসতে হাসতে জিভ কেটে বলেন, কি যে কন মা। আপনার শইল কই ভাঙতাছে! বরং খুব বেশি মোটা হইয়া যাইতাছেন। ডায়েট ক−ন্ট্রাল করেন। খাওয়া কমাইয়া দেন।
পাইলসের কি কোনও ওষধু তর দোকানে আছে?
নাহ। পাইলসের কোনও ওষধু নাই।
ওষধু নেই। সাফ কথা। দাদা এখন বাবার ওষধু ব্যবসার কর্তা। রমরমা ব্যবসা তার। চমৎকার সাজিয়ে নিয়েছেন দোকান। হাসপাতালে ওষুধের যোগান দেন। বড় বড় ক্লিনিকেও দেন। ওদিকে বাবা নিজের চেম্বারটির পরিসরও বড় করেছেন। এক্সরে মেশিন বসিয়েছেন। মাইত্রে²াসকোপ কিনে প্যাথলজি বসিয়েছেন। জুরিসপ্রুডেন্স বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহকে বাবা তাঁর প্যাথলজিতে অবসরে বসতে বলেছেন, বাড়তি আয়ের লোভে আবদুল্লাহ আসেন এখানে। বাবার চেম্বারে কোনও কারণে গেলে রোগীর ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতে হয়। গ্রামের দরিদ্র রোগীর ভিড়ই বেশি। কেউ পেট ব্যথা নিয়ে এলেও দেখি বাবা বুকের এক্সরে করতে দিচ্ছেন। মল মুত্র পরীক্ষা করতে দিচ্ছেন। কাশির সঙ্গে রক্ত যেতে থাকা এক বুড়ো এল ধোবাউড়া থেকে, বাবা এক্সরে করে বলে দিলেন যক্ষা। বুড়োকে জিজ্ঞেস করি, কবে থেইকা রক্ত যায়? কোটরাগতে চোখ ক্লান্তিতে নুয়ে আসে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আইজ দেড় বছর।
যখন রক্ত যাওয়া আরম্ভ হইল তখন আসলেন না কেন?
আমু যে টেকা কই বইন? ধার কর্জ কইরা আইলাম শহরে।
আপনাদের গ্রামে ডাক্তার নাই?
না।
গ্রামে গঞ্জে ডাক্তার থাকলেও লোক চলে আসে বাবার কাছে, ভাল ডাক্তার হিসেবে বাবার খুব নাম। শহরের পুরোনো লোকেরা এখনও অসুখে বিসুখে বাবাকে ডাকেন। বাবার নির্দিষ্ট কোনও ফি নেই, যে যা দেয়, তিনি তাই নেন। কেউ পাঁচ টাকা দিয়ে বিদেয় হয়, কেউ দু টাকা। বাবা কেবল একটি অনুরোধই করেন রোগীদের, যেন পাশের আরোগ্য বিতান নামের ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে নিয়ে যায়। মলমুত্রথুতুকফ পরীক্ষা করিয়ে এক্সরে করিয়ে অনেকের টাকা থাকে না ওষধু কেনার। ফিরে যায়। এরকম ফিরে যেতে থাকা যক্ষা রোগিটিকে থামিয়ে আমি আরোগ্য বিতানে নিয়ে দাদাকে বলি ওষধু মাগনা দিতে। দাদা তাচ্ছিলউ করেন,পাগল হইছস? নিজের পকেটের টাকা বের করে দিই, দাদা সে টাকা গুনে নিয়ে ওষধু দেন। আজকাল তিনি টাকা গুনতে পছন্দ করেন খুব। অবসর হলেই তিনি ড্রয়ারে সাজিয়ে রাখা টাকাগুলো পুনরায় গোনেন, টাকাগুলোর একদিকে ধানের শিষ, আরেক দিকে মসজিদ, সব টাকার ধানের শিষকে ধানের শিষের দিকে রাখেন, মসজিদকে মসজিদের দিকে। এই টাকা থেকে সংসারের কোনও খরচ হয় না। যা খরচ হয় তা হাসিনার শখ মেটাতে, তার শাড়ি গয়নায়,তার মেকআপে, চেকআপে। ইয়াসমিন মাঝে মাঝে আরোগ্যবিতানে নামে রিক্সাভাড়ার দুটো টাকা নিতে, দাদা ড্রয়ারে তালা দিয়ে চাবি পকেটে রেখে দুহাত দগুালে রেখে উদাস বসে থাকেন, ইয়াসমিনকে বলে দেন, বিক্রি টিক্রি নাই, এহনও বউনিই করি নাই।
