রোজা আসে, রোজা যায়। রোজায় বিশ্বাস করি না বলে রোজা রাখি না। সন্ধেবেলায় ইফতার খেতে ভাল লাগে, খাই। অবশ্য সাইরেন পড়ার জন্য অপেক্ষা আমার সয় না। পিঁয়াজি বেগুনি ছোলাভাজা সাজিয়ে রাখা হয় টেবিলে, খেতে স্বাদ জিনিসগুলোর। আমি ফেলে রাখি না। বাবা, আমার খুব অবাক লাগে, পীরবাড়িতে কাফের হিসেবে পরিচিত হলেও, নামাজ না পড়লেও, কোরান হাদিস ইত্যাদিতে কোনও আগ্রহ না দেখালেও পুরো মাস রোজা রাখেন। রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে বাবাকে কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি। আমার বিশ্বাস বাবা রোজা রাখেন দশজনের একজন হতে। তাঁর বয়সী সবাই যখন রোজা রাখেন, তিনিও রাখেন। রাখলে প্রশ্নহীন নিঝর্ঞ্ঝাট জীবনে যাপন করতে পারেন বলে রাখেন। দাদাও রোজা রাখেন, যদিও ঈদের নামাজ ছাড়া আর কোনও নামাজ তিনি পরেন না, বাবার মত। ছোটদা ঈদের নামাজে যান, কিন্তু সারা বছর নামাজের নাম নেই, রোজার নাম নেই। হাসিনা আল্লাহ বিশ্বাস করলেও, নামাজ রোজায় বিশ্বাস করলেও রোজা রাখে না, রাখে না কারণ তার কাঠিত্ব এখনও ঘোচেনি। রোজা রাখলে, তার ভয়, হাড়ের ওপর যে চামড়াটি আছে, সেটিও ঝুরঝুর করে ঝরে যাবে। এরশাদ সরকার দেশে একটি নতুন নিয়ম চালু করেছেন, রোজার সময় দিনেরবেলা খাবার দোকানগুলো বন্ধ থাকবে। এ কি আশ্চর্য, সবাই কি রোজা রাখে নাকি! কত মুটে মজুর কুলি, দুপুরবেলা না খেলে কাজই করতে পারবে না, তারা ক্ষিধে পেলে কি করবে? হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের কথাও তো ভাবতে হবে! নাস্তিকদের কথাও। দেশ তো কেবল মুসলমানের নয়। মুসলমান যারা আছে, সবাই তো রোজা রাখে না। খাবার দোকান বন্ধ থাকলে চলবে কেন! আমি অবশ্য প্রতিবাদ হিসেবে রোজার সময় মুখে একটি চুইংগাম রাখি। সারাদিন চিবোতে থাকি চুইংগামটি। কলেজ ক্যান্টিনে ঘন ঘন চা পান করে আসি। কলেজের ক্যান্টিনটি কলেজের ভেতর হওয়ায় পুলিশ এসে হানা দেয় না, রক্ষে। এরশাদের এই নিয়মে জামাতে ইসলামির লোকেরা বেজায় খুশি, কিন্তু কেউ কেউ যারা ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ, আপত্তি করছেন। কারও আপত্তি শোনার লোক নন এরশাদ। তিনি ক্ষমতায় থাকতে চান যে করেই হোক। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের প্রতি অতিরিক্ত ভীরুতা দেখালে সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁকে বাহবা দেবে এরকম বিশ্বাস নিয়ে তিনি দেশ চালাচ্ছেন। এরশাদকে কখনও আমার ধার্মিক লোক বলে মনে হয় না। মুখে গাম্ভীর্য এনে তিনি যতই ধর্মের কথা বলুন, যতই তিনি সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম নামে নতুন একটি জিনিস আমদানি করুন এবং সেই রাষ্ট্রধর্মকে ইসলাম বলে ঘোষণা করে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সর্বনাশ করুন, আমার মনে হয় লোকটি দেশের মানুষকে ফাঁকি দিচ্ছেন, বোকা বানাতে চাইছেন। লোকটি নিরক্ষর অশিক্ষিত ধর্মভীরু মানুষের ভোট চাইছেন, আর কোনও উদ্দেশ্য তাঁর নেই।
ধমর্, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে মেতে থাকলে যে আমার চলবে না, তা বাবা আমাকে বলেন। পরীক্ষা যখন গায়ে জোরে ধাক্কা দিল, রাত তিনটেয়, চারটেয় আমাকে ঠেলে তোলেন, পড়তে। আমি হুড়মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে পড়ার টেবিলে বসি, মা ওই রাতে উঠে ফ্লা−স্ক চা বানিয়ে রেখে যান টেবিলে। আমার লিখিত পরীক্ষা হয়ে গেলে বাবা শশব্যস্ত হয়ে মৌখিকে অন্য মেডিকেল থেকে পরীক্ষক কারা আসছেন, বাবার চেনা কিনা, বাবার ছাত্র কিনা, বাবার সহপাঠী কি না, খোঁজ নেন। খোঁজ নিয়ে তিনি পেয়ে যান যে কেউ কেউ তাঁর ছাত্র ছিলেন কোনও এক কালে। তাঁদেরই বাবা কাঁচুমাচু মখু নিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলে আসেন আমার মেয়েটা পরীক্ষা দিচ্ছে এবার, একটু দেখবেন। একটু দেখবেন, এর মানে এই যে মেয়েটাকে ইচ্ছে করে কম নম্বর দেবেন না। আসলে কেউ কাউকে পাশ করিয়ে দিতে পারেন না। পারেন না, কারণ একজনের হাতে দায়িত্ব থাকে না পাশ করাবার। দেখবেন এর অনুরোধটি হল, ইচ্ছে করে যেন ফেল করাবেন না। ইন্টারনাল পরীক্ষকরা সবাই যে আমার ওপর খুশি তা নয়। সালাম না দেওয়ার কারণে আমাকে বেশির ভাগ অধ্যাপকই বেয়াদব বলে জানেন। যাই হোক, দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা চলে। দীর্ঘদিন ধরে বাবা দুশ্চিন্তায় থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে পাশ করব না এই আশংকা নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে শুষ্ক হয়ে ওঠা গলদেশ নিয়ে ভয়ে ঘন ঘন তেষ্টা পাওয়া পেচ্ছাব পাওয়া আমি পরীক্ষা দিই মৌখিক। মৌখিক পরীক্ষাকে পরীক্ষা বলে মনে হয় না। মনে হয় যেন পুলসেরাত পার হচ্ছি। সরু একটি সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছি। একটু কাত হলাম কি ধপাশ। ধপাশ একেবারে সাপ বিচ্ছু আর দাউ দাউ আগুনের মধ্যে। ভাল ছাত্র রাজিব আহমেদের চিকিৎসাজ্ঞানে টইটম্বুর খাতা পড়ে পরীক্ষা দিয়ে হয়ত লিখিত পরীক্ষায় ভাল করা যায় কিন্তু মৌখিকের দুশ্চিন্তায় আমার মুখের ভাষা হারিয়ে যেতে থাকে। মাথা থেকে কর্পূরের মত উড়ে যেতে থাকে যা জানি তাও। এই করে পরীক্ষা হয়। ওয়ার্ডের ভেতর সারি সারি রোগীর মাঝখানে বিশাল টেবিল পেতে অধ্যাপকরা বসে থাকেন। অধ্যাপকদের অধ্যাপক মনে হয় না, যেন এক একজন আজরাইল। গলা যে কার কাটা যাচ্ছে, কারও বোঝার উপায় নেই। পরীক্ষা শেষ হয়, কিন্তু জানা হয় না, আমার মণ্ডুুটি আছে কি না এখনও ধড়ে।
পরীক্ষার পর ঢাকা যাওয়ার জন্য উতলা হই। কিন্তু রুদ্র ঢাকায় নেই। মিঠেখালি থেকে ফেরেনি। ময়মনসিংহে বসে রুদ্রর ঢাকা ফেরার অপেক্ষা করতে থাকি। অপেক্ষা জিনিসটি বড় অশান্তির। অশান্তির হলেও বইখাতা নিয়ে আপাতত আর বসতে হচ্ছে না, এই এক স্বস্তি আমার। হাসিনা বি এড পাশ করার পর এমএডএ ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন বাবা। শুভকে মার দায়িত্বে রেখে প্রতিদিন কড়া রঙের শাড়ি পরে মুখে নানারকম রং লাগিয়ে কলেজে যায় সে। মার হাতে এখন দুজনের লালন পালনের ভার। এক হাতে শুভকে সামলাচ্ছেন, আরেক হাতে সুহৃদকে। হাসিনা কলেজ থেকে ফিরেই প্রথম দেখে শুভর যতে ্ন কোনও ত্রুটি হয়েছে কি না। না, মা কোনও ত্রুটি রাখেন না, রাখেন না এই কারণে যে শুভর য−ত্নর ত্রুটি হলে তুলকালাম কাণ্ড বাধাঁবে হাসিনা। বাড়িটিকে কলহমুক্ত রাখতে মা ত্রুটির ত্রিসীমানা মাড়ান না। সুহৃদ আর শুভ দুজনকেই গোসল করিয়ে দুজনের গায়ে পাউডার মেখে জামা পরিয়ে দুজনকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন মা, হাসিনা এসেই শুভকে ছোঁ মেরে নিয়ে বলল, ইস ছেলেটা ঘাইমা গেছে। ফ্যানের নিচে তো সুহৃদরে শোয়ানো হইছে, শুভরে ফ্যানের থেইকা দূরে শোয়ানো হইল কেন? ঘরের সিলিংএ একটি মাত্র পাখা। পাখার তলে শুভও ছিল, সুহৃদও ছিল। কিন্তু সুহৃদ নাকি পাখার কাছাকাছি ছিল বেশি। মা বলেন, এইগুলা কি কও ! শুভ গড়াইয়া কিনারে গেছে। মা পছন্দ করেন না ছেলের বউএর চিৎকার চেঁচামেচি। কারণ যে কোনও চেঁচামেচিতে দাদা এসে উপস্থিত হন, এবং হাসিনা যদি অসঙ্গত বা অযৌক্তিক কোনও কথা বলে, দাদা তা নতমস্তকে মেনে নেন। দাদা রায় দিয়ে দিলেন, মা ইচ্ছে করেই শুভকে কষ্ট দেওয়ার জন্য পাখার ঠিক তলে রাখেননি। মা চোখের জল গোপনে মোছেন। গোপনে মুছেই সুহৃদের চেয়ে চতগু র্ণু যত্ন করেন শুভর। গোসল করিয়ে যখন চুল আঁচড়ে দেন, সিঁথিটিও লক্ষ রাখেন যেন একেবারে সোজা হয়। কারণ একবার সিঁথিটি এক চুল পরিমাণ বাঁকা ছিল বলে হাসিনা বলেছে, সুহৃদের সিঁথি তো বেঁকে নাই, শুভরটা বেঁকল কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর মার কাছে নেই। নেই বলে মার সারা শরীরে ভয়। সারা মনে ভয়। এমএড ক্লাস করে গোড়তোলা জুতোর ঠক ঠক শব্দ তুলে বাড়ি ঢোকে হাসিনা। এসেই গলা ছেড়ে ঝর্ণাকে ডাকে, ঝর্ণা দৌড়ে যায় কাছে। হাসিনা খবর নেয় বাড়ির সব ঠিকঠাক আছে কি না। বাড়ির অবস্থা সম্পর্কে ঝর্ণা তার জানা এবং অজানা দু খবরই বেশ অনেকটা সময় নিয়েই দেয়। শুভর কাপড় চোপড় ধোয়া, শুভর বোতলবাটি ধোওয়া, শুভর বিছানা গোছানো, খেলনা গোছানো ইত্যাদি সারা হয়ে গেলে ঝর্ণা বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে থাকে। হাসিনার কড়া নির্দেশ শুভর কাজ ছাড়া বাড়ির অন্য কাজে হাত না দেওয়ার। অন্য কাজে হাত দিতে হয় লিলির মার, লিলির, ওদের দিয়েও যখন কুলোয় না, নার্গিসের। এই অন্য কাজের মধ্যে হাসিনার কাপড় ধুয়ে দেওয়া,ইস্ত্রি করে দেওয়া, তাকে রেঁধে বেড়ে খাওয়ানো, তার এঁটো বাসন পত্র ধোয়া সবই আছে। লিলি আর লিলির মা দুদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল, তখন নার্গিসকে সুহৃদের কাজ ফেলে বাড়ির রান্না বান্না,কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা ইত্যাদি কাজ করতে হয়েছে। ঝর্ণা বারান্দায় বসে থেকেছে।
