মা আমাকে থামান ফুঁপিয়ে কেঁদে। দুহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, যা কইছ কইছ আর কইও না। এখন যাও অযু কইরা আসো, আল্লাহর কাছে তওবা করো।
তওবা করবো কেন? আমি তো কোনও ভুল করি নাই।
মা নিশ্চিত আমি দোযখের আগুনে পুড়ে মরব। আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে আর দেখেন না মা, দেখেন গনগনে আগুনে আমি জ্বলছি পুড়ছি। পুঁজ আর পচা রক্ত পান করছি। সাপ বিচ্ছু কামড়াচ্ছে আমার সারা শরীর। মাথার একহাত ওপরে সূর্য নেমে এসেছে। ফুটন্ত পানিতে আমাকে চোবানো হচ্ছে। এই হৃদয় বিদীর্ণ করা দৃশ্যটি কল্পনা করে মা আতঙ্কে কেবল ফুঁপিয়ে নয়, হাঁউমাউ করে আড়াই বছরের বাচ্চার মত কেঁদে ওঠেন।
২২. উন্মীলন
পরীক্ষার আগে আগে বাবা যেচে কথা বললেন এসে। ঠাইস্যা লেখাপড়া কর। আর উপায় নাই।
আর উপায় নাই সে আমিও জানি। কবিতাকে ছুট্টি দিয়ে দিয়েছি সেই কবে, এখন রোগ আর রোগী নিয়ে দিন কাটে, কেবল দিন নয়, রাতও। হাসপাতাল আর বাড়ি, বাড়ি আর হাসপাতাল, এই করে দিনের বেশির ভাগ যাচ্ছে, আর রাতও যাচ্ছে না ঘুমিয়ে। মা গরম দধু এনে সামনে রাখছেন, দধু পড়ে থেকে নষ্ট হতে থাকে, মা বলেন, দধু টা খাইয়া লও মা, খাইলে মাথায় পড়া ঢুকব। যখন মাথা ঘামাতে থাকি লেখাপড়া নিয়ে, মা বেড়ালের মত পা টিপে টিপে এসে, যেন কোনও শব্দে আমার মনোযোগ নষ্ট হয়, মাথায় ঠাণ্ডা তেল দিয়ে যান, ফিসফিস করে বলেন, মাথাটা ঠাণ্ডা থাকব।
এত রোগ বালাই নিয়ে পড়ে থেকে মনে হয়, পৃথিবীতে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে, কেবল আমিই তার খবর জানি না। মাঝে মাঝে চেয়ার ঠেলে উঠে পড়ি, উঠোনের খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙি। অবকাশ যেভাবে চলে, চলছে। উত্থান পতনে। ভাল মন্দে। সুখে অসুখে। সুহৃদ হাঁটতে শিখেছে, দৌড়োতে, কথা বলতে। বাড়ির সবাইকে ভালবাসতে শিখেছে, অবশ্য একটি জিনিস তাকে শিখিয়ে দেওয়া হলেও শেখেনি সে হল তার বাবা মাকে আপন ভাবতে। তাদের কোলে কাখে যেতে। তারা ঢাকা নিয়ে যেতে চাইলে ঢাকা যেতে। আরেকটি ছেলে শুভ, দাদার চেয়েও বেশি সে হাসিনার ছেলে। দেখতে হাসিনার মতই কাঠি। দিনে ছবেলা খেয়েও কাঠি। এই দুই কাঠির গায়ে মাংস বাড়াতে বাবা থলে ভরে মাছ মাংস কেনেন। দুই কাঠির পাতে বেশির ভাগ মাছ মাংস চলে যায়। তবু কাঠিরা কাঠিই থেকে যায়। মা বলেন, আসলে শরীরের গঠনই ওদের ওইরকম। বাবার চাপে হাসিনার বিএড করা হয়েছে। এখন সে বিএবিএড, যে কোনও সময় যে কোনও ইশকুলে একটি মাস্টারির চাকরি পেয়ে যেতে পারে। বাবার চাপ তাপ ভাপ ইয়াসমিনের ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষা দেওয়াতে পারেনি। শেষ অবদি আনন্দমোহনেই উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হয়েছে।
বোটানি পইড়া কি হইবি রে?
বোটানিস্ট হইয়াম। ইয়াসমিনের খেয়ালি উত্তর।
ওই আর কি, মালি হইবি। হা হা।
ইয়াসমিন মালি না হলেও অনেকটা মালির মতই হয়ে গেল। বাড়ির গাছগুলো দিব্যি বাড়ছে, কিন্তু ওদের পাতা দেখে দেখে বলছে, এই গাছের এই রোগ, ওই গাছের ওই রোগ।
রোগ সারানোর ওষধু কি? এন্টিবায়োটিক গুইলা খাওয়াবি নাকি?
ইয়াসমিনকে অপদস্থ করায় বাবার চেয়ে আমি কম যাই না। অপদস্থ ও কতটুকু হয় তা বোঝা যায় না, কারণ বোটানিতে ভর্তি হওয়ার প্রথম কিছুদিন ওর যে উদ্দীপনার দীপটি ছিল, তা ধীরে ধীরে নিভতে শুরু করেছে। প্রতিদিন কচুরিপানার মত বান্ধবী বাড়ছে ওর, বান্ধবীদের বাড়িতে যাওয়া আসা হচ্ছে। পাড়াতেও ওর জনপ্রিয়তা বেশ। ভাইফোঁটায়, বিয়েতে, জন্মদিনে, বারো মাসের তেরো পুজোয় ওর নেমন্তন্ন থাকে। আমার কোনও নেমন্তন্ন থাকে না পাড়ায়।
ওরা আমারে ডাকে না কেনরে?
তুমি মানুষের সাথে মিশতে পারো না, তাই ডাকে না। সোজা উত্তর।
আমার সীমানা ইয়াসমিনের সীমানার চেয়ে অনেক ছোট। সুহৃদের জন্মদিনে ছোটদা ঢাকার পূর্বাণী হোটেল থেকে বারো পাউন্ডের একটি কেক এনে উৎসবের আয়োজন করলেন। আমার ক্লাসের ছেলেমেয়ে এসেছিল ছ জন, ইয়াসমিনের নিজস্ব জগত থেকে এল আঠারো জন। ইয়াসমিনকে অনেকটা বাঘের মত মনে হয়, তর্জন গর্জন বেশ, আঠারো ঘা দিয়ে দিতে পারে ইচ্ছে করলেই।
হাসিনা সেই আগের মত এখনও সুহৃদের কেন এটা আছে, শুভর কেন এটা নেই, সুহৃদ কেন আদর বেশি পাচ্ছে, শুভ কেন কম পাচ্ছে—এসব নিয়ে চিনচিন জিনজিন ঝিনঝিন করে। ঈদে বাড়ির সবার হাতে যার যার কাপড় চোপড় কেনার জন্য বাবা টাকা দিলেন। শুভ সুহৃদের জন্য সমান অঙ্কের টাকা। আমার আর ইয়াসমিনের জন্য সমান। গীতা আর হাসিনার জন্য সমান। দাদা ছোটদার জন্য সমান। লিলি লিলির মা নার্গিস আর ঝর্ণার জন্য সমান। মার জন্য কিছু নয়। মাকে ছোটদা দেবেন, যেহেতু মা ছোটদার ছেলেকে লালন পালন করছেন। অনেকটা পারিশ্রমিক দেওয়ার মত বছরে একটি বা দুটি সুতি শাড়ি। ঈদে আমার আগের মত উৎসব করা হয় না। ঈদে এমন কি আমি নতুন জামাও পরি না। ঈদের এই গরু জবাই, নতুন জামা কাপড়, পোলাও মাংস জর্দা সেমাই, আমার কাছে বড় অর্থহীন লাগে। একটি জিনিসই ভাল লাগে, বালতি ভরে মাংস নিয়ে বাইরে বসে কালো ফটকে ভিড় করা শত শত ভিখিরিদের থালায় টোনায় হাতে মাংস দিতে। ভেতরের বারান্দায় বসে মাংস কাটা আর ভাগ করায় দাদার উৎসাহ সব চেয়ে বেশি। তিনি সারাদিন ধরে তাই করেন। নিজেদের জন্য, ধনী প্রতিবেশিদের জন্য, আত্মীয় স্বজনদের জন্য ভাল ভাল মাংস রেখে রগতেলহাড়সর্বস্ব মাংসগুলো দেওয়া হয় ভিখিরিদের। ভিখিরিদের কাছে মন্দ বলে কিছু নেই। তারা যা পায়শুকুরআলহামদুলিল্লাহ বলে লুফে নেয়।
