মেয়ে-মৌলবি আনতে যাওয়া চারজন ডাক্তার হতে যাওয়া মেয়েকে আল্লাহর পথে যাওয়ার দীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যথর্ হওয়ার কোনও খবর রাষ্ট্র হয় না, তবে ওই এরিয়ায় অন্তত এমন বলার সুযোগ হয়েছে যে আজকাল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সবার চোখ খুলছে, দুনিয়াদারিতে মেতে থেকে যে আখেরাতে কোন ফল পাওয়া যাবে না, তা তারা বুঝে গেছে বলে আল্লাহর পথে আসার চেষ্টা করছে। ওসব ছেদো কথা আমি কানে দিই না। তবে পীরবাড়ির যে কথাটি শুনে আঁতকে উঠি তা হল পীর আমিরুল্লাহ একটি বিয়ে করেছেন। নিজের চেয়ে চল্লিশ বছর বয়সের ছোট এক মেয়েকে। আইবুড়িদের মধ্য থেকে একজনকে।
কি মা, তার না বউ আছে। আরেকটা বিয়া করল কেন? ঠোঁটে বাঁকা হাসি আমার।
মা ইতস্তত করেন উত্তর দিতে, থেমে থেমে বলেন,—মাওই সাবের বয়স হইয়া গেছে। এখন আর তালই সাবের যত্ন করতে পারেন না তাই।
তার যত্ন করার লাইগা বাড়ি ভর্তি মানুষ। বিয়া কইরা নিতে হয় নাকি যত্ন করতে হইলে?
তালই সাবরে এখন ধইরা ধইরা পেশাবপায়খানায় নিতে হয়। রাইতেও যাইতে হয় ঘরের বাইরে। এই সব পরিষ্কারের জন্য একজন তো লাগে!
কেন, কাজের লোকের ত অভাব নাই ওই বাড়িতে, তারাই তো করতে পারে। আর তার নাতি নাতনিতে বাড়ি ভরা। তারা করতে পারে।
তাদের কাজ আছে না?
কী কও এইসব!পীরের কাজই ত তাদের আসল কাজ। পীরের কাজ করলেই ত আল্লাহর কাজ করা হয়।
রাতের বেলায় ত ঘুমায় ওরা!
সারা রাত কি তোমার হুজুর পেশাবপায়খানা করে নাকি?
বাজে কথা কইস না।
এক ঘরেই তো থাকে তারা দুইজন। এক বিছানায় তো শোয়, তাই না? খালি গু মুত ফালায় নতুন বউ তাতো না।
মা অপ্রস্তুত। আমার বিশ্বাস মা নিজেও হয়ত পীরের শেষ বয়সে এই বিয়ে করার ব্যাপারটির কোনও কারণ খুঁজে পাননি। কারণ না পেলেও পীরের পক্ষ নেওয়া মার একরকম দায়িত্ব।
এত চুক্ষা চুক্ষা কথা কইস না আল্লাহর ওলি সম্পকের্। গুনাহ হইব। মা বলেন।
গুনাহ গুনাহ গুনাহ। এই গুনাহ শব্দটি আমি বহুকাল শুনে আসছি। গুনাহ শব্দটিকে একসময় খুব ভয় হত, শব্দটির ওপর পরে রাগ হয়েছে, এখন ভয় রাগ কিছুই হয় না।
গুনাহ হোক। গুনাহ হইলে তো ভালই। গুনাহ হইলে দোযখে যাব। দোযখে গেলে তো তোমার প্রিয় দিলীপ কুমার মধুবালা, তোমার উত্তম কুমার সুচিত্রা সেনরে দেখতে পাবো। তোমার ছবি বিশ্বাস পাহাড়ি সান্যালকে দেখতে পাবো। আর তুমি যে বেহেসতে যাইবা, দেখবা তো সব কাঠমোল্লাদেরে। চাইরটা বিয়া করা শয়তান বদমাশ মোল্লাদেরে দেখবা। মানুষরে কষ্ট দিছে, হিংসামি করছে, কুটনামি করছে, মানুষরে খুন করছে। একশ একটা ধষর্ণ করছে, বউদেরে জ্বালাইছে, পিটাইছে, কিন্তু সারাদিন আল্লাহ আল্লাহ জপছে বইলা বেহেসত পাইছে। কি সুখটা পাইবা তুমি শয়তানগুলার সাথে থাকতে! তারচে গুনাহ কইরা দোযখের খাতায় নাম লেখাও। আইনস্টাইনের মত পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞানী পাইবা, নেলসন ম্যান্ডেলারে পাইবা, পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানী, বড় বড় গায়ক, নায়ক সবার সান্নিধ্য পাইবা। আর বেহেসতে গিয়া তো দেখবা বাবা বাহাত্তরটা হুরির সাথে লীলা করতাছে। আর তুমি পাইছ এক বাবারেই, যে তোমার দিকে সারাজীবন ফিইরা তাকায় নাই। এক রাজিয়া বেগমের সাথে বাবার সম্পর্কে তুমি সহ্য করতে পারো না, বেহেসতে ওই বাহাত্তরটার সাথে বাবার সম্পর্ক সহ্য করবা কেমনে? কোন সুখ পাওয়ার আশায় বেহেসতে যাইতে চাও? কিসের জন্য নামাজ রোজা কর?
মা অসহায় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে। আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁর দুচোখে আতঙ্ক।
তুই কি আল্লাহরে একটু ডরাস না? ভয়াতর্ কণ্ঠে বলেন মা।
আমি হেসে উঠি। হাসতে হাসতে বলি,—আল্লাহ কি ভাল কাজটা করছে যে আল্লাহরে ডরাইয়াম? মেয়েদের স্থান পুরুষের স্থানের চেয়ে নিচে, এইটা আল্লাহর নিজের কথা। যেহেতু পুরুষ টাকা কামাই করে, তাই পুরুষের অধীনে থাকতে হবে মেয়েদের। আজকে যদি মেয়েরা টাকা কামাই করে, তাইলে মেয়েদের অধীনে পুরুষদের থাকার কথা তো আল্লাহ কয় নাই!
কি কইতাছস এইগুলা নাসরিন? তর ত ঈমান নষ্ট হইয়া গেছে!! মার বিস্ফারিত চোখ।
বিস্ফারিত চোখের সামনেই বিস্ফোরণ ঘটে আমার, ভেতর থেকে −শ্লষ কণ্ঠে,ঘণৃা কণ্ঠে আমি বলে যেতে থাকি–
আমি বুঝি না তুমি মেয়ে হইয়া কি কইরা মেয়েদের প্রতি এত অপমান মাইনা নেও। পুরুষেরা কোরান হাদিস মাইনা চলতে পারে, তাদেরে মর্যাদা দেওয়া হইছে। মেয়ে হইয়া কি করে মানো? মেয়ে হইয়া কি কইরা মানো যে তুমি পুরুষের চেয়ে নিম্নমানের। তোমার স্বামীর তোমারে পিটানোর অধিকার আছে। তোমার বাপের সম্পত্তি তোমার ভাই যা পাবে, তা তোমার পাওয়ার অধিকার নাই। কি কইরা মানো যে পুরুষেরা তালাক কইলে মেয়েদের তালাক হইয়া যাবে। আর তোমার তালাক কওয়ার অধিকার নাই। কি কইরা মানো যে তুমি বাহাত্তরটা সঙ্গী পাইবা না বেহেসতে, তোমার স্বামী পাইব শুধু যেহেতু সে পুরুষ! কোটের্ সাক্ষী দিতে যাও, তোমার একার সাক্ষীতে হবে না, দুইজন মেয়ে সাক্ষী লাগবে। অথচ পুরুষ সাক্ষী হইছে দুইজন পুরুষ লাগে না, একজন হইলেই চলে। ইহজগতেও পুরুষের জাত সুখে থাকবে, পরকালেও। তোমার জন্য, আমার জন্য, মেয়েদের জন্য এই জগতেও আল্লাহ ভোগান্তি রাখছে, ওই জগতেও। এই হইল তোমার আল্লাহর বিচার। এই আল্লাহরে নমো নমো করো কি বুইঝা?
