আমি তো মিলাদ পড়াইতে পারে এমন একজন মেয়েরে নিতে আইছিলাম, তা পাওয়া যাবে নাকি যাবে না তা বইলা দিলেই ত হয়!
কোনও উত্তর নেই। যেন মেয়ে-মৌলবি দিয়ে মিলাদ পড়াতে চাইছি কলেজের হোস্টেলে, এই বাক্যটি ফজলিখালা প্রথম শুনলেন, আগে শোনেননি, শুনলেও মাথায় ঢোকেনি, অথবা ঢুকলেও এ বাড়িতে আমাদের আসার সত্যিকার উদ্দেশ্য মেয়ে- মৌলবির,তা মনে করেননি। অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে গিয়ে হাপঁ ছাড়ি। বাঘের খাঁচায় ঢুকে বাঘের দধু আশা করার বোকামো হাড়ে হাড়ে টের পাই।
জঙ্গল সাফ করে যে ছোট ছোট ঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে আল্লাহর পথে আসা লোকদের, সেগুলোর একটি ঘর ভাড়া নিয়েছেন রুনু খালা। ঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা রুনখুালাকে দেখে প্রথম চিনতে পারিনি। তিনি এখন শাড়ি ছেড়ে এ বাড়ির মেয়েদের মত জামা পাজামা পরেন। বড় একটি ওড়না মাথা বুক ঢেকে রাখে রুনখুালার। পায়ে নপূুর পরে গান গেয়ে নেচে বেড়ানো,বিএ পাশ করা,প্রেম করে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা সেই রুনখুালা ই যে পীরবাড়ির ভেতরে এক শরীর শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই রুনখুালা আমার বিশ্বাস হতে চায় না। এই রুনখুালাকে মনে হয় সারাজীবন কাটিয়েছেন অন্ধকার আল্লাহর গলিতেই, তাঁর কোনও অতীত ছিল না ঝলমলে। রাসু খালু ময়মনসিংহ পৌরসভায় হিশাব রক্ষকের চাকরি করতেন, চোখা প্যান্ট চোখা পাম্পশুর সেই রাসূ খালুর বিরুদ্ধে টাকা পয়সার গরমিল করা, প্রচুর টাকা হাওয়া করে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় আপিস থেকে, রাসু খালুর চাকরি চলে যায়। চাকরি যাওয়ার পর তিনি স্ত্রী কন্যা নিয়ে আল্লাহর পথে চলে এসেছেন। এখন চাকরি খোঁজেন, পান না। এখন বেগুনবাড়ি থেকে নিজের ভাগের জমি থেকে ধান চাল বিক্রির টাকা এনে শহরে আল্লাহর পথে বাস করেন। পাঁচ বেলা নামাজ পরেন। কপালে বড় একটি কালো দাগ, নামাজ পড়তে পড়তে মেঝেয় কপাল ঠুকতে ঠুকতে কালো এই দাগটি পড়েছে কপালে। মলি নামের যে মেয়ে আছে রুনখুালার, তার মলি নাম পাল্টো মতিয়া রাখা হয়েছে এই পীর বাড়িতে। নাম পাল্টানোর নিয়মটি বড় পুরোনো নিয়ম এ বাড়ির। মার ঈদুল ওয়ারা নাম ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে হামিমা রহমান করা হয়েছে, মা হামিমা নামেই পরিচিত এই পীরবাড়িতে। রুনু খালার ফ্রক পরা ছোট্ট সুন্দর মেয়েটি এখন শরীরের আগাগোড়া আবৃত করে। ইশকুলে থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা মলিকে এখন পীরবাড়ির মাদ্রাসায় কোরান পড়তে দেওয়া হয়েছে। রুনখুালার একটি ছেলেও ছিল, ছেলেটির পেট ফুলে ঢোল হয়ে একদিন মারা গেল। কোনও পীরের ফুঁ কাজে লাগেনি, দুনিয়াদারির কোনও ডাক্তারের ওষধু ও নয়। রুনখুালা তাঁর ছোট্ট টিনের ঘরটিতে আমাকে যখন টেনে নিয়ে বলেন কিছু খাইবা? একটু সেমাই খাও! কইরা দিই। না বলি। বড় মায়া হয় রুনখুালার জন্য। পেছনে ফজলিখালার শ্বশুরবাড়িটির দিকে তাকাই। বাড়ির সামনের পুকুরটি বুজে ফেলা হয়েছে। লিচু গাছটিও আর নেই। জঙ্গল নেই, ভূত পেত্নীর ভয় নেই, কিন্তু তারপরও মনে হয় আগের চেয়ে আরও ভূতুড়ে হয়েছে বাড়িটি। হুমায়রা পীরের ডান হাত এখন। সুফায়রা পীরের এক মুরিদকে বিয়ে করে সংসারি হয়েছে। মুবা−শ্বরা তো নেই ই। মুবা−শ্বরার ছোট বোন আতিয়া বসন্ত হয়ে একদিন টপু করে মরে গেছে। আতিয়া দেখতে খুব সুন্দর ছিল। দুদিনের জন্য মা পাঁচ বছরের আতিয়াকে অবকাশে এনেছিলেন। ওই দুদিনে ওকে টুইস্ট নেচে মাই নেইম ইজ এটিয়া গিলবার্ট বলতে শিখিয়েছিলেন দাদা। আতিয়ার মস্তিষ্ক থেকে শয়তানি বিদেয় করা হয়েছে এ বাড়িতে ফেরত এনে। আতিয়ার ছোট আরও অনেকগুলো বোন আছে, আমি ওদের নাম কেবল শুনেছি মার কাছে, মখু চিনি না। এত কাছের আত্মীয় হওয়ার পরও আমাদের কোনও যোগাযোগ হয় না একটি কারণেই, আমরা দুনিয়াদারির লোক, আর তারা আল্লাহর পথের লোক। আমার মায়া হয় এ বাড়ির সবার জন্য। আল্লাহর পথে বড় বিভ্রম, বড় ফাঁকি। ফাঁকি দিয়ে আমাদের সবাইকে সারা দুপুর বসিয়ে রাখা হয়েছে। ফাঁকি দিয়ে আল্লাহ রসুলের বাণী শোনানো হয়েছে। আমাদের কথা দেওয়া হয়েছে মেয়ে-মৌলবি দেওয়া হবে, সেই কথা রাখা হয়নি। আল্লাহর এই পথটি বড় মিথ্যেয় ভরা। মেয়ে-মৌলবি তো আমাদের পাওয়া হয়নিই, বরং অযথা সময় নষ্ট হয়েছে। প্রথমেই যদি বলে দেওয়া হত মেয়ে-মৌলবি পাওয়া যাবে না, আমরা ফিরে যেতে পারতাম কিন্তু আমাদের আশা দিয়ে বসিয়ে মাথায় মস্তিষ্ক ধোয়ার জল ঢালা হয়েছে। আর কার জানিনা, আমার মস্তি−স্কর ব্যাপারে আমি অন্তত এইটুকু জানি,এটি এখন আর কোনও জলে নষ্ট হবে না। সাফিনাজ হালিদা আর পারুল বুঝে পায় না এই অদ্ভুত জগতের সঙ্গে আমার সম্পর্কে কি। ওদের সামনে লজ্জা হয় আমার। এই শহরের এই অদ্ভুত পীরবাড়িটির এই অদ্ভুত জগত সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না ওদের।
ঘটনাটি মার কাছে বলি। মা বলেন, মিলাদ পড়াইতে পারে এমন মহিলা খুঁজনের জন্য ওই বাড়িতে গেলি কেন? ওরা তো কেউ ওই এরিয়ার বাইরে যায় না। বাইরে গিয়া মিলাদ পড়ায় না কোনওদিন। যা করে, সব এরিয়ার ভিতরে করে। তা ঠিক, ওদের সঙ্গে ওই পীরবাড়ির এলাকার বাইরের কোনও মসজিদ মাদ্রাসার সঙ্গেও সম্পর্কে নেই। ওদের সঙ্গে ওই পীরবাড়ির বাইরের কোনও আল্লাহরসুল মানা কোনও মানুষেরও সম্পর্কে নেই। নানা নিজে একজন হাজি মানুষ, সুদূর মক্কা গিয়ে হজ্ব করে এসেছেন, হযরে আসওয়াদে চুমু খেয়ে এসেছেন, মদিনায় হজুরের রওজা শরিফ জিয়ারত করে এসেছেন, জীবনে কোনও রোজা তিনি বাদ দেননি, কোনও নামাজ কাজা করেননি, প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে কোরান পড়েন—সেই নানাও পীরবাড়িতে কোনও সম্মান পান না। কারণ পীর আমিরুল্লাহর মুরিদ না হলে কাউকেই গ্রাহ্য করা হয় না ও বাড়িতে, কাউকেই পীরবাড়ির কেউ মনে করে না যে সত্যিকার ঈমানদার। নানা কোনওদিন ওই পীরবাড়িকে পরোয়া করেননি। নিজের ধর্ম নিজে পালন করে গেছেন। পীরবাড়িতে মার যাওয়া নিয়েও তিনি বলেছেন, আল্লাহরে নিজের ঘরে বইয়া ডাকো,আল্লাহ শুনবেন। দৌড়াদৌড়ি করার দরকার নাই।
