প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের প্রসবকক্ষে বিরামহীন আসছে বিভিন্ন বয়সের প্রসূতি, কেউ প্রথম সন্তান, কেউ দ্বিতীয়, এমনকি সপ্তম সন্তানও জন্ম দিতে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে প্রসুতিরা।একটি নিম্নগামি চাপের উপদেশ দিই তাদের। যে চাপের ফলে জলের থলি নেমে আসবে নিচের দিকে, থলি ফুটো করে দিলে পৃথিবীর পথে যাত্রা করবে একটি শিশু। এই যাত্রা যেন শুভযাত্রা হয়, শিশুর হৃদপিণ্ডের ধ্বনিতে যেন কোনও কিন্তু না থাকে, সেদিকে চোখ কান খোলা রাখি। পথ প্রশস্ত করে দিই শিশুর যাত্রায় যেন বিঘ্ন না হয়। কিন্তু যখনই, সে প্রথম হোক, দ্বিতীয় হোক তৃতীয় হোক, আগমন ঘটে কোনও শিশুর, যদি সে মেয়ে-শিশু হয়, আর্তনাদ করে ওঠে শিশুর মা। কক্ষের বাইরে অপেক্ষারত আত্মীয়দের কাছে কন্যাসন্তান জন্মের খবর দেওয়ামাত্র মখু গুলো চোখের সামনে বিষাদে আচ্ছত হয়। মেয়ে জন্ম যে কি রকম অনাকাংখিত, তা আমার প্রতিদিন দেখা হতে থাকে। সাতটি পুত্রসন্তান জন্ম দেবার পর কেউ হয়ত একটি কন্যাসন্তান আকাঙক্ষা করে, তাও হাতে গোনা কজন মাত্রই করে। কন্যা নয়, কন্যা নয় পুত্র চাই পুত্র চাই, এই প্রবল প্রখর আকাঙক্ষা নিয়ে প্রসূতির আত্মীয়রা ভিড় করে প্রসুতিকক্ষের বাইরে। কন্যাজন্মদানের পর আমি একুশ বছর বয়সী এক তরুণীর আর্তনাদ থামাতে বলেছিলাম, নিজে মেয়ে হয়ে আপনি একটি মেয়ের জন্ম চাইছেন না, ছি!
তরুণী অস্ফুট স্বরে বলল, আমারে যে তালাক দিবে, তালাক দিলে আমি কই যাবো!
তালাক দিবে কেন? একটা সুস্থ সুন্দর বাচ্চা জন্ম দিছেন আপনি। আপনার খুশি হওয়ার কথা। মিষ্টি খাওয়ান সবাইরে।
মেয়ে জন্ম দিছি আপা। আমি তো অপয়া!
ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে তরুণী। প্রসবকক্ষের দেয়ালে দেয়ালে ধ্বনিত হতে থাকে, আমি তো অপয়া, আমি তো অপয়া। কানে হাত চাপা দিয়ে বেরিয়ে যাই আমি।
ডাক্তারদের, হতে যাওয়ার ডাক্তারদের, নার্সদের জন্য খাঁচা ভরে মিষ্টি আসে প্রসবকক্ষের বাইরে। সে মিষ্টি পুত্রজন্মের আনন্দে। আমি অপেক্ষা করে থাকি কন্যা জন্মের কারণে কোনও একটি দম্পতির সন্তুষ্টি দেখার। আমার দেখা হয় না।
মেয়ে হইছে, তাতে কি হইছে। মেয়েরাই তো ভাল। মেয়েরা বাপ মায়ের দেখাশোনা করে। আপনার মেয়েরে লেখাপড়া করাইবেন, ইশকুল কলেজে পড়াইবেন, আমার মত ডাক্তার হবে আপনার মেয়ে। দুঃখ করবেন না। বলে বলে যতবারই আমি কাঁদতে বারণ করি দুঃখিতা নারীদের, ততই তারা কাঁদে, প্রাণ ভরে কাঁদে প্রসব কক্ষের ভেতর। জরায়ুর ফুল ঝরে যায়, অন্তরে বিঁধে থাকে সহস্র কাঁটা। কেবল পুত্রসন্তান জন্ম দিলেই প্রসব যন্ত্রণা ম্লান হয়ে প্রশান্তির হাসি ফোটে মুখে, প্রসবকক্ষে হাসি ফোটে, প্রসবকক্ষের বাইরে ফোটে। প্রসব যনণ্ত্রার চেয়েও বড় এক যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আমাকে প্রতিদিন প্রসবকক্ষ থেকে বেরোতে হয়। সমাজের বিকট কৎু সিত রূপটি পরিষ্কার হতে থাকে চেতনায়। কে আমি কি আমি কেন আমি এই প্রশ্নগুলো আমি তসবিহর গোটা নাড়ার মত নাড়তে থাকি। অনাকাঙ্খিত কোনও কন্যা সন্তান, কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে আর্তনাদ করা প্রসবকক্ষের কোনও দুঃখিতা এবং এই আমার মধ্যে কোনও পার্থক্য খুঁজে পাই না।
সমাজের নিয়মগুলো ছিঁড়ে ফেলার জন্য যখন আমার হাতদুটো নিশপিশ করছে, লিলির গালে একটি শক্ত চড় কষাই কেন আমি একবার নয় চার চার বার ডাকার পরও ও কাছে আসেনি, কেন জানতে চায়নি আমার কি প্রয়োজন। চড় খেয়ে থতমত খাওয়া লিলিকে ধাক্কা দিয়ে দরজার বাইরে ঠেলে বলি, যা এক্ষুনি চা নিয়া আয়। লিলি, দশ বছর বয়সের মেয়েটি নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে ফেলতে যায় রান্নাঘর থেকে এঁটো বাসনের সপ্তূ নিয়ে কলতলার দিকে যেতে থাকা তার মায়ের কাছে বলতে যে আমি চা চাচ্ছি। লিলির মা সপ্তূ নামিয়ে রেখে চায়ের পানি বসায় চুলোয়। লিলি ধীরে হেঁটে, যেন ছলকে না যায়, ধোঁয়া ওঠা চা এর কাপটি রেখে যায় টেবিলে। একটি মলিন হাফপ্যান্ট পরনে লিলির, খালি গা, পায়ের হাঁটু অবদি ধুলো, নাকে একটি দপু য়সা দামে কেনা একটি টিনের নাকফুল। আমি যখন চা খেতে খেতে কন্যাজন্ম নিয়ে একটি কবিতা লেখার চেষ্টা করছি, মনোযোগ ছিন্ন করতে এ সময় কেউ ঘরে ঢুকুক আমি চাইনি। কিন্তু মা কেবল ঢোকেন না, তিক্ত স্বরে বলেন, ডাক্তার হইতাছস বইলা কি মানুষরে মানুষ জ্ঞান করস না নাকি? এত দেমাগ তর?
কেন কি হইছে? আমি বিরক্ত কণ্ঠে বলি।
এই বাচ্চা মেয়েডারে যে মারলি, এইভাবে মারা কি ঠিক হইছে তর? মেয়েডার গাল লাল হইয়া রইছে।
আমি লিলি লিলি কইয়া অনেকক্ষণ ডাক দিছি। আইল না কেন?
আইল না হয়ত শুনে নাই। হয়ত দূরে ছিল। তাই বইলা মারবি? একটা গরিব বাচ্চা। বাপ নাই। মা মানুষের বাড়িত কাম কইরা খায়। ছেড়িডা ফুটফরমাইস করে, দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া করে। করে যে এইডাই তো বেশি। তার মায়ে তো দিন রাইত খাটতাছে। গরিব মাইনসেরে মারিস না। আল্লাহরে অখুশি করিস না। এইসবের শাস্তি তো আল্লাহ দিবেন। ধর্ম বিশ্বাস করস না। আল্লাহ মানস না। তর কপালে যে কি আছে!
মা সরে যান। আবার মিনিট দুই পর এসে টেবিলে ছড়ানো কাগজ থেকে নারী বিষয়ে লেখা কবিতাগুলো আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলেন, এই যে মেয়েদের নিয়া কবিতা লেখস, অথচ মেয়েদের গায়ে হাত তুলস! কি লাভ এইসব লেইখা তাইলে!
আমার হাতে শাদা কাগজ, কাগজে কাটাকুটি করা কবিতার দুটি লাইন। আমার চোখ দুটি লাইনে। আমার মন অন্যত্র।
২১. আবার একদিন পীর বাড়ি
পীরবাড়ি যাওয়া হয় আমার একদিন। এবার মার সঙ্গে নয়। তিনজন বান্ধবীর সঙ্গে। হোস্টেলে মেয়েরা একটি মিলাদের আয়োজন করার ইচ্ছে করেছে। যদিও উদ্ভট শখ এটি, ডাক্তারি পড়া মেয়েদের আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা গাওয়ার সময়ও নেই বেশি, আর এটি গাওয়ার কারণ খুঁজেও তারা পাবে না কিছুই, তবু। উদ্ভট হলেও যেহেতু শখটি হয়েছে একজন মৌলবির দরকার তাদের। মৌলবি খুঁজছে মেয়েরা, এদিক ওদিক খুঁজে ব্যথর্ হয়ে শেষে আমাকে ধরলো, যেহেতু শহরের মেয়ে আমি, চেনা জানা থাকতে পারে কেউ। আমি কথা দিই মৌলবি যোগাড় করে দেব, আবেগে আবেগে আবার এও বলে ফেলি, দেব তো দেব মেয়ে-মৌলবি দেব একখানা। মেয়েদের হোস্টেলে মেয়ে-মৌলবি এসে মিলাদ পড়িয়ে যাবে। এর চেয়ে ভাল প্রস্তাব আর কি হতে পারে। তবে আমি যেহেতু আল্লাহ রসুলে মিলাদে মসজিদে বিশ্বাসী নই, আমি মিলাদের মিষ্টি খাওয়া ছাড়া আর কিছুই করব না। ওই আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা সাইয়েদেনায় শরিক হওয়ার কোনও রুচি নেই আমার। ঠিক আছে, তাই সই। আমার সঙ্গে রওনা হয় সাফিনাজ, হালিদা আর পারুল। চারজন দুটি রিক্সা নিয়ে নওমহলের পীরবাড়ি পৌঁছই। বহু বছর পর পীরবাড়ি আসা আমার। ছোটবেলায় যেমন গা ছমছম করত এ বাড়ি ঢুকতে, এই বড়বেলাতেও সেই গা ছমছমটি যায়নি। যেন এ পৃথিবী নয়, পৃথিবীর বাইরে কোনও এক জগতে ঢুকছি। এই জগতের সবাই আমাদের দিকে বিস্ময়বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। দৃষ্টিগুলো অতিক্রম করে অন্দরমহলে ঢুকি, খুঁজি ফজলিখালাকে। ফজলিখালা আমাকে দেখে, লক্ষ করি, খুব অবাক হননি, যেন কোনও একদিন এবাড়িতে আমার আসারই কথা ছিল। ফজলিখালাকে, যেহেতু তিনি আমার খালা, যেহেতু এ বাড়ির সবাই সবকিছু বেজায় অদ্ভুতুড়ে হলেও তিনি পুরোটা নন, বলি যে আমাদের একটি মেয়ে-মৌলবি দরকার, আজ বিকেলেই। মেয়েদের হোস্টেলে মিলাদ পড়িয়ে আসবে। এই আহবানে ফজলিখালার মুখে হাসি ফোটার কথা, কারণ গোটা শহরে এই একটি জায়গাতেই, এই পীরবাড়িতে, মেয়ে-মৌলবি পয়দা করা হয়, আর এই মেয়ে-মৌলবির চাহিদা আছে বাজারে, কেউ কেউ এসে মেয়ে-মৌলবি পাওয়ার জন্য তদবির করে অথবা করতে পারে। ফজলিখালার অ-বিস্মিত অ-খুশী মখু টির সামনে দাঁড়িয়ে তাড়া দিই, এক্ষুনি কোনও একটি মেয়েকে যেন আমাদের হাতে দেওয়া হয়, আমাদের সময় নেই বেশি। যে কোনও একটি মেয়ে, হুমায়রা বা সুফায়রা বা যে কেউ। আমার এই প্রস্তাব শুনেও অবাক হন না ফজলিখালা, কিন্তু হাসেন। সম্ভবত তাঁর দুটো কন্যার নাম উল্লেখের কারণে এই হাসিটি। ফজলিখালার মখু টি আগের মতই সুন্দর। হাসিটি সেই আগের মতই নির্মল। সেই হাসিটি যখনও মিলিয়ে যায়নি, হুমায়রা এসে উপস্থিত। আঁটসাঁট জামাটি থেকে হুমায়রার পেটের থাক থাক চবির্ প্রায় ফেটে বেরোতে চাইছে।বড় ওড়নায় ঢেকে রেখেছে মাথা। হুমায়রার ওড়না ঢাকা মাথাটি সামনে পেছনে নড়ে যখন আমরা বলি একজন মেয়ে-মৌলবি দরকার আমাদের। এই হুমায়রা, যে নিজের প্রেমিক প্রবর ফুপাতো ভাইকে মেদেনিপুর থেকে আনিয়ে হলেও নিজের বিয়ে ঘটিয়েছে, যখন পীরবাড়ির সব যুবতি মেয়েরা আল্লাহর পথে নিজেদের উৎসর্গ করে নিজেদের বিয়ে থা সংসার সন্তান ইত্যাদি জলাঞ্জলি দিয়েছিল যেহেতু পীর নিজে ঘোষণা করেছিলেন এই শেষ জমানায় বিয়ে করার কোনও মানে হয়না। কিন্তু এই হুমায়রা, পীরের নাতনি হয়ে, পীরের ঘোষণার অবাধ্য হয়েছে প্রথম, অবাধ্য হয়েছে ঠিক বিয়ের বয়সে এসে। ওদিকে ঘোষণা পালন করতে গিয়ে হুমায়রার চেয়ে বয়সে বড় যুবতীকুল আইবুড়ি রয়ে গেছে। এই হুমায়রা, যার বিয়ের কারণে পীরের কাছে আসা শেষ জমানায় বিয়ে না করার জন্য আল্লাহর নির্দেশটি এক রাতেই পাল্টো যায়, পাল্টো গিয়ে দাঁড়ায় আল্লাহ বলেছেন শেষ জমানায় সঙ্গী বেছে নাও খুব তাড়াতাড়ি, বান্দারা শেষ জমানায় বিয়ে করলে আল্লাহতায়ালা বড় খুশী হবেন। আল্লাহতায়ালা বড় ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পাল্টান। এই পীরবাড়ির সদস্যদের সুবিধে অসুবিধে অনুযায়ী সিদ্ধানগ্তুলো নেন তিনি। হুমায়রা আমাদের আকাঙক্ষাটি শুনে ঠিক আছে, ব্যবস্থা করছি, যা চাইছ তা পাবে বলে আমাদের অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে অন্দরমহলের অন্দরে চলে গেল। ফজলিখালাও অদৃশ্য। সম্ভবত হুমায়রা নিজে বোরখা পরে আসছে আমাদের সঙ্গে যেতে। কিন্তু ওভাবে প্রায় পঁচিশ মিনিট দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পর নিজে তো সে বোরখা পরে এলই না আমাদের সঙ্গে হোস্টেলে যেতে, বরং আমাদের নিয়ে স্বয়ং পীর আমিরুল্লাহর ঘরে ঢুকল। পীর আমিরুল্লাহ শাদা আলখাল্লায় শাদা টুপিতে বসেছিলেন বিছানায়। তাঁর মেহেদি লাগানো দাড়ি নড়ছিল যখন তিনি আমাদের দেখে মাথা নাড়ছিলেন আসুন আসুন ভঙ্গিতে। হুমায়রা দাঁড়িয়ে রইল পাশে। পীর ছাড়াও পীরের কন্যা জোহরা ছিল ঘরে, আর কিছু আইবুড়ি। আমাদের এ ঘরে ঢোকানোর কারণ আমার কাছে স্পষ্ট নয়। অনুমান করি, মেয়ে-মৌলবি পেতে হলে কেবল ফজলিখালা আর হুমায়রার অনুমতি যথেষ্ট নয়, আমাকে স্বয়ং পীর আমিরুল্লাহর কাছে আবেদন পেশ করতে হবে আমাকে, তাঁর অনুমতি মিললেই আমাদের কাজ হাসিল হবে। কিন্তু ঘরে ঢোকার পর পীর আমিরুল্লাহ কিছু জানতে চাইলেন না আমরা কেন এসেছি, কি কারণ। আদৌ তিনি আমাদের এ বাড়িতে আগমনের উদ্দেশ্য জানেন কি না আমার সন্দেহ হয়। সম্পণূর্ অপ্রাসঙ্গিকভাবে, আর কাউকে না হলেও, আমাদের, আমাকে সাফিনাজকে, হালিদা আর পারুলকে হতবাক করে বলেন, তারপর বুঝলেন কি না আল্লাহর পথে আসা খুব সহজ কথা নয়, দুনিয়াদারির মোহ ত্যাগ যারা করতে পেরেছে, তাদের জন্য আল্লাহতায়ালা আখেরাতে সর্বোচ্চ সম্মানের আয়োজন করেছেন। ঘরের অন্যান্যদের মখু থেকে আহ আহ শব্দ ওঠে। সর্বোচ্চ সম্মানের জন্য তৃষ্ণা সেই আহ শব্দে। দুনিয়াদারির লেখাপড়া, দুনিয়াদারির সাময়িক সংসার, মায়ার জাল ছিঁড়ে যারা বেরিয়ে আসে তাদের জন্য কি ধরণের সম্মান অপেক্ষা করছে পরকালে তার পুঙ্খানপুুঙ্খ বর্ণনা করেন এবং দুনিয়াদারিতে ডুবে থাকলে আল্লাহতায়ালা কি ধরনের শাস্তি লিখে রেখেছেন তারও ভয়াবহ বিবরণ দিতে তিনি ভোলেন না। বর্ণনা দীর্ঘ। বিবরণ অতিদীর্ঘ।সাফিনাজ, হালিদা আর পারুল বার বার আমার দিকে কুঞ্চিত চোখে তাকাচ্ছে, বুঝে পাচ্ছে না কি ঘটছে এখানে, ফিসফিস করছে, চল চল। দেরি হয়ে গেল। আমিও ঠিক বুঝে পাচ্ছি না কেন আমাদের এখানে দাঁড় করিয়ে আল্লাহতায়ালার শাস্তি এবং পুরস্কারের আদ্যোপান্ত জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে। হুমায়রাকে ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করি যে আমাদের সময় নেই সময় খরচ করার। মেয়ে-মৌলবির জন্য এসেছি আমরা, এসব শুনতে নয়। আমার ইশারার দিকে ফিরে তাকায় না হুমায়রা। বড় বিব্রত বোধ করি বান্ধবীদের সামনে। মেয়ে-মৌলবি যোগাড় করে দেবার লোভ দেখিয়ে এদের এই বাড়িতে নিয়ে এসে এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আটকে পড়েছি। পীর আমিরুল্লাহ আমাদের দিকে আড়চোখে মাঝে মাঝে তাকান, বাকি সময় তিনি মেঝে নয়ত সিলিংএর দিকে, উঠোনের গাছগাছালি নয়ত আইবুড়িদের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন আল্লাহতায়ালার গুণাগুণ। যেন কোনও মানুষের মখু থেকে নয়, রবোটের মুখ থেকে বেরোচ্ছে সব। কোরান হাদিসের প্রতিটি শব্দ আমিরুল্লাহ মুখস্থ ঠোঁটস্থ অন্তঃস্থ করে ফেলেছেন, পরীক্ষা সামনে এলে পরীক্ষার্থীরা যেমন মখু স্থ করে সিলেবাসের বইগুলো। শব্দগুলো আমিরুল্লাহর মখু থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে আগুনের ফুলকির মত, গায়ে এসে লাগছে ফুলকি। হঠাৎ মনে হয়, লোকটি আমিরুল্লাহ নন, লোকটি স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। এই ঘরটি ঘর নয়, এটি হাশরের মাঠ, এখানে চারজন পাপীর বিচার করছেন আল্লাহতায়ালা। বিরতিহীন বয়ানে পীর আমিরুল্লাহর মুখে ফেনা উঠে এলে হুমায়রা একটি ক্যাসেট চালিয়ে দেয়। ক্যাসেটে আমিরুল্লাহর কণ্ঠে কোরান হাদিসের কথা। ঠিক একই কথা যা তিনি বর্ণনা করেছেন মুখে। একই কথা একই ভাষায় একই সুরে। আমি এরমধ্যে অনেকবার ঘড়ির দিকে তাকিয়েছি। অনেকবার বলেছি আমি যাই। হুমায়রা চাপা কণ্ঠে ধমক দিয়েছে, আল্লাহর কথা শুনলে এত ধৈর্যহারা হও কেন? অসীম ধৈর্য নিয়ে শুনতে হয় আল্লাহতায়ালার কথা। আল্লাহর পথে এসেছো। এখন মন থেকে শয়তান ঝেড়ে ফেলতে হবে। শয়তানই আল্লাহ থেকে মন ফেরায় অন্যদিকে। এ কথায় স্পষ্ট হয় সে কি অনুমান করছে। সারা বাড়ির চোখ আমাদের দিকে, চোখগুলো জানে যে আমরা দুনিয়াদারি ফেলে আল্লাহর পথে চলে এসেছি, না এলেও এ বাড়িতে ঢুকেছি বলে আল্লাহর পথে নেওয়ার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক ধোয়া হচ্ছে পণু ্যজলে। ঘন্টা পেরিয়ে যাচ্ছে, এক ঘন্টা পেরেলো, দু ঘন্টাও। দেখছি সাফিনাজ আর হালিদার মুখে বিস্ময়, বিরক্তি আর বিষম বিষাদ। আমার গা ছমছম করে, ভূুতের ভয়ে এককালে যেমন করত। মনে হতে থাকে এ বাড়ির কোনও মানুষই সত্যিকার মানুষ নয়। এই ভূতুড়ে বাড়িটি থেকে পালাবার পথ খুঁজতে থাকি। কিন্তু যতক্ষণ আমিরুল্লাহর কোরান হাদিসের ব্যাখ্যা শেষ না হচ্ছে ক্যাসেটে, আমাকে উঠতে দেবে না হুমায়রা। অদৃশ্য শেকলে আমরা বাধাঁ। এভাবে দিন ফুরিয়ে যাবে, রাতও, টের পাই। এক ক্যাসেট ফুরিয়ে গেলে আরেক ক্যাসেট চালানো হচ্ছে। আল্লাহতায়ালার এই অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে কানাগলি থেকে বেরোবার সবকটি রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষিধেয় আমাদের পেট জ্বলছে। বিকেল পার হয়ে যাচ্ছে, হোস্টেলে মিলাদের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে আছে অনেকক্ষণ। শ্বাস দ্রুত হচ্ছে। এবার যান্ত্রিক বয়ানের মাঝখানে হঠাৎ উঠে দরজার দিকে পা বাড়াই, ভূতের রাজ্য থেকে যত শিগগির সম্ভব পালানোই যে মঙ্গল তা আমি যেমন জানি, আমার গতিময় পাদুটেও জানে। উঠোনের অনেকগুলো চোখ আমাকে হাঁ করে দেখতে দেখতে ফিসফিস করছে, হামিমা আপার মেয়ে আল্লাহর পথে এসেছে। দুনিয়াদারির লেখাপড়া আর করতে চায় না, এখন থেকে নিয়মিত কোরান হাদিস শুনতে এখানে আসবে। শুনছি বিচিত্র উচ্চারণে বাক্যগুলো, কত সুমতি হয়েছে মেয়েদের। ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিচ্ছে, দুনিয়াদারি ছেড়ে দিয়ে যারাই আসে, কাউকে হুজুর ফিরিয়ে দেন না। হুমায়রার আদেশ উপদেশ উপেক্ষা করে দৌড়ে ঘর থেকে বেরোই। পেছনে হুমায়রার চিৎকার, আল্লাহর পথে আসছে, অথচ ঘাড়ের ওপর শয়তান বসে আছে। সব ফাঁকিবাজি। উঠোনে ফজলিখালা সামনে পড়েন, তিনি তাজ্জব, চলে যাস কেন?
