আমার ওয়ার্ড এন্ডিং পরীক্ষা আর দুদিন পর।
বাদ দাও ওয়ার্ড এন্ডিং। ও না দিলে কিছু হবে না।
কিছু যে হবে সে আমি জানি। জেনেও বাড়ি গিয়ে নিজের দুটো বাড়তি জামা একটি ব্যাগে নিয়ে বেরোই দুপুরের বাস ধরতে, মা পেছন থেকে বলেন, কই যাস? ঢাকা যাই। ঢাকা কার কাছে যাস? প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে আমি বোবা কালা আমি এগোতে থাকি। পেছনে বেড়া ডিঙোনোর আমার জন্য মার উদ্বেগ, পেছনে আমার না গেলেই নয় ক্লাস। পেছনে আমার না দিলেই নয় ওয়ার্ড এন্ডিং। ঢাকা পৌঁছে রুদ্রর দুটো ঘরে শুয়ে থাকা বসে থাকা, তার নতুন কবিতা পড়া, জীবনে কখনও রান্না-না-করা হাতে রান্না করা, রিক্সার হুড ফেলে বিকেলে হাওয়া খেতে বাইরে যাওয়া, সন্ধেয় অসীম সাহার ইত্যাদি প্রিন্টাসের্ বসে নির্মলেন্দু গুণ,মহাদেব সাহার সঙ্গে রাজনীতি,সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে গল্প করে রাতে ঘরে ফেরা। রাতে শরীর নিয়ে খেলা করে রুদ্র। শরীরের গভীরে যেতে যেতে বলে, যেন পাথরকুচির ওপর দিয়ে যাচ্ছি। এত পাথরকুচি!এত পাথরকুচি!আরও গভীরে আরও গহনে অন্ধকারে পাথরকুচির ওপর ছুটতে ছুটতে ক্লান্তিতে নুয়ে বলে, উফ তোমার দাঁত এত ধারালো, এমন কামড় দিয়ে ধরো, কিছুতেই ছুটতে পারি না।
ভোর হলেই আমি ছটফট করি ময়মনসিংহে ফিরতে। এত উতলা হওয়ার কি আছে, আর দুটো দিন থাকো। দুদিন থাকা হয়। দুদিন পর রুদ্ররও দিন ফুরিয়ে আসে ঢাকার। তাকে ফিরতে হবে মোংলায়।
কিছু টাকা লাগবে আমার?
যে টাকা পাঠিয়েছিলাম ফুরিয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
কি করে ফুরোলে?
হিসেব রাখিনি।
এত বেহিসেবি হলে চলবে কেন?
মাথাটি আপনাতেই নত হয়ে আসে আমার। বাবার সামনে টাকার জন্য হাত পাততে গিয়ে ঠিক যেভাবে নত হয় মাথা, সেভাবেই নত হয়ে আসে। চোখদুটো নত। বাবার সামনে চোখও এমন নত থাকে।
কত দরকার এখন? কত দিলে চলবে?
আমি নখ খুঁটি। হাতের নখ। পায়ের নখ।
তিনশ হলে চলবে?
চলবে।
টাকাটি হাতে নিই, হাতে নিতে যদিও খুব লজ্জা হয়। নিজেকে একটি উপদ্রব মনে হতে থাকে। দাঁড়াবার শক্তি নেই, মেরুদণ্ডের জোড় নেই, একটি পরগাছার মত নিজেকে মনে হয়। আমার লজ্জা যায় না। কারও কাছ থেকে যদি না নিতে হত টাকা, যদি নিজে উপার্জন করতে পারতাম! যদি শরমের এই নত মাথাটি আমি একটু তুলতে পারতাম! ময়মনসিংহে ফিরে এলে মা বলেন, ঢাকায় কার কাছে ছিলি, কামালের বাসায়? তর বড়মামার বাসায়? ঝুনুর বাসায়?
না।
তাইলে কার বাসায়?
আমি কথা বলি না।
মা বলেন, তুই যে কোন পথে যাইতাছস! তর কপালে যে কি আছে!আল্লাহ খোদা বিশ্বাস করস না। যা ইচ্ছা তাই করতাছস। যেই বেডা তরে ফুসলাইয়া বাড়ির বাইর করতাছে, তারে নিয়া কি তুই সুখী হইবি? এখনও বাদ দে। এখনও সময় আছে। বাবা মা ভাই বোন সবার কথা ভাব একটু। কত ডাক্তার ছেলে তরে বিয়া করতে চায়। কাউরে পাত্তা দেস নাই। এখন কারে নিয়া ঘুরস, তুইই জানস। জীবনটারে নষ্ট করিস না। তর বাপের কাছে ক, ক যে তুই ভালা হইয়া চলবি। বাপের কথা শুইনা চলবি। তর বাপে তর সব খরচ দিব। এখনও সময় আছে ক।
মাকে পাশ কাটিয়ে আলনা থেকে এপ্রোনটি হাতে নিয়ে চলে যাই হাসপাতালে।
এখন থেকে বেহিসেবি হলে চলবে না। সোনার গয়নার মত টাকা পয়সা গোসলখানায়, জানালায়, টেবিলে, বিছানায় ফেলে রাখা চলবে না।জমা খরচের খাতা করে দুদিন রিক্সাভাড়া- ১২টাকা, বাদাম- ১টাকা, চা- ৩ টাকা, চিরুনি- ১ টাকা, কলম- ২টাকা, কাগজ- ৫ টাকা.. লেখার পর আর লেখা হয় না, হিসেবের খাতাটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রায় বিকেলেই, রোদের তাপ কমে এলে,পড়ার টেবিল থেকে উঠে ইয়াসমিনকে বলি, চল, বাইরে থেইকা ঘুইরা আসি। ইয়াসমিন বাইরে যাওয়ার নাম শুনে লাফিয়ে ওঠে। মা বলতে থাকেন, ও নিজে নষ্ট হইছে, এহন ইয়াসমিনডারেও নষ্ট করব।
২০. নারী
পঞ্চম বর্ষে দিনরাত্তির একটি জিনিসই করতে হয়, সেটি লেখাপড়া। সেটি থেকে আমারও নিস্তার পাওয়া হয় না। হাসপাতালে দিনে তো আছেই, রাতেও ক্লাস থাকে। অধ্যাপক দিনে পড়ান, রাতে পড়ান। কেবল অধ্যাপকই নন, ওপরের ক্লাসে যারা সবে ডাক্তার হয়েছেন, তাঁরাও পড়াতে ্ আসেন। রাজিব আহমেদও পড়াতে আসেন মেডিসিন বিভাগে। রাজিব আহমেদ এবারও প্রথম হয়েছেন,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যত চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় আছে, সবগুলোর মধ্যে শেষ বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম। ধন্দে পড়ি, এত জ্ঞান তিনি তাঁর ছোট্ট মাথাটিতে ধারণ করেন কি করে! আমার টেবিল জুড়ে রাজিবের সার্জারি মেডিসিন গাইনির খাতা। ছাপলে সাহেবদের লেখা বইএর চেয়ে ভাল বই হবে, আমার বিশ্বাস। রাজিবের করুণাধন্যা আমি, অকাতরে যা আমাকেই দিয়েছেন তাঁর রত্নরাজি। অথচ এই আমার দিকেও বড় একটা চোখ তুলে তাকান না তিনি। ডাক্তারি বিদ্যা ছাড়া অন্য কিছুতে তার কোনও ঝোঁক আছে বলে মনে হয় না। তিনি রোগীর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন রোগ এবং রোগ নির্ণয় এবং রোগের চিকিৎসায় দীক্ষা দিয়ে যান। রাত্তিরে ক্লাস শেষে আমাকে ফিরতে হয় বাড়িতে। একা ফিরতে ভয় হয়। অন্ধকারকে ভীষণ ভয় আমার। প্রায়ই ক্লাসের বন্ধুদের অনুরোধ করি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে। যেদিন অমন কেউ থাকে না যাকে বলা যায়, তখন শহরে বাড়ি যে ছেলের, যে ছেলে শহরের দিকে যাচ্ছে, তাকে বলি আমার রিক্সার পেছনে যেন তার রিক্সা যায়, বাড়ি অবদি না গেলেও অন্ধকার পথটুকু অন্তত। অন্ধকারের কি শেষ আছে! পেছনের রিক্সা আমাকে অনেকটা পার করে দিলেও থোকা থোকা কিছু কালো একা পার হয়ে যাওয়ার জন্য রয়ে যায়। বিদ্যাময়ী ইশকুলের সামনে ডান দিকের যে গলিতে আমাকে ঢুকতে হয় বাড়ির পথে, অন্ধকার ভুতের মত পড়ে থাকে ও গলিতে—বুক ঢিপঢিপ করে, রিক্সাঅলাকে জোরে চালাতে বলি, যেন এই পথটি দ্রুত পার হয়—মনে হতে থাকে এই বুঝি এক পাল ছেলে আমাকে রিক্সা থেকে নামিয়ে কাছের কোনো ঝোপের আড়ালে নিয়ে ধষর্ণ করবে, ধর্ষণের পর বুকে ছুরি বসাবে, রিক্সাঅলাটিই হয়ত অন্ধকারে রিক্সা থামিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে চলে যাবে কোথাও। দিনে যে কিছু ঘটে না তা নয়, এতকাল যা ঘটেছে, ঘটেছে দিনে। রিক্সায় বসা আমার দিকে কেউ শখ করে থুতু ছুঁড়ে দিল, পানের পিক ছুঁড়ে দিল, হা হা হাসল, খু খু কাশল। ঢিল ছুঁড়ল, ঢিল গেল কানের পাশ দিয়ে, ঢিল লাগল বুকে, মাথায়, হা হা হাসল, খু খু কাশল, দাঁত বেরোলো বত্রিশটি, খুশির দাঁত। রিক্সায় বসা আমার বাহুতে জ্বলন্ত সিগারেট নিবিয়ে মজা করল কেউ, কেউ ওড়না টেনে নিল, কেউ খোঁচা দিল, কেউ ধাক্কা, কেউ পথ আটকালো, কেউ বুক টিপে ধরল, হা হা হাসল, খু খু কাশল। তারপরও মনে হয়, দিনের চেয়েও রাত আরও ভয়ংকর, রাতে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটতে পারে। রাত আমাকে অন্ধকার কুয়োয় জন্মের মত ডুবিয়ে দিতে পারে। বাড়ি পৌঁছে আমি নিঃশ্বাস ফেলি। প্রতিবারই বাড়ি ফিরে আসা প্রতিবারই একটি বেঁচে যাওয়া দিন। গায়নোকলজি বিভাগের রাতে ডিউটি থাকে, সারারাত। রাত আটটা থেকে সকাল আটটা অবদি। রাত আটটার ডিউটিতে আমি সন্ধে ছটায় গিয়ে বসে থাকি, অন্ধকার নামার আগে আমি চলে যাই হাসপাতালে, সময়ের পোঁছলে কোনো অসুবিধে নেই, সময়ের আগে চলে আসাই অসুবিধে। এই রাত্তিরের ক্লাস-ডিউটি আমাকে অন্ধকারের ভয় দিয়েছে বটে, কিন্তু একটি চমৎকার জিনিস দেখিয়েছে, ছায়াবাণী থেকে অজন্তা সিনেমাঘরের মাঝখানের রাস্তার কিনারে বসে কুপি জ্বেলে গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা চাল ডাল সবজি চিড়ে মুড়ি ইত্যাদি বিক্রি করছে। দৃশ্যটি আমাকে আলোড়িত করে, মাকে বলি ঘটনা, মা বলেন, ওদের মতও যদি হইতে পারতাম, তাইলে বাঁচতাম। আমার মনে হয় মা হয়ত ঠিক বলেন। ফুটপাতের ওই মেয়েদের যে দৃঢ়তা এবং সাহস দেখেছি তা আমি লক্ষ করি মার নেই, আমারই বা আছে কি? নারী আমাকে উদ্বুদ্ধ করে, উদ্বুদ্ধ করে কলম হাতে নিতে, দুটো শাদা কাগজ নিতে, লিখতে। আমি না লিখে পারি না।
