বড় অফিসার।
আমিও খ্যাঁক খ্যাঁক।
মা চলে যান রান্নাঘরে। ও ঘরটিই মার জন্য শ্রেয়, তা মাও বোঝেন, আমরাও। ইয়াসমিনকে জন্য বিজ্ঞানের কোনও একটি ভাল বিষয় নিয়ে অনার্স পড়ার পরামর্শ দিই। চেয়ারে দুলতে দুলতে, পা টেবিলের ওপর।
ফিজিক্স?
অসম্ভব।
কেন অসম্ভব?
কঠিন।
তাইলে কেমেস্ট্রি। মেট্রিকে তো লেটার পাইছিলি।
না। কেমেস্ট্রিও কঠিন।
তাইলে ম্যাথ?
প্রশ্নই আসে না।
জুওলজি নে।
না।
তাইলে এক কাজ কর।
কি?
লেখাপড়া ছাইড়া দে।
ইয়াসমিনের লেখাপড়া অনেকটা ছেড়ে দেওয়া পর্যায়েই দাঁড়িয়েছে। ওকে দেখে মনে হয় না কোনও রকম ইচ্ছে আছে কখনও বই হাতে নেওয়ার। ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষার ফরম পূরণ করে এসে, দাদা বগুড়া থেকে ময়মনসিংহে বেড়াতে এলেন দুদিনের জন্য, বললেন, চল বগুড়া বেড়াইয়া আসবি, ইয়াসমিন হৈ হৈ করে বগুড়া চলে গেল বেড়াতে। দাদা আর হাসিনার বদৌলতে পাওয়া ইয়াসমিনের ঘাড়ের আর হাঁটুর ব্যথা তখনও কিন্তু সারেনি। সেদিনের সেই উঠোনের ঘটনার পর, দাদা আর হাসিনা দুজনের সঙ্গেই আমরা কথা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমি বন্ধই রেখেছি, ইয়াসমিন শুরু করেছে, তবে ভাববাচ্যে। ওকে বগুড়া থেকে ঘুরিয়ে দাদা যখন ফেরত দিতে এলেন ময়মনসিংহে, বাবা কাছে ডাকলেন তাঁর জ্যষ্ঠ পুত্রটিকে, ঘন হয়ে বসলেন পাশে।
বগুড়ায় কেমন লাগতাছে?
ভাল।
কি রকম ভাল?
কোম্পানী বাড়িভাড়া দিতাছে।
বাড়ি কেমন?
ভালই। তিনটা রুম আছে। ড্রইং বেড ডাইনিং।
উঠান আছে?
না উঠান নাই, উঠান থাকব কেন? এপার্টমেন্ট বিল্ডিং ত।
নিজে বাজার কর?
জিনিসপত্রের দাম কেমন বগুড়ায়?
তা একটু দাম বেশিই আছে ওইখানে।
সংসার খরচে মাসের পুরা টাকাই কি চইলা যায়?
খরচ ত আছে, কিছু তো যায়ই।
রিপ্রেজেনটিটিভের চাকরি কইরা আর কতই বা পাও!
আমি ত আর রিপ্রেজেনটিটিভ না, কবেই না সপুারভাইজার হইয়া গেছি!
তফাতটা কি?
ঘোরাঘুরিটা কিছু কম।
টাকা পয়সা জমাইতাছ ভবিষ্যতের জন্য?
কিছু কিছু।
শরীরে সেন্ট মাইরা বাবুগিরি কইরা ঘুরতাছ, টাকা পয়সা ইচ্ছামত উড়াইতাছ, জমাইবা কেমনে?
কই সেন্ট? সেন্ট ত আজকাল কিনিই না।
নিজের বাড়িঘর সব রাইখা বিদেশে পইড়া আছ কেন?
চাকরি তো করতে হইব।
ওই চাকরি ছাইড়া দিয়া ময়মনসিংহে ফিরো। আমি তোমারে আরোগ্য বিতান দিয়া দিতাছি। ওষুধের ব্যবসা কর। চাকরিতে যা পাও, তার চেয়ে ব্যবসা ভাল কইরা করলে ভাল টাকা কামাইতে পারবা।
টানা চার ঘন্টার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়, দাদা ফাইসন্স কোম্পানীর চাকরি ছেড়ে বাপের ব্যবসা দেখাশুনো করবেন। বগুড়া ফিরে গেলেন তিনি, ওখান থেকে মাস খানিক পর বউবাচ্চাজ্ঞজনিসপত্র সব নিয়ে, কেবল শখের চাকরিটি না নিয়ে ফিরে এলেন। দাদা বগুড়ায় চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার পর বাবা নতুন আসবাব কিনেছেন, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসবও কিনেছেন। ঘর এখন খালি নেই যে দাদা তাঁর সব আসবাব ফেলতে পারবেন। বিশাল খাবার টেবিলটি আর তালাবন্ধ কাচের বাসনপত্রের আলমারিটি দাদা তাঁর আগের শোবার ঘরে রেখে ঘরটিকে আলাদা একটি খাবার ঘর বানিয়ে বাবার নির্দেশে নিজের আজদাহা খাট আলমারি আয়নার টেবিল আলনা ইত্যাদি উঠোনের দুটো টিনের ঘরের একটিতে গুছিয়ে স্ত্রীপুত্রসহ থাকতে শুরু করলেন। দাদারা ফিরে আসার পর দাদা আর হাসিনার কোনও প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বা না ছাড়া কিছু কথা হয় না আমার, বড়জোর খুব প্রয়োজনে দুএকটি কথা হতে থাকে, কিন্তু যা হতে থাকে তা ভাববাচ্যে। সম্বোধনহীন কথা বলায় পারদশির্ আমার জন্য এ কঠিন কিছু নয়। বাবা আরোগ্য বিতানের পাশে দুটি ঘর ভাড়া নিয়ে একটি লেপতোশকের ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দিয়ে আরেকটিতে নিজের আলাদা চেম্বারের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। দাদার হাতে আরোগ্য বিতান, ওষুধের দোকান। বাবার হাতে রোগী দেখা, দাদার হাতে ব্যবসা। ব্যবসায় খাটাতে বাবা নিজের কয়েক লক্ষ টাকা অকাতরে ঢেলে দিলেন দাদার হাতে।
আমার খরচ চলতে থাকে রুদ্রর টাকায়। আমার কি প্রয়োজন না প্রয়োজন তার দিকে বাবা ফিরে তাকান না। আমাকে নিয়ে তাঁর কোনও আর উৎসাহ নেই। আমি উচ্ছন্নে চলে গেছি, লাগাম ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছি, আমি নিষেধের বেড়া ডিঙিয়ে গেছি, আমি আর আমি নেই, আমি নষ্ট হয়ে গেছি। আমাকে নিয়ে আশা ভরসাও নেই আর। এই বাবা, মনে হত,আমাকে ডাক্তার বানানোর জন্য, জীবন উৎসর্গ করেছেন। অথচ রুদ্রকে অপমান করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে আমার বেরিয়ে যাওয়া, এবং একরাত বাড়ি না ফেরার কারণে তিনি আমাকে প্রায় ত্যাজ্য-কন্যা করে দিলেন! ধ্বসে গেল আমাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্নের প্রাসাদ!কি সহজ এই ধ্বসে যাওয়া! কী পলকা স্বপ্ন নিয়ে ছিল তাঁর বাস!এমন তো নয় যে আমি কাউকে বলেছি রুদ্রর সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্কে আছে বা রুদ্রকে আমি বিয়ে করেছি বা আমি তোমাদের আর পরোয়া করি না!যদি বলতাম, বুঝতাম, তিনি হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে যা করার করছেন। বাবার আচরণ আমাকে ক্ষুব্ধ করে। মনে হতে থাকে এ জগতে রুদ্র ছাড়া আপন কেউ নেই আমার।
রুদ্র আসে ময়মনসিংহে। শহরে রিক্সার হুড ফেলে দুজন ঘুরি। যে দেখে দেখুক। বাবার কাছে খবর যায় যদি, যাক, আমার আর ভয় কিসের! রুদ্রর দাবি আমাকে তার সঙ্গে হোটেলে থাকতে হবে রাতে। ময়মনসিংহ শহরের ঘিঞ্জি এলাকায়, ছোটবাজারে, শান্তনীড় নামের হোটেলে একটি ঘর ভাড়া করে সে। অন্ধকার সিঁড়ি পার হতে ভয় ভয় লাগে। চারতলায় একটি ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে ঘরে, একজনের একটি চৌকি কেবল ধরে, ঢুকে আমি নিঃশ্বাসের জন্য একটু শুদ্ধ হাওয়া খুঁজি, পাই না। হাওয়া ভারি হয়ে আছে, হাওয়ায় পেচ্ছাবের গন্ধ, কফ থুতুর গন্ধ। ঘরে কোনও জানালাও নেই যে খুলে দেব। বিছানার চাদরে বালিশে এমনকি এক চিলতে পেচ্ছাবপায়খানাটির সর্বত্র মনে হয় ছড়িয়ে আছে সিফিলিসের জীবাণু শরীর বেয়ে বিμছুর মত হেঁটে উঠবে কোথাও যদি স্পর্শ করি। গা ঘিন ঘিন করে। বিছানায় নতুন চাদর বিছিয়ে দিতে বল। বালিশ পাল্টো দিতে বল। আমার ঘেন্না লাগছে, অন্য কোনও ভাল হোটেলে চল। না রুদ্র কিছুই করবে না। আমাকে টেনে সে বিছানায় নেয়। টেনে আমার জামা খুলে নেয়, টেনে আমার পাজামা। আমার ওপর নিজে সে ন্যাংটো হয়ে চড়ে বসে। আমার মন বিছানার নোংরা চাদরে, নোংরা বালিশে। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা আমার শরীর নিয়ে রুদ্র আনন্দ করে। আনন্দ শেষে সে সিগারেট ধরায়। গুমোট ঘরটির নানা গন্ধের মধ্যে যোগ হয় সিগারেটের গন্ধ। পেটের নাড়ি বেয়ে বমি উঠে আসে গলায়। মাথা ঘোরে। রুদ্র বলে, কাল ঢাকা চল।
