বিস্তৃত এলাকা জুড়ে মেয়ে মানুষেরা আজ বেসাতি সাজায়, দেহ নয়, রূপ নয়, সমুখে তাদের পণ্য ধুলায় বিছানো, কুমড়া পটল লাউ পুঁই আর ডাঁটা শাক ক্ষেতের বেগুন, কে যেন সুদূর থেকে করুণ বেসুরো বাঁশি নিয়ত বাজায়। কারো বউ, কারো বোন,কারো বা জননী তারা, তোমরা তো জানো, ঘোমটা ফেলেছে তারা, খসিয়েছে পান থেকে সংস্কারের চুন। অভাব নেমেছে দেশে, অসুরের শক্তি দেহে বেজায় বেহায়া, বিশাল হাঙর মখু , ছিঁড়ে খায় মাটি থেকে শস্যের শিকড়, অপয়া অভাব ঘরে শুষে খায় প্রিয় খুব ভাতের সুঘ্রাণ, মারমুখো জানোয়ার দুহাতে খাবলে নেয় প্রশান্তির ছায়া, রাত থেকে নিদ্রা কেড়ে আগামীর স্বপ্ন ভেঙে পুড়িয়েছে ঘর, ভিটেমাটি সব গেছে, পোড়া দেহে শুধু কাঁদে বিকলাঙ্গ প্রাণ। অন্ধকার জীবনের দরোজায় কড়া নাড়ে আলোকিত ক্ষিদে, বিকট হাত পা মেলে বেলাজ বেঢপ ক্ষিদে নৃত্য করে খুব, গতর খাটিয়ে খেয়ে অভাগীরা তীর ছোঁড়ে ক্ষিদের শরীরে, রঙচঙ মুখে মেখে তেরঙা শাড়িতে নয়, বড় সাদাসিধে, শহরের ফুটপাতে সাহসে দাঁড়লো এসে পুণ্যবতী রূপ, সুলভে শরীর নয়, গর্বিত নারীরা বেচে দধু কলা চিড়ে।
নারীর জীবন আমাকে আয় আয় বলে ডাকে। নারী আমাকে ভাবাতে থাকে। নারীর দুঃখ বেদনা আমি অনুভব করতে থাকি। নিজে যে কষ্ট পেয়েছি জীবনে, সে তো নারীর কষ্টই। কেবল আমার কি! মনে হয় এ কষ্ট আরও হাজার নারীর।
কোমল কুমারী নারী শরমে আনত মখু বিবাহের দিন, অজানা সুখের ভয়ে নীলাভ শরীর কাঁপে কি জানি কি হয়। সানাইয়ের সুর শেষ, রাত বাড়ে, বধূটির কন্ঠ হয় ক্ষীণ, পুরুষ প্রথম এসে নিশব্দ নির্জন ঘরে কি কথা যে কয়! দেবতা নামক স্বামী লাগিয়ে দোরের খিল বক্র চোখে দেখে, লোভনীয় মাংসময় অনাঘ্রাতা বালিকার সলজ্জ শরীর। বহুদেহ বহুবার উ−ন্মাচিত করেছে সে নিষিদ্ধ পল্লীর, অভ্যস্ত হাতের কালি নারীর কপাল জুড়ে ভাগ্যখানি লেখে। অবুঝ কিশোরী মেয়ে, স্বপ্ন সাধ ভাঙে তার, দুঃখে বাঁধে বুক, এরকমই বুঝি হয়, পৃথিবীর এরকমই নিয়ম কানুন। পিশাচি উল্লাস করে নি−ষ্পষিত দেহমনে বাসনার খুন, পরম সোহাগে বধূ উপহার নিল অঙ্গে নিষিদ্ধ অসুখ । বছর পেরোলে নারী বিকলাঙ্গ শিশু এক করলো প্রসব, জটিল রোগের বিষ, আগুন জ্বালিয়ে দেহে স্বাগত জানায়! সিফিলিস রোগ নাম, রক্তের প্রপাত বেয় বসত বানায়, পেলব শুভ্রতা ছেঁড়ে, বিষাক্ত নখরে ছেঁড়ে হাড় মাংস সব। রাত্রির হিংস্রতা এসে জীবনের সূর্য খেয়ে নেভায় সকাল, দুরারোগ্য কালো পাপ অকালে নারীকে শুষে কেড়ে নেয় আয়ু। অবশ হাত পা মেলে পড়ে থাকে বোবা কালা জর্জরিত স্নায়ু আছর করেছে জীনে—এমন কথাই লোকে জানে চিরকাল।
আমাকে নারীতে পায়। আমাকে বেদনায় পায়।
মেয়েটির বাপ নেই, জমিজমা কিছু নেই, কোমল বয়স, গ্রামজুড়ে কথা ওঠে, মায়ে তাকে খুঁটি দেবে পুরোনো ঘরের। কেউ তো নেয়না মেয়ে, বাঁশির বাদকও শুনি যৌতুকের বশ, কে তবে কোথায় আছে? ভীমরতি-বুড়ো পরে পোশাক বরের। বুড়োর হাপাঁনি রোগ, চারটে সতিন ঘরে ঠ্যাং মেলে শোয়, আকুল নয়নে মেয়ে চারপাশে খোঁজে শুধু বাঁচার আশ্রয়, কোথায় বাসর ঘর, ভেঙে চুরে স্বপ্ন সব ছত্রখান হয়, নিয়তির কাছে হেরে এইভাবে হল তার যৌবনের ক্ষয়।
মা সে মা হোক, মা তো নারীই, মার কষ্টগুলো এই প্রথম আমি স্পর্শ করি।
অনেক বলেছে নারী, তাবিজ কবজ করে ফেরাতে চেয়েছে, তবু তো ফেরে না স্বামী, একেতে মেটেনা শখ, বিচিত্র স্বভাব। কোথায় মোহিনী মায়া কি জানি কেমন করে কি সুখ পেয়েছে, একেতে মেটে না শখ, বিপুল আমোদে নাচে বিলাসি নবাব। একাকিনী ঘরে নারী চোখের জলের নদী বহায়ে ভীষণ, মাজারে পয়সা ঢালে পীরের মুরিদ হয় দুনিয়া বিমখু , বুকের ভেতরে তার কষ্টের পাহাড় জমে, ছেঁড়াখোঁড়া মন, বানানো বিশ্বাস নিয়ে বিকৃত স্নায়ুরা চায় দেখানিয়া সুখ । পীরকে হাদিয়া দিয়ে, মাজারে সেজদা দিয়ে উদাসীন নারী, একালে সুখের ঘর কপালে জোটেনি বলে পরকাল খোঁজে, খোদা ও নামাজে ডুবে দিতে চায় জীবনের হাহাকার পাড়ি, বিস্বাদ জীবনে নারী অ−লৗকিক স্বপ্ন নিয়ে চক্ষু দুটি বোজে।
একদিন শেষ-বিকেলে সাফিনাজের সঙ্গে রিক্সা করে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম, গাঙ্গিনার পাড় থেকে ডানদিকে রিক্সা মোড় নিতেই ও চাপা স্বরে বলে উঠল,ওই যে দেখ প্রস্টিটিউট যায়। বল কি! আমি প্রতিবাদ করেছি। এ তো সাধারণ একটি মেয়ে। সাফিনাজ হেসেছিল শুনে। আমি এদের প্রায়ই দেখি রাস্তায়, কোনওদিন মনে হয়নি, এরা পতিতা। দরিদ্র মেয়ে, গায়ে সস্তা শাড়ি, মুখে হয়ত শখ করে আলতার রং লাগিয়েছে। এরকম শখ তো যে কোনও মেয়েরই হয়। রাস্তায় দেখা বেশ্যা নামের মেয়েটির প্রতি আমার কোনো ঘণৃা হয়নি। বরং ওর জন্য আশ্চর্য রকম মমতা জন্ম নেয় আমার।
তিনকূলে কেউ নেই, ডাঙর হয়েই মেয়ে টের পেয়ে যায়, অভাবের হিংস্র হাত জীবন কামড়ে ধরে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়। যুবতী শরীর দেখে গৃহিণরা সাধ করে ডাকে না বিপদ, বেসুমার ক্ষিদে পেটে, নিয়তি দেখিয়ে দেয় নারীকে বিপথ। দুয়ারে ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে বেকার নারী তবু বেঁচে থাকে, স্টেশন কাচারি পেলে গুটিসুটি শুয়ে পড়ে মানুষের ফাঁকে। এইসব লক্ষ্য করে ধড়িবাজ পুরুষেরা চোখ টিপে হাসে, দেখাতে ভাতের লোভ আধাঁর নিভৃতে তারা ফন্দি এঁটে আসে। তিনকুলে কেউ নেই, কোথাও কিছুই নেই, স্বপ্ন শুধু ভাত, শরমের মাথা খেয়ে এভাবেই নারী ধরে দালালের হাত।
