দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে বাড়ির পরিবেশে। আমার দিকে সকলের চোখ। ঘৃণার চোখ!চোখ সংশয়ের, অবিশ্বাসের। আমি যেন আর আগের আমি নই, আমি অপ্রকৃতিস,্থ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বাড়িতে বসে আছি। ইচ্ছে করে বেরিয়ে পড়ি বাড়িটি থেকে। যেদিকে দুচোখ যায়, যাই। অনিশ্চয়তা আমাকে ছোবলে ছোবলে নীল করছে। এ সময় আপাতত সমস্যার একটি সমাধান করেন মা। মা নিজে গিয়ে নতুন বাজার থেকে ডাবঅলা ধরে আনেন। রশিদকে পাননি, অন্য লোক। নিজের দুটো গাছের কটি ডাব বিক্রি করে আমাকে টাকা দিলেন কলেজে যাওয়ার। দিলেন কিন্তু বললেন বাবার কাছে যেন আমার অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চেয়ে, এমন অন্যায় জীবনে আর কখনও করব না প্রতিজ্ঞা করে, নিয়মিত কলেজে হাসপাতালে যাওয়ার খরচ নিই। না আমি তা করি না। রুদ্রকে চিঠি লিখি বাড়ির অবস্থা জানিয়ে। এও লিখি সে যেন আমাকে কিছু টাকা পাঠায়। রুদ্র চিঠি পেয়ে মানিঅর্ডার করে টাকা পাঠায়। এক হাজার টাকা। এই টাকা আমার সকল দুর্ভাবনাকে আমার চৌহদ্দি থেকে দূর দূর করে দূর করে। কেবল কলেজে যাওয়া আসাতেই যে টাকা খরচ হতে থাকে তা নয়। বিকেল হলে ইয়াসমিনকে নিয়ে রিক্সায় হুড ফেলে দিয়ে অর্থাৎ বাধ্যতামূলক ঘোমটাটি খসিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকি শহরময়। অদ্ভুত এক আনন্দ এই ঘুরে বেড়ানোয়। যেন দুটি মুক্ত পাখি, যেন বাধঁ ন ছিঁড়ে বেরিয়েছি এইমাত্র। মালাইকারি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে নেমে খেয়ে নিই দুটো মালাইকারি, দইয়ের ওপর ভেসে থাকা রসগোল্লাও। বাবা বাড়িতে বিস্কুট পাঠাচ্ছেন না অনেকদিন, বিস্কুটের দোকানে গিয়ে এক পাউন্ড বিস্কুট কিনে নিই। মা পীরবাড়ি যাবেন, রিক্সা ভাড়া নেই, উদার হস্ত দিয়ে দেয় পাঁচ টাকা। বাড়িতে ডাল ভাত ছাড়া কিছু নেই, ইয়াসমিনকে নিয়ে গাঙ্গিনার পাড়ের রেস্তোরাঁয় গিয়ে মাংস ভাত খেয়ে আসি, কখনও আবার নতুন চিনে রেস্তোরাঁয়।
বাবা লক্ষ করেন আমি কলেজে যাচ্ছি, কিন্তু তার কাছে হাত পাতছি না। লক্ষ করেন, বাড়িতে ডাল ভাত ছাড়া অন্য কিছুর ব্যবস্থা না করার পরও কোনও বাজারের লিস্টি কেউ পাঠাচ্ছে না তাঁর কাছে, এসব তাঁর দম্ভে বিঘ্ন ঘটায়। মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, ওই ছেড়ি কলেজে যে যায় রিক্সাভাড়া কই পায়? তুমি দেও?
আমি দিয়াম কোত্থেকা? আমার হাতে কোনও টাকা পয়সা দেইন নাকি?
তাইলে পাইছে কই?
কি জানি!
কি জানি মানে? তোমার জানতে হইব না?
জাইনা কি হইব? টাকা পয়সা দেওয়া বন্ধ কইরা দিছেন। তার তো যোগাড় করতে হইব! যোগাড় করছে।
কিভাবে যোগাড় করছে? কার কাছ থেইকা।
সেইডা তারে গিয়া জিগান। কথা বন্ধ করছেন কেন? কথা বন্ধ করলে কি সব সমস্যার সমাধান হইয়া যায়?
আমার বাড়ি থেইকা যে চইলা যাইতে কইছি, যায় না কেন?
কই যাইব?
যেই বেডার কাছ থেইকা টাকা নিছে তার কাছে যাক গা।
গেলে খুশি হইন নাকি? এহন তো নোমান কামালরে আর টাকা পয়সা দিতে হয় না। আমারে ত কিছুই দেইন-ই না। দুইডা মেয়েরে যা দিতাছিলেন, তাও সহ্য হইতাছে না আপনের। আপনের টাকা পয়সা একলা আপনেই ভোগ করতে চান, ভোগ করেন। মেয়েরা ত আইজ না হইলেও কাইল যাইবই এই বাড়ি ছাইড়া। এহনই ভাগাইতে চান কেন? বাড়ি খালি করতে চাইলে কন, আমরা সবাই যাই গা। একলা থাকেন।
বাবা কোনও উত্তর দেন না। শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকেন উঠোনের দিকে। বাবা যে ইয়াসমিনকে ডেকে নিয়ে বলবেন, তুমিই এখন আমার স্বপ্ন। তুমি এখন আমার মান রাখো। সে সম্ভাবনাটিও নেই। ইয়াসমিন, বৃত্তিধারী ছাত্রী, মেট্রিকে প্রথম বিভাগ পাওয়া, রসায়নে তারকাখচিত নম্বর পাওয়া, ইন্টারমিডিয়েটে এসে দ্বিতীয় বিভাগ। বাবার আশার প্রদীপ নিবিয়ে খোলাম-কুচির মত ভেঙে পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর ও বলতে শুরু করেছে, আসলে ওই দেবনাথ স্যারের জন্যই আমার পরীক্ষা ভাল হয় নাই।
দেবনাথ পণ্ডিত ইয়াসমিনকে বাড়িতে এসে পড়াননি, আমাকে যেমন পড়িয়েছিলেন। দলে পড়িয়েছেন।একশ ছাত্র ছাত্রীকে পড়াতে হলে দল ছাড়া আর কোনও গতি নেই। ওই দলের এক কোণে পড়ে থেকে ইয়াসমিন অংকের মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বোঝেনি। আমার অবশ্য মনে হয় বাড়ির নতুন দুজন মানুষ এক হাসিনা দুই সুহৃদ নিয়ে ওর উত্তেজনা এত বেশি ছিল যে বই নিয়ে ও মোটেও বসতে চায়নি। আমি পড়তে বসার জন্য অনুরোধ করলে আমাকে ধমকে সরিয়ে দিয়েছে। বাবা বললে অবশ্য বসেছে, কিন্তু সে বসা সত্যিকার বসা ছিল না। দ্বিতীয় বিভাগ নিয়ে ওর পক্ষে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া সম্ভব নয়। বাবা জলদগম্ভীর স্বরে বলেন,জীবন তো বরবাদ হইয়া গেল। এখন ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষা দিয়া দেখ ফাস্ট ডিভিশান পাস কি না। মেডিকেলে ভর্তি হইতে পারস কি না। তা না হইলে গাধা ছাত্রীদের মত ওই আনন্দমোহনে গিয়াই বিএসসি তে ভর্তি হ। কি করবি আর।
বাড়িতে ইয়াসমিনের আদর খানিকটা কমে যায়। অবশ্য মার কাছে কমে না। মা বলেন, কোনও লেখাপড়াই খারাপ না। ভাল কইরা পড়লে সব লেখাপড়াই ভাল। শুনে, বাবা নাক সিটকে বলেন, এই অশিক্ষিত বেটি বলে কি এইসব!
মা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেন, কেন সুলেখা তো ডাক্তারি পড়ে নাই। কি সুন্দর এম এ পাশ কইরা এখন ব্যাংকের জি এম হইছে।
বাবা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসেন। বাবার হাসি থেকে দূরে সরতে মা রান্নাঘরের দিকে যখন যেতে থাকেন, থামিয়ে বলি, কওতো জিএম মানে কি?
