মহাখালিতে বাস থামলে রিক্সায় মুহম্মদপুর যাই। শেষ বিকেলে বেরোই বাইরে। টিএসসি চত্বরে দাঁড়িয়ে রুদ্র বন্ধু খুঁজতে থাকে আড্ডা দেওয়ার। সন্ধের অন্ধকারে মাঠে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে বন্ধুদের দেখা মেলে। লেখক বন্ধু কবি বন্ধু সাংবাদিক বন্ধু নাটক করা বন্ধু রাজনীতি করা বন্ধু গান গাওয়া বন্ধ কিছু না করা বন্ধু। কারও না কারও দেখা মেলেই। রুদ্র বউ বলেই আমার পরিচয় দেয় এখন, আমি আপত্তি করি না। এক বাড়িতে থাকছি, বাবার তর্জনি উপেক্ষা করেছি, আর কিসের সঙ্কোচ! আড্ডা শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুটো থালা, চারটে চায়ের কাপ, দুটো পানির গেলাস, দুটো ছোট পাতিল চাল ডাল তেল ডিম নুন চাপাতা চিনি ইত্যাদি কিনে বাড়ি ফিরি। সংসারের প্রথম কেনাকাটা, রুদ্র হেসে বলে। রেস্তোরাঁয় খেতে তার আর ভাল লাগে না, এখন থেকে ঘরে রান্না হবে, ঘরে খাবে। কিন্তু রান্নাটি করবে কে! আমি তো কখনও রান্না করিনি, না করলেও এটি আমাকেই করতে হবে। এখন থেকে সংসারি হবে সে। আর বাহির নয়, আর টইটই নয়, আর এলোমেলো জীবন নয়। আমি যে রান্না করতে জানি না, আমাকে যে কাল সকালেই চলে যেতে হবে ময়মনসিংহে, ক্লাস আছে, খুব জরুরি ক্লাস, পরীক্ষা আছে, খুব কঠিন পরীক্ষা, বলা হয় না। সংসার উদ্বোধন করতে গিয়ে ভাত রাঁধতে গিয়ে ভাত হয় না সেদ্ধ, বাড়িঅলার কাছ থেকে মশলা ধার করে ডাল চুলোয় দেওয়া হয় বটে, তবে ডাল না হয়ে জিনিসটি অন্য কিছু হয়। শেষ পর্যন্ত ডিম ভেজে মখু রক্ষা করি। ওই খেয়ে উৎফুল্ল রুদ্র রাতে আমাকে স্পর্শ করে। রুদ্র স্পর্শ করলে আমার সারা শরীর অবশ-মত হয়ে যায়। শরীরে রোধ নিরোধ মনে জোর যুক্তি যা কিছু আছে, নষ্ট হয়ে যায়। আমি জলের মত রুদ্র-পাত্রে গড়িয়ে যাই। এ কি ভালবাসা নাকি সংস্কার, নিজেকে প্রশ্ন করি।যেহেতু একটু একটু করে লোকে জানতে পারছে যে আমাদের বিয়ে হয়েছে, কাগজপত্রে নয়ত মনে, যেহেতু একবার বিয়ে হলে আর ফেরার উপায় থাকে না, যেহেতু লোকে বলে স্বামীর সঙ্গে যে করে হোক মানিয়ে নিয়ে বাকি জীবন পার করা, আর দশটা মেয়ে যেমন করে, ভাল, তাই কি!তাই কি আমি রুদ্র থেকে সরে আসতে পারছি না, সরবো ভেবেও? নাকি খুব সরল এবং সোজা একটি কারণ,যে,আমি তাকে ভালবাসি। সংস্কার কি আমি খুব একটা মানি? মানলে হাবিবুল্লাহর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হত না,যেহেতু মেয়েদের ছেলেবন্ধু থাকাটা সংষ্কারের বাইরে। মানলে রুদ্রর সঙ্গেই কোনও সম্পর্কে দাঁড়ায় না, যেহেতু রুদ্র ডাক্তারও নয়, ইঞ্জিনিয়ারও নয়, একজন ডাক্তার-মেয়ের স্বামী সাধারণত যা হয়ে থাকে, এবং যা হওয়া স্বাভাবিক বলে সকলে, সকলে বলতে আমার আত্মীয়, প্রতিবেশি, চেনা অচেনা মানুষেরা মনে করেন। আমি তো সেই সংস্কারের পরোয়া না করে রুদ্রর মত চালচুলোহীন ছেলেকে বলেছি ভালবাসি। স−ম্ভাগে তৃপ্ত তুষ্ট রুদ্রকে দেখে ভাবি রুদ্র কি সত্যিই আমাকে ভালবাসে? ভালবাসলে অন্য নারীর শরীর কি করে ছোঁয় সে? আমি তো পারি না। এই যে হাবিবুল্লাহ প্রেমার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ, আমার তো ইচ্ছে হয় না ওকে খানিকটা ছুঁয়ে দেখতে। হাবিবুল্লাহর মত সুদর্শন পুরুষ চোখের সামনে ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমি তো এতটুকু তৃষ্ণাতর্ হব না। শরীর তো মন থেকে খুব দূরে থাকে না। এই ভাবনাগুলি একান্ত আমার, দূরে সরাতে চাইলেও ভাবনা আমাকে ছেড়ে এক পাও দূরে যায় না।
ময়মনসিংহে ফিরে আসি। মা জিজ্ঞেস করেন, কই ছিলি? আমি কোনও উত্তর দিই না।
আমি কোথায় যাই, বা না যাই, কোথায় থাকি না থাকি, তা কারও জানার দরকার নেই। বলে দিই। স্পষ্টই বলে দিই।
বাড়ি থেইকা বাইর হইয়া যা না। যেই বেডার সাথে রাইত কাডাইছস, তার কাছেই যা।
সময় হইলেই যাইয়াম। কারো কইয়া দিতে হইব না।
মা গাল দিয়ে হলেও কথা বলেছেন, বাবা কথা বলেন না। আমার ছায়াও মাড়ান না। কলেজে যাওয়ার রিক্সাভাড়াও দেন না। সাত দিন পার হয়ে যায়, বাবার হাত থেকে টাকা খসছে না। আমি যে একটি প্রাণী বাড়িতে আছি, বাবা যেন তা জানেন না, জানলেও ভুলে গেছেন। সাতদিন পর সকালবেলা মা মিনমিন করে বাবাকে বলেন, ও কি কলেজ বন্ধ কইরা বইসা থাকব নাকি। রিক্সাভাড়া দিয়া যান।
মার দিকে একটি খেয়ে ফেলা দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে রুখে ওঠেন, ওরে বাসাত থেইকা বাইর হইয়া যাইতে কও। আমার বাসায় থাকার ওর কোনও অধিকার নাই। বাবা আমার উদ্দেশে ছুঁড়ে দিতে থাকেন এক একটি বিষমাখা তীর, আমার বাসায় থাকতে তাকে কেডা কইছে? ওই বেডা কেডা? কোথাকার বেডা? বেডা কি করে? কত বড় সাহস এই ছেড়ির ওই বেডারে বাসায় আনে। কত বড় সাহস আমার সামনে দিয়া বেডার সাথে বাইরে যায়! ও আমার বাসায় কি করে? লাত্থি দিয়া বাসা থেইকা বার করব, না কি ও এমনে যাইব?
বাবা চলে গেলে মা বলেন আমাকে, বুঝ,মজা বুঝ। নিজের জীবনডার কত সর্বনাশ করছস। তর বাপে তরে আর লেহাপড়ার খরচ দিব না। মেডিকেলে পড়া তো বন্ধ হইব। বাপের খুব স্বপ্ন আছিল একটা মেয়ে ডাক্তার হইতাছে। সব গেছে।
সব গেছের বিলাপ শুনি বসে।
রাতে আমার পাশে বসে মা নরম স্বরে বলেন, যেই লোকটার সাথে গেছিলি, তার নাম কি? তার নাম কি রুদ্র? রুদ্রকে কি তুই বিয়া করছস?
আমি মার সামনে থেকে উঠে চলে যাই কথা না বলে। মা আমার পেছন পেছন হাঁটেন আর বলেন, বিয়া না করলে ক যে বিয়া করস নাই। কই তর বাপেরে। তর বাপ হয়ত নরম হইতেও পারে।
