পিচ গলছে রাস্তায়। গোলপুকুর পাড়ের দিকে হাঁটতে থাকা রুদ্রর কাছে পৌঁছোই আমি, রুদ্র ফুঁসছে রাগে। আমি যে নিষেধের এই বেড়া ডিঙিয়ে তার কাছে চলে এলাম, আমি যে একদিকে বাবা মা বোন আরেক দিকে রুদ্র এ দুজনের মধ্যে রুদ্রকে বেছে নিলাম, এ যে কত বড় একটি পদক্ষেপ আমার, এ সম্ভবত তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি। আমি যে সবল অস্বীকার করলাম তাঁকে যাকে আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি, যিনি আমার জীবনটি গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করছেন, তাঁরই আদেশ জীবনে এই প্রথম আমি অমান্য করার সাহস করেছি, তাঁরই রক্তচক্ষুকে জীবনে এই প্রথম আমি পরোয়া করিনি, তাঁরই অহঙ্কার আমি চুড়ো থেকে এক ধাক্কায় ফেলে দিয়েছি মাটিতে, তাঁরই সম্মান আমি আজ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি, তাঁরই স্বপ্ন আমি আজ ভেঙে টুকরো করেছি, বোঝা সম্ভব নয় বলেই রুদ্র বলে, আমাকে অপমান করতে বাড়িতে নিয়েছিলে তুমি! না অপমান করতে নয়। আমি তো জানতাম না বাবা অমন হঠাৎ বাড়ি আসবেন! তুমিই তো চাইতে অবকাশে যেতে, বাবার সঙ্গে দেখা করতে! চাইতে তো! চাইতে না! গোলপুকুর পাড়ের আগুনে রাস্তা থেকে একটি রিক্সা নিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ডের দিকে দুজন। কোনও প্রস্তুতি নেই আমার ঢাকা যাওয়ার কিন্তু বাসে চড়ি। বাড়ি থেকে অনুমতি তো নেওয়া হয়ইনি, এমন কি কাউকে না জানিয়ে, যে, আমি ঢাকা যাচ্ছি, আমি বাসে চড়ি। সকলে ভাববে কোথায় আমি, আমি কেন বাড়ি ফিরছি না, বিকেল হবে রাত হবে দুশ্চিন্তা বাড়বে তা জেনেও আমি বাসে চড়ি। বাস যেতে থাকে ঢাকার দিকে। আগুনে বাতাস আগুনে ধুলো উড়িয়ে চোখে মুখে ছিটোতে থাকে। আমি শীতল চোখে চেয়ে থাকি ওড়াওড়ি ধুলোর দিকে, শীতল চোখে চেয়ে থাকি রাস্তার কাক কুকুর আর মানুষের ছোটাছুটির দিকে। আমি শীতল চোখে চেয়ে থাকি গরুগাড়ি, মটর গাড়ি, রিক্সা,বাস, ট্রাকের দিকে। আমি শীতল চোখে চেয়ে থাকি ফসল উঠে যাওয়া নিঃস্ব খেতের দিকে, চেয়ে থাকি নিজের দিকে।
বাসের সবচেয়ে পেছনের আসনে বসা রুদ্রর বাঁ পাশে একটি লোক রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে তার পাশের লোকের সঙ্গে। রুদ্র সেই রাজনীতিতে একটু একটু করে ঢুকে যায়। এরশাদ সরকারের পতন যে হবেই হবে, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত, পাশের লোকগুলোও নিশ্চিত। রাজনীতি থেকে আলোচনা গড়িয়ে বাজার দরে নামে। চাল ডাল তেল নুন থেকে শুরু করে মাছ মাংসের দামে, এবং কি হারে কি গতিতে সব সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এসব নিয়ে ক্ষোভ হতাশা ইত্যাদিও শেষ হয়। এরপর আলোচনায় মানুষের চরিত্র। অসততা এবং সততা। এ নিয়েও কিছুক্ষণ। রুদ্রর মতের সঙ্গে পাশের লোকটির মত প্রায় একশভাগ মিলছে বলে লোকটি বারবারই প্রসন্ন চোখে রুদ্রকে দেখছিল। এবার যে সব প্রশ্ন বাসে ট্রেনে করা স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, সেই প্রশ্নগুলিই রুদ্রকে করা হয়। তা আপনের বাড়ি কই ভাই?
বাড়ি খুলনায়।
থাকেন কি ময়মনসিংহে।
না। ঢাকায় থাকি।
ও। তা উনি কি হয় আপনার?
আমার স্ত্রী।
আপনার শ্বশুরবাড়ি বুঝি ময়মনসিংহে।
হ্যাঁ।
তা ভাই কি করেন আপনে? মানে চাকরি বাকরি ..
লিখি।
মানে?
আমি লিখি।
লেখেন?
হ্যাঁ লিখি।
কী লেখেন?
কবিতা লিখি।
কবিতা লেখেন? লোকটি ফ্যাক ফ্যাক করে হাসে। কৌতূহলে লোকটির চোখ একবার ছোট হচ্ছে, বিস্ময়ে হচ্ছে বড়। ছোট বড় চোখ স্থির হয়ে আছে রুদ্রর চোখে, রুদ্রর শান্ত চোখে, শ্যাওলা পড়া চোখে।
লোকটি এবার চোখে চোখ রেখেই, শব্দগুলোকে বিচ্ছিত করে,ধীরে, কিন্তু যথাসম্ভব গলার এবং মনের জোর খাটিয়ে,যেন একটি শব্দও আবার কোনও ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে না যায়, বলে তা তো বুঝলাম কবিতা লেখেন, আমার ছেলেও কবিতা লেখে, কিন্তু আপনার পেশা কি?
আমার পেশা কবিতা লেখা। রুদ্র অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়।
এরকম উত্তর লোকটি সম্ভবত প্রথম শুনেছে। এরপর আর কোনও কথা বাড়ায়নি, বাসের জানালায় চোখ রেখে বাকি পথ পার করে।
রুদ্র আমাকে আগেও বলেছে, সে কোথাও চাকরি বাকরি করতে চায় না। চায় লেখাকেই পেশা হিসেবে নিতে। কেন এ দেশে লেখকেরা লেখাকে একমাত্র পেশা হিসেবে নেয় না তা তার আজও বোধগম্য নয়।
নেয় না কারণ টাকা পাওয়া যায় না ভাল। একটা কবিতার জন্য বল তুমি কত পাও? কুড়ি টাকা পঁচিশ টাকা, বড়জোর পঞ্চাশ টাকা, এই তো! এই টাকায় কি থাকা খাওয়া চলবে?
লেখকের সম্মানী বাড়াতে হবে।
বাড়াবে কে?
পত্রিকার লোকেরা।
তারা না বাড়ালে কি করবে?
আন্দোলন করব। লেখা দেব না।
লেখা না দিলে, যারা বিনে পয়সায় বা কম পয়সায় লেখা দেবে, তাদের লেখা নেবে ওরা।
বিনে পয়সায় কেউই দেবে না লেখা।
লিখি তো আমিও, লিখে টাকা রোজগারের কথা কখনও ভাবিনি। কবিতার সঙ্গে কোনও কিছুর বিনিময়, ভাবলে লজ্জা হয় আমার। তুমি আমাকে কবিতা দাও, আমি তোমাকে ভালবাসা দেব। এ চলে। কিন্তু টাকা দাও তাহলে কবিতা লিখব, কবিতা কি বেচা কেনার জিনিস! ওরকম হলে কবিতাকে আমার পেঁয়াজ রসুনের মত মনে হতে থাকে। টাকা জিনিসটি আমার হাতের ফাঁক গলে সবসময়ই বেরিয়ে যায়, কবিতাকে টাকার হাতে সঁপে দিলে ওই হবে, বেরিয়ে যাবে।
রুদ্রকে শত বলে প্রেমিক বানাতে না পারলেও এমএ পরীক্ষাটি দেওয়াতে পেরেছি। পরীক্ষায় তাকে বসতেই দেওয়া হচ্ছিল না, শেষ পর্যন্ত ভিসিকে মহা অনুরোধ উপরোধে নরম করিয়ে পরীক্ষা দিতে সে পেরেছে। এমএ পাশ করে এ দেশে কিছু হওয়ার বা কিছু করার জো নেই জেনেও বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছো যখন বেরোও, যে কোনও কোথাও ঢুকে পড়লে যেমন বেরোতে হয়, তেমন। পেছনের জানালা বা ঘুলঘুলি দিয়ে বেরোলে ঠিক ভাল দেখায় না, বেরোলে সদর দরজা দিয়েই বেরোও। বেরিয়েছে বটে কিন্তু লেখাকে পেশা করার স্বপ্ন তার যায়নি।
