আমি তো মানুষ, দেবতা নই। তাই ভুল করেছি। এবং ভুল থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাহসও আছে। একটু সাহস তুমি আমার থাকতে দাও। তুমি তোমার পরিকল্পনাগুলো বাদ দিয়ে দাও। আমি আমার এই বিরুদ্ধ পরিবেশকে যথাসম্ভব মানিয়ে নিয়েছি। একা থাকতে আমার এখন ভাল লাগে। চারপাশের শত্রুতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখত দারুন একটা সুখ । এখানে আমি কারো সাতে পাঁচে নেই। আমার জন্য কেউ ভাবে না, আমি ও কারো জন্য ভাবি না। ব্যস সুন্দর কেটে যাচ্ছে।
প্রেম করে ঘর ছাড়ব, অতবড় প্রেমিক তুমি হতে পারোনি। লক্ষ্মী স্ত্রী হয়ে সংসারে মন দেব, অত বড় স্বামী তুমি হতে পারোনি। তোমার জন্য জীবন বাজি রেখে পৃথিবীসুদ্ধ তুলকালাম কাণ্ড বাঁধাবো, অতটুকু মানুষ তুমি হতে পারোনি।
তোমার ঘরের চেয়ে আমার এই ঘরে সুখ না থাক, শান্তি আছে। এখনো আমার সুনিদ্রা হয়। তোমার কাছ থেকে দূরে থেকে, আমার ভুলগুলোকে আমি ভুলে থাকতে পারবো। আর যেভাবেই আমি বেঁচে থাকি না কেন, ভাল থাকব। এটুকু নিশ্চয়তা তোমাকে আমি দিতে পারি। আমার কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি আমার ঘরে ফিরে এসেছি। আমি আমার মা বাবা ভাই বোনের কাছে ফিরে এসেছি—তা কিন্তু নয়। আমি আমার কাছেই ফিরে এসেছি। এবং বাকিটা জীবন আমি আমার কাছেই থাকব। পৃথিবীতে আমার চেয়ে বেশি আমাকে আর কেউ ভালবাসে না। আমি ছাড়া আমার সবচেয়ে আপন আর কেউ নেই।
তুমি আমাকে ভুলে যেও। অঘটন এ যাবৎ বহু ঘটেছে, আর ঘটাতে চেষ্টা কোরো না। দয়া করে আমাকে ভুলে যেয়ে আমাকে বাঁচাও।
আমি তো মানুষ। মানূষ বলেই বহুদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
সকাল
আমি যখন বেঁচে থাকায় মন দিয়েছি, রুদ্র ময়মনসিংহে এল। এল কিন্তু কিছুই আর আগের মত নয়। আমাদের সেই আগের মত দেখা করা, আবার আগের মত ভালবাসার হাওয়ায় হাওয়ায় দোলা, চেয়ে থাকা দুজনের চোখে কথাহীন শব্দহীন কিছুই হয় না। মাসুদের বাড়িতে বসে যে কবিতাটি লেখে সে, ঢাকা ফেরত যাবার সময় আমাকে ডাকে পাঠিয়ে যায়। কবিতাটি যখন বাড়ির ছাদে বসে সূর্যাস্তের মুছে যেতে থাকা আলোয় পড়ছিলাম, হু হু করে ওঠে বুকের ভেতর। তার প্রতিটি শব্দ আমাকে স্পর্শ করে। একা আমি কাঁদি বসে, অনেকক্ষণ কাঁদি, নিজের জন্য কাঁদি, রুদ্রর জন্য কাঁদি।
তোমাকে ফেরাবে প্রেম, মাঝরাতে চোখের শিশির,
বুকের গহীন ক্ষত, পোড়া চাঁদ তোমাকে ফেরাবে।
ভালবাসা ডাক দেবে আশ্বিনের উদাসীন মেঘ,
তোমাকে ফেরাবে স্বপ্ন, পারিজাত, মাটির কুসুম।
তোমাকে ফেরাবে প্রাণ, এই প্রাণ নিষিদ্ধ গন্ধম,
তোমাকে ফেরাবে চোখ, এই চোখ শাণিত আগুন,
তোমাকে ফেরাবে হাত, এই হাত নিপুণ নির্মাণে,
তোমাকে ফেরাবে তনু এই তনু নিকষিত হেম।
তোমাকে ফেরাবে ওই নিশিথের নিদ্রাহীন পাখি,
বুকের বাপাঁশে জমা কালো এক কষ্টের কফিন,
তোমাকে ফেরাবে ফেনা, সমুদ্রের আদিগন্ত সাধ,
সৌরভের ভেজা চোখ, নীলমাছি ফেরাবে তোমাকে।
এই বিষ-কাঁটালতা ভালবেসে আগলাবে পথ,
ঝরা শেফালির শব পড়ে রবে পথের উপর,
নিভৃত অঙ্গার এক চিরকাল তোমাকে ফেরাবে,
অনুতপ্ত অন্ধকার মৃত্যু ছুঁয়ে ফেরাবে সকাল।
নির্বাসন আমার জন্য নয়। ট্রিপোনেমা পেলিডাম যত শক্তিমানই হোক, এর শক্তি নেই রুদ্রর জন্য আমার ভালবাসাকে এতটুকু মলিন করে। জীবনে মানুষ একবারই সম্ভবত ভালবাসতে পারে, বার বার পারে না। আর কারওর জন্য তো বুকের ভেতর এত কষ্ট জমে না, আর কারওর জন্য তো চোখের জল এমন ঝরে না! রুদ্রর ভালবাসাই আমাকে ফিরিয়েছে, আর কিছু নয়। আমি তার ভালবাসার কাছেই হেরে যেতে পারি। রুদ্রকে ঘৃণা করতে চেয়েছি প্রাণপণে, পারিনি। তার কবিতার প্রতিটি শব্দ আমার সেই চাওয়াকে দূরদূরান্তে উড়িয়ে দিয়েছে। সূর্যাস্তের দিকে জল-চোখে চেয়ে নতুন একটি দিনের কথা ভাবি। সব অন্ধকার ধুয়ে দিয়ে যে দিনটি কাল আসবে, সে দিনটি নিশ্চয় অন্যরকম হবে।
১৯. নিষেধের বেড়া
নিষেধ কেন! শুদ্ধ সুন্দর থাকার জন্যই তো! এ ব্যাপারটির সঙ্গে সম্পর্কে আমার জন্মের মত চুকেছে। আর তবে কি কারণে আমার ওপর আদেশ নিষেধ! কিসের জন্য আমি বাবা মার আদেশ নিষেধ পালন করতে যাব। ওঁদের তো আর ভয়ের কিছু নেই। যে কারণে ভয় তার চেয়ে অনেক বড় কিছু ঘটে গেছে আমার জীবনে। আমার জন্য আর সতর্কে থাকার কিছু নেই। নিষেধ আরোপ করেই বা লাভ কি!নিষেধের বেড়া আমি পার হই। বেড়া ডিঙিয়ে ঘাস না খাই, বেড়া ডিঙিয়ে রুদ্রকে অবকাশে নিয়ে যাই। সবাই দেখুক কাকে আমি ভালবাসি, সবাই জানুক যখন জানতেই হবে একদিন, যখন ডাক্তারি পাশ করে তার কাছে যেতেই হবে সারাজীবনের জন্য! রুদ্রর সঙ্গে কারও পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেও রুদ্রকে নিয়ে যাওয়া নয় বাড়িতে। অবকাশে হরদম আমার ক্লাসের বন্ধুরা আসছে। কেবল বন্ধুরাই নয়, বড় ক্লাসের ভাইরা জ্ঞান দিতে আসেন, ছোট ক্লাসের ভাইরা জ্ঞান নিতে আসে। কারও জন্য বাধা নয় আর অবকাশ, বাবা হয়ত অনেককে দেখে আড়ালে দাঁতে দাঁত ঘঁত্রে, কিন্তু সামনে কখনও নয়, তিনি নিস্পৃহতা দেখান, দেখিয়েছেন কিন্তু কাউকে তাড়িয়ে দিতে পারেননি, কাউকে মুখের ওপর বলতে পারেননি চলে যাও, ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কটিই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃতিত্ব আমারও আছে, আমিই সেই মেডিকেলের প্রথম বর্ষ থেকে একটু একটু করে এ বাড়িতে চোখ সওয়া করেছি ছেলেপিলেদের উপস্থিতির, কেবল রুদ্রর জন্যই অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল, রুদ্রর জন্যই ভয় ছিল আমার, এই ভয়টি আমার হঠাৎ করেই উবে গেছে, তাই নিষেধাজ্ঞাটি ডিঙোতে আমার বুক ধুকপুক করে না। ইয়াসমিন বাড়িতে ছিল। মাও ছিলেন। কিন্তু রুদ্রর সামনে কারও যাওয়া হয়নি। তার চা খাওয়া হয়নি। চা খেতে খেতে বাড়িতে আসা আর ছেলেরা যেমন গল্প করে আমার সঙ্গে, তেমন করা হয়নি। কারণ বাবা এসেছেন। এই দুপুরবেলার সাড়ে বারোটায় চরম অসময়ে বাবার বাড়ি আসার কোনও কারণ নেই তবওু এসেছেন তিনি। আমরা দুজন তখন কেবল বাড়িতে ঢুকেছি। বাইরের দরজা তখনো হাট করে খোলা। রুদ্র কেবল সোফায় বসেছে। আমি কেবল বৈঠকঘর পার হয়ে ভেতর বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাএর কথা বলতে যাবো লিলিকে বা নার্গিসকে বা সুফিকে বা মাকে, তখন কালো ফটক খোলার শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি বাবা হেঁটে আসছেন মাঠ পেরিয়ে সিঁড়ি পেরিয়ে বারান্দাঘর পেরিয়ে বৈঠকঘরের দিকে। রুদ্রকে দেখলেন তিনি,বিস্ফারিত দু চোখ রুদ্রর দিকে ফেলে, তর্জনি কালো ফটকের দিকে তুলে, সারা বাড়ি কাঁপিয়ে তিনি বললেন, গেট আউট। বাবার চিৎকারে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন মা, শোবার ঘর থেকে ইয়াসমিন। রুদ্র কালো ফটকের বাইরে অদৃশ্য হতেই আমি সকলকে হতবাক করে দিয়ে ফটকের দিকে হেঁটে যাই। পেছনে বাবার রক্ত চোখ, পেছনে তর্জনি, পেছনে মার আর্তচিৎকার নাসরিন যাইস না, ফিইরা আয়, পেছনে ইয়াসমিনের বুবু বুবু বলে আমাকে ফেরাতে চাওয়া।
