অবকাশ
৪.১০.৮৩
রোদ,
বাসায় চলে এসেছি আজ দুপুরে। আসলে বাসা ছাড়া অন্য কোথাও আমার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। বড়জোর দুদিন কিম্বা তিনদিন। শেষ পর্যন্ত হোস্টেলেও থাকতে পারিনি। আসলে সারা জীবন যে পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, হঠাৎ করে তার পরিবর্তন সহ্য করা যায় না। শুধু বিছানায় শুয়ে, টেবিলে পড়ার বই পড়ে আমার জীবন এগোতে চায় না। প্রচুর আড্ডা আছে, আনন্দ আছে। কিন্তু জীবন এগোতে চায় না। আমার যখন ইচ্ছে যেমন ইচ্ছে পা ছড়িয়ে অথবা পা গুটিয়ে শুয়ে থাকব, একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে আমার বহুকিছু পড়ার আছে, করার আছে। আমার লিখতে হয়, আমার মাথার মথ্যে দুলক্ষ ভাবনা চিন্তুা এলোমেলো নাচানাচি করে একেবারে নিশব্দে আমাকে একা থাকতে হয়।
যাবতীয় ঝুটঝামেলা, একশ একটা কাজের কাজ ফেলে আমাকে উদাসীন হতে হয়— এ আমার চিরকেলে স্বভাব। তাই বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারি না। এখানে আমার নিজস্ব একটাজট পাকানো আগোছালো সংসার আছে। আমি একাই এর অধিশ্বর। আমার এই নানান ধরণের বইয়ে কাগজে এলোমেলো ধুলোবালির বিছানায় খানিকটা কিনার করে শোয়ার জায়গা করে নিই, গভীর সুনিদ্রায় রাত্রি পেরোয়। অথচ সাজানো গোছানো পরিপাটি অন্য বিছানায় আমার একরত্তি ঘুম আসে না। অস্বস্তিতে এপাশ ওপাশ করে কষ্টের রাত্রি পেরোয়।
বইখাতার কোনো ঠিক নেই। কিচ্ছু ঠিকঠাক খুঁজে পাই না, একটি আকাশে তো আরেকটি পাতালে। একটি এ মাথায়, আরেকটি ও মাথায়। তবু পড়াশোনা হয়। খুব অল্প সময় গভীর মনোযোগে পড়তে পারি।
এটা ঠিক নয় যে বাড়িসুদ্ধ লোক সবাই আমাকে খুব ভালবাসে, স্নেহ করে, আমার প্রয়োজন আমার সুবিধে অসুবিধে একটু বিচার করেদেখে। তা কেউ করে না। সম্ভবত এ বাড়িতে আমি একটি অহেতুক অপ্রেয়োজনীয় মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকছি। এটা ঠিক যে আমি এখন মরে গেলেও এ বাড়ির কেউ একফোঁটা কাঁদবে না, এতে কারো কিছু যায় আসে না। আমি খুব বেশিরকম অপরাধি মানুষ বলে এ বাড়ির সকলে ভাবে। ইদানিং এসব আর গায়ে মাখি না। আদরিণী কন্যার মত এখন আর কারো কাছে কোনোকিছুর আবদার করি না। কোনো কিছু নিয়ে অনুযোগ করি না। আমার একা থাকার এবং ভাবনার রাজ্যে অবাধ বিচরণের সময়সীমা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আমি এদের কাছে কৃতজ্ঞ। আসলে হোস্টেলের শাদামাটা গোছানো জীবনে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। যেন খাঁচা থেকে উড়াল দিয়ে বনের পাখি বনে পালাতে চাই।
তোমার ঘরেও অবিকল একই অবস্থা। আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। পারি না। আমার ভাল লাগে না। বড়জোর দুদিন, এরপর সবকিছু অসহ্য লাগে আমার। এমনকি তোমাকেও, তোমার চালচলন, কথাবার্তা সব।
যে চরম পর্যায়ে আমাকে নিয়ে তুমি নিজেকে দমন করতে পারো, আমি পারি না। তাই অজান্তে ওই চরম ভুলটি হয়ে গেল। এতে এখন অবশ্য আমার একটি লাভ হয়েছে, তা হলো, এসবে চরম বিতৃষ্ণা এসেছে। আমি এখন খুব সহজেই স্বাভাবিক তৃষ্ণাগুলোকে অনায়াসে দমন করতে পারি। এ আমার জন্য খুব লাভ হল। কিন্তু লাভ ছাড়া যে ক্ষতিটা হয়ে গেল এবং অল্প কদিনের মধ্যে যা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাবো সে ক্ষতি থেকে আমাকে তুমি যে করেই হোক দয়া করে বাঁচিয়ো। অন্তত একটু নির্ভরতা থাকলে শান্তি পাবো।
ব্যস, আর কিছু চাই না। যে অসুখ টি যাচ্ছে না এবং যাবে না তা নিয়ে অযথা ঢাকা ময়মনসিংহ করে লাভ নেই। কারণ ও রোগ যাবে না। ও রোগ নাছোড়বান্দার মত আমার গায়ে সেঁটেছে। আমাকে বিনাশ করে তবেই ওর সুখ ।
সেই যে বলেছিলাম হুট করে আবেগে আবেগে কিছু একটা করে আমাকে সারাজীবন পস্তাতে হয়। ঠিক তাই। যদি উদাহরণ চাও বলব, তোমাকে চিঠি লিখেছি, তোমার সঙ্গে প্রেম করেছি, তোমাকে বিয়ে করেছি, তোমাদের বাড়িতে গিয়েছি, নিজেকে সমপর্ণ করেছি.. মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি নিজেকেই কার কাছে সমপর্ণ করেছি?: এর কি উত্তর আমি দেব? চারপাশ থেকে হা হা হাস্যধ্বনি ওঠে।
এর কোনো সদুত্তর আমি জানি না। লোকে বলে, অতি সোজা মানুষ যদি একবার বেঁকে বসে তখন আর রক্ষে থাকে না। একবার বেঁকে বসতে ইচ্ছে করে। একবার তছনছ করে, চুরমার করে ভাঙতে ইচ্ছে করে তোমার সাজানো স্বপ্ন। একবার জ্বালাতে ইচ্ছে করে তোমার সংসার। আমাকে যেমন ভেঙেছো, আমাকে যতটা কাঁদিয়েছো, ততটা তোমাকে কাঁদাতে ইচ্ছে করে। কষ্টের আগুনে পোড়াতে ইচ্ছে করে। কেন ইচ্ছে করবে না বলো? আমি তো মানুষ, দেবতা নই। দেবতা নেই বলে আমি তোমার ঘরে যাবো না। সুন্দর সাজানো গোছানো ব্যাপার স্যাপার, বাড়ি যাওয়া, বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিকতা, দীর্ঘদিন থেকে খেয়ে বিশ্রাম নেওয়া, ঢাকায় প্রেসের কাজ, হাঁড়িকুড়ি কেনা, রান্নাবান্না, ঘরে খাওয়া, নিয়মমাফিক ঘরে ফেরা, রাত হলে বউকে নিয়ে শুয়ে থাকা—ইত্যাদি কোনোকিছুই আমি হতে দেব না। এতো সহজেই তোমার মত মানুষের হাতে সুখের পাখি ধরা দিক, তা আমি চাই না। তোমার জন্য কেন আমি বাড়ির সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাইকে ফাঁকি দিয়ে, আমার এই এতদিনকার প্রিয় আগোছালো জীবন থেকে চলে যাবো প্রেমে মত্ত উন্মাদিনীর মত? তুমি আমাকে কি দিয়েছো এবং কি দেবে? যার বিনিময়ে এমন করে তোমার সঙ্গে চলে যাওয়ার সাহস আমি করতে পারি! তুমি কি কারণ দেখাবে? ওই একটি সই করা বিয়ের কাগজ! ঠিক ওরকম একটি সই করা তালাকনামাও পাওয়া যায়! এ কথা নিশ্চয়ই জানো। যদি বলো এদ্দিনকার মেলামেশা! আমি বলব ভুল। শুরু থেকে সবটাই আমার ভুল। হুট করে আবেগে আবেগে কিছু একটা করে ফেলা।
