তুমি তো বোঝোনা, নারী হয়ে দেখোনি, স্ত্রী হয়ে দেখোনি, এই ব্যাপারগুলো ধ্বংস করে দেয়, জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয় মন। তোমার ভালবাসা পাইনি। তোমার ভালথাকা পাইনি আমার জন্য। তবে কিসের বিশ্বাস থাকে? তুমি অবিশ্বাসের আর প্রতারণার ওপর কি ঘর বানাতে চাও?
তাইতো তোমাকে বলেছি, তুমি বন্ধু হিসেবে চমৎকার। কিন্তু স্বামী হিসেবে তোমাকে কোনো মেয়েই সহ্য করতে পারবে না। পারে না। আনো সারা দুনিয়া খুঁজে আনো এমন একটি মেয়ে যে কি না তোমাকে বলবে—তুমি শিল্পের মানুষ বলে তোমাকে অন্যভাবে দেখা যায়।
এতই যদি অন্যের উদারতা পেতে চাও তবে নিজে তুমি উদারতা দেখালে না কেন? কেন যুদ্ধে ধর্ষিতা কোনো বীরাঙ্গনা নারীকে বিয়ে করলে না? কেন অভাব ও দুর্দশা থেকে একজন বেশ্যাকে বিয়ে করে বাঁচালে না? কেন স্বামী পরিত্যক্তা গৃহহারা কোনো অভাগীকে বিয়ে করে সমাজ ও দেশের উপকার করলে না? দেখাও, কালো কুচ্ছিত একটি আইবুড়ি বিয়ে না হওয়া মেয়েকে বিয়ে করে, রাস্তার একটি অনাথ ভিখিরি মেয়েকে বিয়ে করে দেখাও। অথবা নিজের স্ত্রীকে একশ একটা পরপুরুষের কাছে সঁপে দাও, এরকম উদারতা এখন দেখাও! আমার এতে কিছু যায় আসে না। তোমার কোনো কিছুতে এখন আমার কিছু যায় আসে না। তবে অন্যের উদারতা আশা করার আগে নিজের ওই উদারতাটুকু আমাকে দয়া করে দেখিও।
সকাল
আমি ফিরব না রুদ্র, মনে মনে বলি। আমি আর ফিরব না, আমি নৈঃশব্দের সঙ্গে বেঁধেছি ঘর। তুমি আমাকে আর ওই নষ্ট অতীত স্মরণ করিও না। আমাকে একা থাকতে দাও। রুদ্র আমাকে একা থাকতে দেয় না তবু। তবু তার কবিতা এসে আমাকে বিষণ্ন করতে থাকে।
নীরবতা কোনও এক উদাসীন পাথরের নাম—
অহল্যা সে কোনওদিন জানি আর হবে না জীবন।
হবে না সে পারিজাত, কোনোদিন হবে না সকাল,
দিন আর নিশিথের সন্ধিক্ষণে থেকে যাবে জানি—
অহল্যা সে চিরকাল থেকে যাবে, রক্ত মাংস নিয়ে।
যাবে না সে দগ্ধ ক্ষুব্ধ মানুষের মিছিলে কখনও,
পোড়া মানুষের ক্ষত, রক্ত, গ্লানি বুকে সে নেবে না,
যাবে না সে জানি আর কোনওদিন সবুজ নিভৃতে।
ছোঁবে না সে চিবুকের থরো থরো বিষণ্ন উত্তাপ,
সেই হাত কখনও ছোঁবে না আর উদাসীন চুল।
নিঃশ্বাসের ঘ্রাণে আর জাগবে না ভেজা চোখ দুটি,
নক্ষত্রের স্মৃতি শুধু বেঁচে রবে স্নায়ুর তিমিরে।
হবে না বেহুলা জানি সে কখনও গাঙুরের জলে
ভাসবে না ভেলা তার, ভাসবে না স্বপ্নের সাহস,
বেহুলার স্বপ্ন-ভেলা কোনওদিন জলে ভাসবে না—
নীরবতা কার নাম? কার নামে নির্বাসন জ্বলে?
রুদ্র মোংলা থেকে ফিরে এলে হোস্টেল থেকে ঢাকা চলে যাই। বাড়ির কাউকে বলার প্রয়োজন নেই যে আমি ঢাকা যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি সে কথাও কেউ জিজ্ঞেস করার নেই। যাচ্ছি, আমার ইচ্ছে। এই উত্তরটিও আমার প্রয়োজন নেই উচ্চারণ করার। মাসের পর মাস ধরে পুষে রাখা অসুখ টি এখন কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে দেখতে হবে। কোনও ডাক্তার চাই, অচেনা ডাক্তার। শাহবাগের মোড়ের একটি ডাক্তারের চেম্বারে রুদ্র আমাকে নিয়ে যায়। ডাক্তারকে সে বলে, এ অসুস্থ। কোথাও ঘা হয়েছে, যাচ্ছে না।
ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় ঘা?
রুদ্র আমার দিকে ফিরে বলে, কোথায় ঘা বল।
তুমি বল।
রুদ্র ডাক্তারের দিকে ফিরে বলে, ওর প্রাইভেট পার্টসে।
কবে হয়েছে? কি রকম ঘা? ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন।
রুদ্র তারিখ গোনার চেষ্টা করে। আঙুলের কড়ায় মাস গোনে। আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে কোনওরকম রাখঢাক না করেই বলি, এ আমার স্বামী, এর সিফিলিস হয়েছিল, আমাকে সংক্রামিত করেছে। পেনিসিলিন নিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো ভাল হচ্ছি না।
ও এই কথা।
ডাক্তার অনেকক্ষণ আমাদের দুজনকে দেখলেন বোকার মত। তিনি আগে আমাদের দেখেছেন এ এলাকায়, তার চোখ দেখেই বুঝি। ডাক্তার রক্ত পরীক্ষার কথা লিখে দেন। রক্ত দিয়ে, তাজমহল রোড মুহম্মদপুর। ওখানে বসে থাকো। ওখানে কবিতা পড়ো। ওখানে রুদ্রর সংসার -স্বপ্ন দেখো। রুদ্র থাল বাসন কিনবে। এ বাড়িতে সংসার গড়ে তুলবে সে। ছোট সংসার,সুখী সংসার। রুদ্র আপাদমস্তক শুদ্ধ হয়ে উঠবে। আমাকে আর কোনওদিন দুঃখ পেতে হবে না। কোনওদিন কষ্ট পেতে হবে না আর। একবার যেন আমি তাকে ক্ষমা করি। ক্ষমা জিনিসটি নিয়ে তাকে আগেই আমি বলেছি। রুদ্রর মেয়েমানুষের নেশা আছে, মেয়েমানুষ পেলে তার মাংস নিয়ে খেলতে তার আনন্দ হয়। এ তার হঠাৎ করে হয়ে যাওয়া কোনও ভুল নয়। নিজের জীবনের সব কথা যদি সে আগে খুলে বলত, আমি আমার জীবনটি তার সঙ্গে জড়াতাম না। কিন্তু সে বলেনি। ভুল সেখানে। ভুল তার নেশায় নয়। এ সম্পণূর্ ই তার ব্যক্তিগত নেশা। এ রকম নেশা মানুষের থাকে। তার নেশাকে আমি দোষ দিচ্ছি না। দিচ্ছি তার প্রতারণাকে। এই প্রতারণার একটিই উত্তর, সেটি তাকে ত্যাগ করা। ভেরি সিম্পল।
ভিডিআরএল পজিটিভ।
আবারও ইনজেকশন নিতে হল। একদিন নয়। তিনদিন।
তিনদিন পর ময়মনসিংহে ফিরি। হোস্টেলে। কাউকে জবাব দিতে হয় না কোথায় ছিলাম, কার কাছে। একধরনের মুক্ত জীবন। অথচ এই জীবনটিকে রুদ্রর বিষাক্ত হাওয়ায় আমি উড়তে দিই না। একটি মুক্ত জীবনের সাধ ছিল কত, পেলে যেন ঢাকার সাহিত্য অঙ্গন সাংস্কৃতিক চত্ত্বর চষে বেড়াবো। কই! আমার তো একটওু ইচ্ছে করে না। আমি ফিরে আসি, রুদ্র পেছনে নিজের ওই ঘরে বসে লেখে,
বুকের ভেতরে জ্বলে, জ্বলে ওঠে নির্বাসন -শিখা।
পরান পোড়ায়ে আজ নির্বাসনে চলেছে সকাল
শরীর পোড়ায়ে আজ নির্বাসনে চলেছে সকাল
পৃথিবী আঁধার করে নির্বাসনে চলেছে সকাল..
কুসুমের মর্মমূল ছিঁড়ে গেছে গোপন-ঘাতক।
দখল নিয়েছে ঘণু আজ নীল নক্ষত্রের দেশে,
নিয়েছে রঙিন ঘুড়ি ছিঁড়ে ওই দিগন্তের গ্রাম,
ফিরে আসে ব্যথর্ সুতো, ফিরে আসে স্বপ্নভাঙা হিয়া।
বিষের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়েছে ঘাতক সময়—
নগ্ন এই দুই চোখে সর্বনাশা অপচয় জ্বলে,
সময় দিয়েছে তুলে এই হাতে অফুরন্ত ক্লেদ,
দিয়েছে রক্তে মাংসে জীবনের তপ্ত অন্ধকার।
ঘোর কৃষ্ণপক্ষ রাত, দুঃসাহসে ছুঁয়েছিল তবু
আধাঁরে পুড়েছে আজ স্বপ্ন তার নিভৃত নগর,
আধাঁরে পুড়েছে তার বিশ্বাসের সবুজ নিখিল।
স্বপ্নহীন পোড়া ভিটে, পোড়া ঘর—কে ফেরাবে তারে?
কেবল কবিতা নয়। রুদ্রর পর পর অনেকগুলো চিঠির উত্তর লিখতে বসি। ঘা সেরে যাওয়া রুদ্র এখন মরিয়া হয়ে সংসারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ঘা সেরে যেতেই সে ভুলে গেছে আমাদের দুজনের মাঝখানে এখন একটি রোগ না থাক রোগের স্মৃতি আছে। মাঝখানে একটি দগদগে অবিশ্বাস আছে। আমার ভোলা হয় না।
