হোস্টেল
১৫.৯.৮৩
রোদ
সেই সকাল থেকে হোস্টেলে বসে আড্ডা দিচ্ছি। খেয়ে দেয়ে এখন সবাই খানিকটা ঘুমোচ্ছে। ঘুম আসছে না বলে আমি লিখছি। তোমার সবকিছু জানিয়ে তুমি নাকি খুব বড় করে আমাকে চিঠি লিখবে, কেন? সব কিছুর শেষে, আমার জীবনের চরম সর্বনাশ করে এখন তুমি তোমাকে জানাবে কেন? আগে জানাতে পারোনি? আগে কেন ভাষার খোলসে ঢেকে রেখেছিলে তোমার আসল আদল? তখন তো নষ্ট হওয়ার মানে বুঝি না, তখন তো অন্ধকারের মানে বুঝি না, উড়নচণ্ডি, এলোমেলো এসবের মানে বুঝি না। তখন কেন স্পষ্ট করে কাঠখোট্টা ভাষায় তুমি আমাকে জানালে না? এসব রকমারি শব্দের আড়ালে কেন তুমি আমার সঙ্গে এতকাল অভিনয় করে গেলে?
আমার আর কি জানার বাকি আছে! কি আর জানা দরকার আমার? আর কি জানাতে চাও? এতকাল বাদে এসব জেনে কি দরকার আমার বলো? তোমার নষ্ট জীবনের কথা আর কতভাবে তুমি আমাকে জানাতে চাও?বিশ্বাস করো আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। যতক্ষণ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলি, স্ফূর্তিতে থাকি, ভাল থাকি। বাসায় একা থাকি, কষ্ট বাড়ে। এই হোস্টেলে যদি একটা রুম থাকত আমার, কোনোদিন বাসায় যেতাম না।
তুমি ক্ষমাহীন অন্ধকার কি না আসলে—সন্দেহ প্রকাশ করেছো? আশ্চর্য! তোমার লজ্জা হয় না? তোমার এতটুকু লজ্জা হয় না? তুমি কি মানুষ না জন্তু? তোমার মরতে ইচ্ছে করে না কেন? তুমি ক্ষমাহীন অন্ধকার নও, তবে তুমি কি? তুমি আর কি হতে চাও? পৃথিবীতে এমন কোন দয়ার সাগর আছে তাকে বলো, বলো তোমার কীর্তির কথা, কে তোমাকে ক্ষমা করবে? একটি মানুষ আনো, সারা দেশ ঘুরে তুমি এমন একটি মানুষ এনে আমাকে দেখাও যে বলবে তুমি ক্ষমার যোগ্য, যে বলবে তুমি নষ্ট অন্ধকার নও। পারবে?
তুমি শিল্পের মানুষ জানি। তুমি ভাল কবিতা লেখো, তাতো জানিই। তাতে কি? তোমাকে অন্যভাবে দেখবো মানে? কিভাবে দেখতে বলছো? হ্যাঁ, তুমি যদি আমার কেউ না হতে, তুমি যদি কেবল একটি শিল্পের মানুষই থাকতে, তবে হয়ত অন্যভাবে দেখতাম। তুমি একশ একটা মেয়েমানুষ নিয়ে লীলা করতে, বেশ্যাবাড়ি যেতে, তোমার সিফিলিস হতো, তুমি মদ খেতে, গাঁজা খেতে—তাতে আমার কোনোকিছু আসতো যেতো না। তোমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা থাকতো না। তুমি শিল্পের মানুষ। তুমি যা সৃষ্টি করছ, তুমি যা লিখছ, আমি কেবল তা নিয়েই ভাবতাম। কিন্তু তুমি আমার স্বামী। তুমি শিল্পের হও, অশিল্পের হও, তুমি আমার স্বামী। তুমি অন্য কোনো মেয়েমানুষ নিয়ে ভাবলে, কবিতা লিখলে, বুকে বড় লাগে। তুমি গাঁজা খাও, মদ খাও, দুঃখে কাঁদি। আর কত? বিয়ের আগে হাজারটা মেয়ের সাথে প্রেম করেছো, তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু মেয়ে নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মত রাত কাটিয়েছো, উপভোগ করেছো অন্য কোনো নারীর শরীর, বিশ্বাস করো এসব সহ্য করা যায় না। প্রেমে মত্ত হয়ে কোনো মেয়েকে বিয়ে করার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছিলে একথা শুনলে বুকের ভেতরটা ভেঙে যায়। আমাকে বিয়ে করেছো অথচ তুমি নিয়মিত মদ খাও, বেশ্যাবাড়িতে যাও, এসব তো কোনোকালে কল্পনাও করিনি। এসব কোনো মেয়ে সহ্য করতে পারে না, কোনো মেয়েই পারে না, বিশ্বাস করো। তুমি এক্সাইটেড হবে ভাল কথা, অস্বাভাবিক তো কিছু নয়, তুমি মাস্টারবেট করো। তুমি বেশ্যার কাছে যাবে কেন? তুমি আমাকে এত বড় অপমান করবে কেন?
আমাকে ধোঁকা দিয়ে এতটা পথ এনে তুমি তোমার স্বরূপ দেখালে? এ আমার নারীত্বের অপমান। কোনো মেয়েই এসব সহ্য করতে পারে না। কোনো স্ত্রী এসব সহ্য করতে পারেনা। তুমি আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েও বহুবার মিথ্যে বলার চেষ্টা করেছো। মিথ্যে বলাটাকে আমি দারুণ ঘণৃা করি। অথচ তুিম কি অনায়াসে বলে যেতে পারো, নিজেকে কি সুন্দর লুকোতে পারো! অন্য কোনো মেয়ে এ সময়ে কি করত আমি জানি না। সহ্য করার প্রশ্নই তো ওঠে না এখানে। তবে এটা নিশ্চিত, তোমার মত স্বামী নামক প্রতারকের কাছে কেউ এক মুহূতর্ থাকত না। হয় তোমাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলত, নয় নিজে মরত। নয়ত বেরিয়ে গিয়ে অন্য কোনোভাবে কেঁচে থাকত। কিন্তু আমি কেন এখনো নিজেকে মুক্ত করছি না—ভাবলে আমার অবাক লাগে। আমার কিসের অভাব? তোমাকে ছাড়া আমার জীবন যাপনের এতটুকু হেরফের হবে না। তবে? আসলে বোধহয় আমি খুব ভীরু, পাছে লোকে কিছু বলে এসব ভাবি। অথচ এদুটোকে অস্বীকার করেই তোমাকে ভালবেসেছিলাম। আমি তো তোমার রূপ দেখিনি, কেবল শিল্প দেখেছি, আমি তো তোমার ধন দেখিনি, তোমার শিল্প দেখেছি। তোমাকে সম্পণূর্ আমার করে নিয়েছি।
এখন দুজনের আবেগঘন মুহূর্তে স্মৃতিচারণ এলেই তোমার অতীত খুঁড়ে বের করে আনো পচা গলা নষ্ট জীবন, আমি সহ্য করতে পারি না। তুমি আমাকে কি চমৎকার অসুখ দিলে, এ আমার ভেতর শক্ত খুঁটি গেড়ে বাসা বেঁধেছে। আর কি দেবে তুমি আমাকে? আমার জীবন কি শেষ হয়নি, আমার ভবিষ্যত? আমার তো স্বপ্ন শেষ, সাধ শেষ।
তুমি লিখেছো, সব লিখবে, সব।
কি লিখবে? কি জানাবে? তোমার জীবন জেনে আর আমার কি লাভ? তোমার জীবনে তো আমার জন্য একনিষ্ঠতা নেই, ভাল থাকা নেই, ভালবাসা নেই। আমার স্বপ্নের সেই সুন্দর মানুষ তো তুমি আর হতে পারো না!
তোমার জীবন জানলে কি হবে আমার? কি ফিরে পাবো আমি? তুমি তো আমাকে কোনওদিন ভালবাসোনি। নাছোড়বান্দার মত একগুঁয়ে হয়ে তোমাকে ভালবেসেছি কেবল আমিই। তুমি আমাকে ভালবেসে মানুষ হতে পারোনি। কবিতা লিখেই কি তুমি আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চাও, শুধু তোমার কবিতা দিয়েই কি আমার নারীত্ব সার্থক করতে চাও? কোনো মেয়ে কি এভাবে চায়?
