একটা মানুষের মধ্যে তো অভিমান থাকে, রাগ থাকে, প্রতিশোধের ইচ্ছা থাকে। একটা মানুষের মধ্যে তো ঘণৃা থাকে,বিদ্বেষ থাকে, অবিশ্বাস থাকে। কেবল কি নোনা জলের সমুদ্রই থাকে!
দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। যেখানে কেউ নেই, কিচ্ছু নেই, দুঃখ নেই, সুখ নেই। যেখানে সব কিছু ভুলে থাকা যায়। কষ্টগুলো এভাবে পোড়ায় না। কতটুকু আগুন তুমি আমাকে দিয়েছো, তুমি জানো না। আমি জানি কি হতে যাচ্ছে আমার শরীরে। তুমি এসব বুঝবে না। এসব খুব খারাপ জিনিস। ভাল মানুষদের এসব হয় না, বাজারে সস্তায় বিক্রি হয়ে যাওয়া খারাপ মেয়েমানুষদের হয়।
সকাল
অবকাশ
২০.৮.৮৩
রোদ,
বড় সাধ ছিল তোমাকে রোদ ডাকার। আসলে এ নামে তোমাকে মানায় না। তুমি তো অন্ধকারের মানুষ। তুমি কালো অভিশাপ ডেকে আনো আলোকিত জীবনে। সুন্দর স্বপ্নগুলোয় দুঃস্বপ্নের কালিমা লেপে দাও। তুমি তো জাহান্নামের আগুনের মত, পুড়ে ছাই করে দাও। তুমি তো ভালবাসতে জানো না, তুমি জানো প্রতারণা করতে। তোমাকে বিশ্বাস করা পাপ, তোমাকে ভালবাসা পাপ। এই পাপ আমার শরীরে ঢুকেছে। আমি কেমন জ্বলে মরছি, জ্বালায় যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত আমি ধং্ব স হয়ে যাচ্ছি, তা তো তুমি জানো। আর কতটুকু ধ্বংস দরকার মরতে হলে? আর কতটুকু? বড় সাধনার ধন তুমি। জীবনভর সাধনা করে আমি একটা নষ্ট মানুষ পেয়েছি। আমার ভাগ্য দেখে তোমার হাসি পায় না রোদ, মনে মনে নিশ্চয়ই তুমি অট্টহাসি হাসো।
জানো রোদ, তোমাকে কাছে পেলে আমি, কি অবাক কাণ্ড, সব ভুলে যেতে চাই। আমার আর কোনও আশ্রয় নেই, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, আর কোনও পথ নেই ঘুরে দাঁড়াবার—তাই হয়ত ভুলতে চাই—ভাবতে চাই সাজানো স্বপ্নের কথা, অস্বীকার করতে চাই তোমার নষ্ট অতীত। আসলে এভাবে হয় না, নিজের সাথে বেশি অভিনয় হয়ে যায়। বুকের মধ্যে চেপে রাখা কষ্টগুলো আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তুমি তো ভালবাসতে জানো না, তাই বোঝোনা এ কষ্ট কেমন, কতটা পোড়ায়।
আজ সারা বিকেল প্রাণভরে কেঁদেছি। এখনও কণ্ঠের কাছে কষ্টের মেঘ জমে আছে। পারি না, আমি আর এভাবে পারি না। এখন কেবল দুঃস্বপ্ন দেখি। পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন। এখন আর সৃষ্টির স্বপ্ন নয়, এখন ধ্বংসের, ভাঙনের দুঃস্বপ্ন দেখি। কষ্ট ভুলতে লোকে মদ পান করে, আমি প্রচুর মদ চাই। ঘুমোবার জন্য ট্রাংকুলাইজার চাই, সিডেটিভ চাই। এরপর মরবার জন্য একটু বেশি ডোজ হলেই চলবে।
জীবনের প্রতি এক ফোঁটা মোহ নেই, ভালবাসা নেই। আমি তো পাথর হতে চাই, পারি না। চোখের ভেতর পুরো একটা নোনা জলের সমুদ্র।
সে রাতে তুমি যখন অল্প অল্প করে আবেগের তুমুল জোয়ার আনলে, আমার শরীরে কোনও অনুভূতি ছিল না। এইসব ব্যাপারগুলোয় নরমাল সেস্কুয়াল অরগানে যে নরলাম স্টিমুলেশন হয়, তা আমার হচ্ছিল না। আমার মাথার ভেতর কেবল যন্ত্রণা হচ্ছিল। তীব্র যন্ত্রণা। তীব্র যন্ত্রণা।
তুমি কেন ঘুমোওনি? আমার যন্ত্রণায়? ঘুম হয়নি বলে সারা সকাল ঘুমোতে চেষ্টা করলে!
তোমার অনুশোচনা হয় না রোদ? এতটুকু অনুশোচনা হয় না? তোমার মরে যেতে ইচ্ছে হয় না? বিষ খেয়ে মরতে পারো না? তুমি মরে গিয়ে আমাকে একটু বাঁচাও। তুমি মরে গিয়ে আমাকে একটু শান্তি দাও।
সকাল
ইনজেকশনেও কাজ হয়নি, ট্যাবলেটেও নয়। আর কোনও রকম ওষুধের কথা তো বইয়ে লেখা নেই। কাজ না হলে ডাক্তারের কাছে যে যাবো, সে উপায়ও নেই। অতএব ছেড়ে দাও, অসুখ অসুখের মত বেড়ে যাক। বাড়িতে এমন কঠিন লেখাপড়া সম্ভব নয় বলে আমি কাপড় চোপড় বই পত্র নিয়ে হোস্টেলে চলে যাই। বাড়ির সকলের বাধাকে তুচ্ছ করার দুঃসাহস আমি দেখাচ্ছি। আমার ইচ্ছে যাব। ওখানে থেকে যে দল বেঁধে পড়া হয় আমার, তা নয়। সাফিনাজের ঘরে, যে ঘরে ওর আরও তিনজন রুমমেট আছে, সে ঘরেই ঢুকি। চারজনের জায়গায় পাঁচজন। এতে কারও আপত্তি নেই। ওরা জানে আমি প্রাণোচ্ছঅল এক মানুষ। ওরা জানে যে আমি হাসতে জানি, আনন্দ করতে জানি। চমৎকার চমৎকার কথা বলতে জানি। আমার উদাসিনতা যেমন সুন্দর, আমার উচ্ছ্বলতাও। ওরা সব জানে, কেউ জানে না একটি রোগ খুব গোপনে গোপনে আমি পুষছি। এই মেডিকেল কলেজ, এই হাসপাতাল, এই রোগ এই ওষধু এই চিকিৎসার রাজত্যের মধ্যিখানে বাস করেও আমার একটি রোগ পুষতে হচ্ছে। ঘাগুলো ধীরে ধীরে নির্যাস কমাতে থাকে, ধীরে ধীরে বীভৎস চেহারাটির পরিবর্তন করতে থাকে, আবার হঠাৎ ফুলে ফেঁপে ফুঁসে ওঠে। আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলা খেলছে রোগটি। আমার সঙ্গে লুকোচুরি রুদ্রও খেলছে। ঢাকা ফিরে আসবে বলছে, অথচ আসছে না। এক সপ্তাহ পর ফিরবে বলেছে। দুমাস পার হয়ে যায় ফেরার নাম নেই। রুদ্রর চিঠি এখন আর ডালিয়ার ঠিকানায় আসার দরকার হয় না। হাসপাতালের পোস্ট অফিসের ঠিকানায় আসে চিঠি। পোস্ট মাস্টার আমার চিঠি রেখে দেয় যত্ন করে এক পাশে, তুলে নিই দুপুরের দিকে। চিঠির খামে আবারও কবিতা।
জানি না কখন হাতে বিষপাত্র দিয়েছি তোমার,
পিপাসার জল ভেবে তুমি তাকে গ্রহণ করেছ।
জীবনের খামে মোড়া মৃত্যু এনে কখন দিয়েছি
জানি না কখন হাতে দ্রাক্ষা ভেবে দিয়েছি গন্ধম।
রাত নামে, মৃত্যুময় রাত নামে শরীরের ঘরে,
এই রাত জ্যোৎস্নাহীন, জোনাকিও নেই এই রাতে।
কেবল আঁধার, এক ভাঙনের বিশাল আধাঁর,
কেবল মুত্যুর ছায়া স্বপ্নমগ্ন দুটি চোখ জুড়ে।
জানি না গোলাপ ভেবে বিষফুল করবীর স্মৃতি
কখন দিয়েছি তুলে হেমলক-জীবনের ভার,
কখন নিয়েছি টেনে ঘুণেজীণর্ উষর অতীতে—
আজ শুধু শোচনার ম্লান শিখা সেঁজুতি সাজায়।
আধাঁর মরে না এই রুগ্ন ভাঙা আধাঁরের দেশে,
রোদের আকাঙক্ষা বুকে প্রান্তরের পথে নামে তবু
জীবনের গাঢ় তৃষ্ণা অমলিন ঊর্ণনাভ হিয়া—
রাতের আকাশ তবু নিয়ে আসে রোদের সকাল।
হোস্টেলের জীবন অন্য রকম। পড়ার সময় পড়া, গল্পের সময় গল্প, ঘুমের সময় ঘুম। সাফিনাজের নিয়মপালনে কোনও রকম ত্রুটি থাকার জো নেই। আমি এসেই অনেকটা এলোমেলো করে দিই। আমার রুটিন না মানা জীবন, আর হাতের কাছে এত মেয়ে, এত মেয়েদের গার্হস্থ্য জীবন, ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত আমার কাছে এত নতুন যে আমি বই থেকে বার বার উঠে যাই, ঘুমের সময় গল্প, পড়ার সময় অট্টহাস্য আর আড্ড ার সময়ও আড্ডা দিতে থাকি। যাদের এপ্রোন পরা দেখেছি এতবছর কলেজ বা হাসপাতালে, এপ্রোন খুলে ফেললে যে তাদের আর সাধারণ মেয়েদের মতই দেখতে লাগে, তখন আর সাধারণ মেয়েদের মতই তারা হাসে কাঁদে অভিমান করে, তারা খায় দায় ঘুমোয়, গান গায় নাচে আউটবই জাতীয় জিনিস পড়ে, তারাও প্রেম করে তারাও স্বপ্ন দেখে—পড়াশোনার চেয়ে বেশি উৎসাহ আমার এসবে। আমি রুদ্রহীন জীবন চাই এখন। যে জীবন আমাকে ভুলে থাকতে দেবে আমার অতীত। আমি নিজেকে একা হতে দিতে চাই না। একা হলেই একটি রোগ আমার শরীর থেকে মাথায় ভ্রমণ করে। আমি আত্মহত্যার স্বপ্ন দেখতে থাকি। তবু হোস্টেলেও মাঝে মাঝে একা হতে হয়। একা হলে আবার সেই রোগটি আমার স্নায়ুর ওপর শুঁয়োপোকার মত হাঁটে। আবার রুদ্র নামের একটি দুঃস্বপ্ন। আবার চোখের জল, সে জল চিঠির অক্ষরে পড়ে অক্ষর মুছে দিতে থাকে।
