কেবল চিঠি নয়, চিঠির সঙ্গে কবিতাও পাঠায় রুদ্র। কবিতায় সেই রাতের কথা, সেই আমাদের প্রথম মিলন-রাত্রির কথা, আমার রাত জাগা রাতটির কথা।
ধ্বংসস্তূপের উপর বসে আছে একটি শালিক
পাশে এক মৃত্যুমাখা বেদনার বাজপোড়া তরু,
শূন্যতার খা খা চোখ চারপাশে ধূসর আকাশ।
দুঃখিতা আমার, তুমি জেগে আছো স্বপ্নহীন আঁখি।
তোমার চোখের তীর ভেঙে পড়ে পাড়ভাঙা নদী,
তোমার বুকের পাশে জেগে থাকে নিভৃত পাথর।
কিসের পার্বন যেন চারদিকে কোলাহল রটে—
দুঃখিতা আমার, তুমি জেগে আছো পরাজিত পাখি।
সুচাগ্র সুযোগে সাপ ঢুকে গেছে লোহার বাসরে,
বিষের ছোবলে নীল দেহে নামে শীতল আধাঁর,
গাঙুরের জলে ভাসে কালো এক বেদনার ভেলা।
দুঃখিতা আমার, তুমি জেগে আছো বালিয়াড়ি-নদী।
নিখিল ঘুমিয়ে গেছে দিনশেষে রাতের চাদরে,
কামিনীর মিহি চোখে ঘুম এসে রেখেছে চিবুক,
জোনাকিরা নিভে গেছে সংসারের স্বপ্ন শুনে শুনে—
জেগে আছো, শুধু তুমি জেগে আছো আমার দুঃখিতা।
রুদ্র কি সত্যিই অনুভব করেছে আমার কষ্টগুলো! যদি তার হৃদয় বলে কিছু থাকে, তবে কেন সে অন্য মেয়েদের ছুঁয়েছে! হৃদয় বলে কিছু আমার ছিল বলে আমি কখনও কল্পনাও করতে পারিনি রুদ্র ছাড়া অন্য কোনও পুরুষকে। প্রতিদিন কলেজের সুদর্শন বুদ্ধিমান হিরের টুকরো ছেলেদের দেখেছি, কারও দিকে আমি তো ফিরে তাকাইনি। কেবল হাবিবুল্লাহ নয়। আরও অনেক হিরের টুকরো তো আমাকে প্রেমের প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সব তো দ্বিধাহীন ছুঁড়ে দিয়েছি। রুদ্র কেন পারেনি! শরীর তো আমারও ছিল, এই শরীর তো কখনও কাউকে কামনা করেনি! এই শরীর প্রতিদিন একটু একটু করে প্রস্তুত হয়েছে রুদ্রর জন্য। এই প্রস্তুত শরীরটি রুদ্র তার বহুভোগী কালিমায় কালো করেছে।
ভাঙনের শব্দ শুনি, আর যেন শব্দ নেই কোনও,
মাথার ভেতর যেন অবিরল ভেঙে পড়ে পাড়।
করাত কলের শব্দে জেগে উঠি স্নায়ুতে শিরায়
টের পাই বৃক্ষ হত্যা সারারাত রক্তের ভেতর।
কেন এত বৃক্ষহত্যা, এত ভাঙনের শব্দ কেন?
আর কোনও ধ্বনি নেই পৃথিবীতে, ব্রহ্মাণ্ডে, নিখিলে?
কোথায় ভাঙছে এত? কোনখানে? নাকি নিজেরই
গভীর মহলে আজ বিশ্বাসের গোপন ভাঙন!
উদাসীন দূর থেকে ডেকে যাই সকাল সকাল..
তবে কি সকাল ভাঙে পৃথিবীতে আমার সকাল!
আমার নগর ভাঙে, প্রিয় এই নিভৃত নগর?
তবে কি আকাঙক্ষা ভাঙে, স্বপ্নময় পরম পিপাসা?
প্লাবনের ক্ষতচিহ্ন মুছে নেয় মানবিক পলি,
আগুনের দগ্ধ শোক কবে আর মনে রাখে গৃহ।
দুর্যোগের রাত্রি শেষে পুনরায় তুলেছি বসত,
চিরকাল তবু এই ভাঙনের শব্দ শুনে যাব?
হ্যাঁ তোমাকে চিরকালই এই ভাঙনের শব্দ শুনে যেতে হবে। আমি আর ফিরব না তোমার ওই নষ্ট জীবনে। কবিতা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, কবিতা আমাকে কাঁদায়, কিন্তু না, কবিতা আর জীবন এক নয়, কবি হতে হলে যদি বাণিশান্তার বেশ্যার সঙ্গে শুয়ে অসুখ বাধাঁতে হয়, তবে সে কবির কবিতা আমি ভালবাসতে পারি, সে কবির সঙ্গে জীবন জড়াতে পারি না। ফাঁকি তো যথেষ্ট দিয়েছ, আর কত রুদ্র! আমাকে বোকা পেয়ে কাছে টেনে যেটুক অবশিষ্ট আছে আমার, তাও নষ্ট করতে চাও! আর কত ফাঁকি দেবে, আমি কি বুঝি না ভাবো চাতুরি তোমার! ভেতরে নরক রেখে কেমন বাহানা ধরো সুবোধ শিশুর! চুম্বনের স্বাদ দিলে বিষাক্ত সাপের মত ছোবলের ঘায়ে, মুখোশ খুলেই দেখি আসলে তোমার এক বীভৎস আদল। আর কত প্রতারণা, ভাঙনের নৃশংস খেলা এতটা নির্মম! পুন্নিমাবিহীন চাঁদ অশুভ অমাবস্যাকে ডাকে আয় আয়—জোনাকিকে জোৎস্না ভেবে নিকষ আন্ধার রাতে উৎসবে মেতেছি, এই তো আমার ভুল, এই তো আমার পাপ জালেতে জড়ানো.,এখন ছুটতে চাই, দুদাঁতে কামড়ে চাই ছিঁড়তে বাধঁ ন,এখন বাঁচতে চাই, প্রাণপণে পেতে চাই বিশুদ্ধ বাতাস। আর কত ফাঁকি দেবে, আমি কি বুঝি না ভাবো চাতুরি তোমার? জীবনে জঞ্জাল রেখে সুবাসিত হাসি টানো ঠোঁটের কিনারে ! গ্লানিতে অতীত ভরা, গ্লানিতে শরীর ভরা, ঘণৃার জীবন। অমৃতের মত ভেবে তবওু ছুঁয়েছি আমি বিষের অনল। এই কি আমার প্রেম, সাজানো গোছানো সাধ, সাধনার ধন? এই তো আমার ঘর, মাটি নেই, খুঁটি নেই, অলীক মহল, নিশ্চিত মরণ থেকে এবার বাঁচতে চাই, শুভ্র মুক্তি চাই, সুচারু স্বপ্নকে চাই, অমল ধবল চাই হৃদয়ের ঘ্রাণ। কিন্তু শুভ্র মুক্তি আমি পেতে পারি না। অমল ধবল জীবন আমি পেতে পারি না। রুদ্র নিজের অসুখের চিকিৎসা করে অনুতপ্ত অন্ধকার লিখছে। তার অনুতাপ আমাকে অসুখ থেকে রক্ষা করে না। আমি একা, আমার সমস্ত যন্ত্রণা নিয়ে একা আমি। হঠাৎ একদিন লক্ষ করি যৌনাঙ্গে ঘা হচ্ছে। তাহলে সংক্রামিত হয়েছিই! মনে একটি ক্ষীণ আশা ছিল, হয়ত হইনি। কেবল আশায় বসতি। এই চেনা শহরে আমার পক্ষে সম্ভব নয় রক্ত পরীক্ষা করা, কোনও ওষুধের দোকানে গিয়ে পেনিসিলিন ইনজেকশন চাওয়া। সম্ভব নয় নিজের শরীরে নিজে সুঁই ফোটানো। সম্ভব নয় কাউকে সুঁই ফোটাতে বলা। পেনিসিলিন ইনজেকশনের ডোজ দেখেই সকলে জেনে যাবে কোন রোগের চিকিৎসার জন্য এই হাই ডোজ। রুদ্র সুস্থ হচ্ছে, তার ক্ষত সেরে যাচ্ছে একটু একটু করে, ক্ষত আমার যৌনাঙ্গে বাড়ছে একটু একটু করে, আমি অসুস্থ হচ্ছি। এই অসুখ টি আমি লুকিয়ে রাখি শরীরের গভীর গুহায়। কেউ যেন না দেখে, কেউ যেন না জানে। একটি ভয় আমার গায়ে লেগে থাকে সারাক্ষণ, যেখানেই যাই যা কিছুই করি, ভয়টি আমাকে ছেড়ে কোথাও যায় না। হাসপাতালে নার্সের ঘরে শত শত পেনিসিলিন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা লিখে দিচ্ছি, নানারকম পেনিসিলিনের নাম, রোগীর আত্মীয়রা সে ওষধু আনছে, নার্সকে বলছি ইনজেকশন দিতে রোগীদের, চোখের সামনে নার্সও দিচ্ছে। কিন্তু নিজে একটি পেনিসিলিন নিজের জন্য নিতে পারছি না। নিজে কোনও ডাক্তার বা নার্সকে বলতে পারছি না আমাকে একটি ইনজেকশন দিয়ে দিন, একটি হাই ডোজের পেনিসিলিন দিন। এর চেয়ে যদি ক্যান্সার হত আমার, যে কোনও দুরারোগ্য রোগ, স্বস্তি পেতাম, অন্তত বলতে পারতাম আমার অসুখের নাম, চিকিৎসা করাতে কোনও লজ্জা হত না। কাকে বলব এখন কি রোগে ভগু ছি আমি। কণ্ঠুার করাত আমাকে ফালি ফালি করে কাটে। ভয় লজ্জা আমাকে শক্ত দড়িতে বাঁধে। আমার সীমানা কমতে কমতে একটি বিন্দুতে এসে পৌঁছোয়। কিন্তু কতদিন লুকিয়ে রাখব এই রোগ! ক্যানেসটেন মলম ব্যবহার করে জানি কাজের কাজ কিছু হবে না, তবু কিনি ওষধু টি। সঠিক ওষধু টি কেনার উপায় নেই বলে অন্য ওষধু কিনি। এ মলম যৌনাঙ্গের ফাংগাস দূর করে, এ মলম ট্রিপোনেমা পেলিডামএর মত ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া ধং্ব স করতে পারে না। তারপরও প্রতিদিন জামার আড়ালে মলম নিয়ে গোসলখানায় ঢুকি, যেন গোসল করতে বা পেচ্ছাব পায়খানা সারতে যাচ্ছি। আর কারও চোখে কিছু পড়ে না, কেবল মার চোখে পড়ে। মলমটি বিছানার সবচেয়ে তলের তোশকের তলে লুকিয়ে রাখি। কেউ কখনও তোশকের ওই তলে হাত ঢোকায় না। এত লুকোনোর পর মা বলেন, তর হইছে কি রে, বারে বারে বাথরুমে যাস কেন?
