কিছু হয় নাই তো! ফ্যাকাসে মুখটি আড়াল করে বলি।
তর কি কিছু অসুখ টসুখ হইছে নাকি?
কি কও এইসব? অসুখ হইব কেন!
আমার কিন্তু মনে হইতাছে তর কিছু হইছে।
মার চোখের দিকে তাকাই না। বুকের ধুকপুক বুকেই থাকতে দিই।
সামনে পরীক্ষা। ছেলেমেয়েরা দিনরাত পড়ছে। কলেজে যাই, ক্লাস করি। অধ্যাপক অধ্যাপিকাদের বক্তৃতার দিকে চোখ, কিন্তু মনটি অন্য কোথাও, মন শরীরে। বাড়িতে বই সামনে নিয়ে বসে থাকি, মন চলে যায় বইয়ের অক্ষর থেকে শরীরে। শরীরে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। চিকিৎসা এক্ষুনি দরকার। কিন্তু কি করে চিকিৎসা পাবো, কোথায় পাবো! রুদ্র মোংলায় বসে কবিতা লিখছে। ঢাকা গিয়ে চিকিৎসা করারও উপায় নেই। হাই ডোজের পেনিসিলিন সিফিলিস ছাড়াও হৃদপিণ্ডের অসুখে ব্যবহার হয়। হৃদপিণ্ডের অসুখ ও যদি হত আমার, বাঁচা যেত। অন্তত সে কারণে নিশ্চিন্তে একটি ইনজেকশন আমি নিতে পারতাম। চাইলেই তো হৃদপিণ্ডকে অসুখ দিতে পারি না। মাঝে মাঝে কনুইয়ে যে ব্যথা হয়, এক কনুই থেকে আরেক কনুইয়ে লাফ দিয়ে ব্যথা যায়, এই রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিসএর সময় হৃদপিণ্ডের মাইট্রাল স্টেনোসিস ঘটাতে পারে। মাইট্রাল স্টেনোসিস হলে শ্বাসকষ্টের উপসর্গ থাকে। এই যে হঠাৎ রাতে রাতে আমার শা্ব স বন্ধ হয়ে আসে, যেন একটি ছোট্ট ট্রাংকের মধ্যে বন্দি হয়ে আছি, শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস পাচ্ছি না সেরকম লাগে, শোয়া থেকে উঠে বসে ফুসফুসে বাতাস নিতে থাকি, বসে না হলে দাঁড়িয়ে, তাতেও না হলে জানালা খুলে হলে শ্বাস নিই। সেটিরই তো নাম অকেশনাল নকচারনাল ডিসনিয়া। তবে তো আমি যোগ্যতা রাখি হাই ডোজ পেনিসিলিন পাওয়ার। এই যোগ্যতার সুযোগ পেয়ে আমি ক্লাসের একটি সাদাসিধে ভালছাত্রী নাসিমাকে বলি, আমার নকচারনাল ডিসনিয়া হয়। ভয় করছি মাইট্রাল স্টেনোসিস আবার না হয়ে যায়। ভাবছি পেনিসিলিন ইনজেকশন নেব। নিলে তো মাইট্রাল স্টেনোসিস অন্তত প্রিভেন্ট করা যাবে কি বল। নাসিমা যদি বলে আমার নেওয়া উচিত পেনিসিলিন, তবেই নাসিমাকে সাক্ষী রেখে আমি ইনজেকশনটি নিতে পারি। নাসিমাই আমার হৃদডিণ্ডটি বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আমার অত বড় অসুখের কথা শুনে নাসিমা হাসে। বলে, আগেই ইনজেকশন নেবে কেন? আগে হার্টটা দেখ। মারমার পাও হাটের্? বিপাকে পড়ি, স্টেথোসকোপ নিজের বুকে কখনও লাগাইনি। রোগির হৃদপিণ্ড নিয়েই ব্যস্ত, নিজের হৃদপিণ্ডের খবর কে রাখে। কেবলই অনুমান। অবশ্য এসব অনুমানের ওপর আমাকে কেউ পেনিসিলিন নিতে দেবে না, কাউকে না জানিয়ে গোপনে কোনও ইনজেকশনও আমাকে দেবে না কেউ, এমন কি নাসিমাও। ভাল ছাত্রীর ভাল কান স্টেথোর নলে, নল বেয়ে আমার হৃদপিণ্ডের কোনও মন্দ শব্দ ভাল কানে পৌঁছে না। কোনও মারমার নেই, সুতরাং পেনিসিলিন নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই আমার। বুঝি, ইনজেকশন ছাড়া উপায় নেই।
রুদ্র মোংলা থেকে ফিরে এলে বাড়ির কাউকে কিছু না বলে আমি ঢাকার বাসে চড়ি। বাড়ির কারও অনুমতির জন্য অপেক্ষা করলে আমার চলবে না। ঢাকায় শাহবাগের এক ওষুধের দোকানে, রুদ্র যেখানে নেয় ইনজেকশন, নিয়ে যায়। নিতম্বের মাংসে লম্বা মোটা সুঁই ফোঁটালো যে লোকটি, বাঁকা একটি হাসি ঝুলে রইল তার ঠোঁটে, ষ্পষ্ট দেখি। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করি সুঁই আর হাসি, দুটোই। ওষুধের দোকানের পাশেই চায়ের দোকান, ওখানে বসে রুদ্র খুব নরম কণ্ঠে বলে আজ থেকে যাও। রুদ্রর চোখদুটোয় তাকালে আমার এখনও, অবাক কাণ্ড,আগের মতই, কীরকম যেন লাগে। ঘরে ফিরে রুদ্র আমার হাতে আঙুল বুলোয়, আঙুলগুলো দেখি যে আঙুল অন্য কোনও নারীর শরীর ছোঁয় ঠিক এভাবেই। রুদ্র চুমু খায় আমাকে, এভাবেই সে চুমু খায় অন্য নারীদের। রুদ্র বুকে হাত রাখে, এভাবেই সে রাখে অন্য নারীর বুকে। রুদ্র বিছানায় নিয়ে আমাকে শুইয়ে দেয়, সারা শরীরে আদর করে, এভাবেই সে করে আর নারীদের। এভাবেই সে আরেক নারীর সঙ্গে শোয়। কোথাও খুব যনণ্ত্রা হয়। বুকের ভেতরে। নিজেকে বার বার বলি, না, এ জীবন আর নয়। আমি ফিরে যাব ময়মনসিংহে আজই, আর কোনওদিন রুদ্র বলে কোনও মানুষের কথা ভাবব না। রুদ্র আমার পাশে শুয়ে আমার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে ধরা গলায় বলতে থাকে মদ আর মেয়েমানুষের নেশা তার জীবনের শুরু থেকে ছিল। আমাকে সে ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছিল, আমি বুঝিনি। আমাকে তার জীবনের সব খুলে বলার ইচ্ছে ছিল খুব, কিন্তু বলা হয়নি তার। আমাকে বিয়ে করার পর তার যে খুব ইচ্ছে ছিল আগের জীবন যাপন করতে, তা নয়। আমি তার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে দ্বিধা করেছি বলেই তাকে যেতে হয়েছে বেশ্যাবাড়ি। কিন্তু আমার প্রতি ভালবাসা কোনও বেশ্যাবাড়ি গিয়ে নষ্ট হয়নি।
যে পেনিসিলিন আমাকে সুস্থ করার কথা, আমাকে অসুস্থ করতে থাকে আরও। একটি গোটার জায়গায় আরও পাঁচটি গোটা জন্ম নেয়। গোটা আর গোটা নেই, মখু খুলে মেলে দেয়, খোলা ঘা থেকে পাজামায় রস গড়িয়ে নামছে। রস থিকথিকে হয়, রস শাদা থেকে কালো হয়। দগুর্ ন্ধ থেকে দগুর্ ন্ধতর হয়। রসের রং শাদা থেকে বাদামি হয়। বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি, গাঢ় বাদামি থেকে লালচে, লালচে থেকে কালচে। কালচে থেকে কালো। কালো থেকে আলকাতরার মত কালো। আমি মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে রাখি নিজের শরীর। আতর কিনে গায়ে মাখতে থাকি। যেন কেউ গন্ধ না পায়। সারা রাত কড়া আলো জ্বেলে রাখি ঘরে, রাত জেগে পড়তে হবে বলে। পরীক্ষা সামনে। টেবিলে নয়, বিছানায় বইখাতা এমন ছড়ানো যে আমি আমার আর বইখাতার পর ইয়াসমিনের শোয়ার জায়গা হয় না। আমি চাই না ওর জায়গা হোক। আমি চাই না এই জীবাণু আমার এই শরীর থেকে আমার জামা পাজামা, বিছানার চাদর বালিশ থেকে ইয়াসমিনকে স্পর্শ করুক। গোসলখানায় গোসল করি একবারের জায়গায় দুবার, কখনও তিনবার। বলি যে আমার গরম লাগছে। এত গরম যে বার বার গোসল না করলে আমার হয় না। গোসল করার উদ্দেশ্য পাজামা ধোয়া। পাজামা ভিজে যায় দগুর্ ন্ধ নির্যাসে। শেষ অবদি আমাকে তুলো ব্যবহার করতে হয়। তুলোও বড় লুকিয়ে। কারণ আমার ঋতুর হিসেব আমার না থাকলেও মার কাছে থাকে। প্রতি মাসেই আমাকে তলপেটের ব্যথায় বিছানায় গড়াতে হয়। সেইসব কোনওরকম উপসর্গ ছাড়াই আমি ঋতুর দেখা পেয়েছি এ একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়াবে। গোসলপেচ্ছাবপায়খানার পেছন দিকে একটি বন্ধ বারান্দায় রক্তভেজা কাপড় তুলো ফেলে দেওয়ার অভ্যেস আমার আর ইয়াসমিনের। বাবা মাঝে মাঝে ওই বারান্দা পরিষ্কার করেন।নিজের হাতে আমাদের রক্তের তুলো তোলেন। ওখানে রক্তহীন কোনও তুলো পড়ে থাকতে দেখলে মার সন্দেহ হবে, ভেবে গুটিয়ে যাই। তুলো যদি পায়খানায় ফেলি, বদনি বদনি পানি ঢেলেও সেটি দূর করা যাবে না। আটকে যাবে পথে, গু মুত সব ফোয়ারার মত উত্থিত হবে। মাথা থেকে সার্জারি মেডিসিন গায়নোকলজি গেছে আমার, মাথায় কেবল একটি রোগ, একটি রোগ থেকে বাঁচার উপায়। শরীরে মাথা ফুঁড়ে বেড়ে ওঠা একটি রোগ সবার চোখ থেকে লুকোনো।
