আর তুমি?
আর আমি?
হ্যাঁ তুমি।
আমি কি?
তুমি কি করবে?
আমি আর কি করব, লেখাপড়া করব, ডাক্তার হব, রোগির চিকিৎসা করব।
সম্পর্ক?
কিসের সম্পর্ক? কার সঙ্গে?
আমার সঙ্গে।
আমি হেসে উঠি।
তোমার সঙ্গে এখনও কি সম্পর্কে আমার ফুরোয়নি রুদ্র?
রুদ্র অনেকক্ষণ চপু করে থেকে ভাঙা গলায় বলে, ক্ষমা করতে পার না?
ক্ষমা? ক্ষমা তো আমি তোমাকে করেছিই। নিজের মান সম্মানের তোয়াক্কা না করে এই জন্ম-চেনা শহরে এনে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাম। তোমাকে তো ওই মোংলা বন্দরেই পারতাম, পারতাম না ত্যাগ করতে?
পারতে।
রুদ্রর চোখে সেই চিরকেলে ধূসরতা।
আমার জীবনে আর আছে কি বল। এত বছর প্রেম করে, বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে প্রথম মিলন, দীর্ঘ বছর অপেক্ষার পর সেই দিনটি এল। বিষম সুখের সময় আমার, বিষম আনন্দের। তাই না? সমস্ত ভয় লজ্জা দূর করে নিজের সমস্তটুকু দিয়েছি তোমাকে, যে সমস্তটুকু চাইতে তুমি। সম্পণূর্ করে আমাকে চাইতে। পেলে তো! এখন তো তোমার সাধ মিটেছে, তাই না! আমার বিয়েতে তো আমি কোনও লাল বেনারসি পরিনি, গয়না পরিনি, বিয়েতে তো কোনও বাদ্য বাজেনি, অতিথি আসেনি, কেবল তুমি আর আমি উদযাপন করেছি। আমি তোমাকে উপহার দিয়েছি আমার সমস্ত ভালবাসা, সমস্ত বিশ্বাস, তুমি আমাকে উপহার দিয়েছো একটি রোগ। আমার বিয়ের উপহার তোমার কাছ থেকে তো এটিই। কি বল?
তোমারও তো ইনজেকশন নিতে হবে। ঢাকায় চল।
আমাকে নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না। অনেক ভেবেছো। এবার অন্য কিছু নিয়ে ভাবো। নিজের জীবন নিয়ে ভাবো। পারোতো রোগ বালাই থেকে দূরে থেকো।
তুমি আমাকে ত্যাগ করছ?
নিস্পৃহ কণ্ঠ আমার।
হ্যাঁ ত্যাগ করছি। ভেব না তোমার সিফিলিস হয়েছে বলে আমি তোমাকে ত্যাগ করছি। নেহাত দুভার্গা বলে তোমার রোগটি হয়েছে, তুমি বেশ্যাবাড়ি যাও, ওদের সঙ্গে থাকো, নাও হতে পারত এই রোগ তোমার। সবার হয় না। আমি তোমাকে ত্যাগ করছি, তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছ বলে।
রুদ্রর চোখ ছলছল করে।
আমার জায়গায় হলে তুমি কি করতে রুদ্র?
সত্যিই আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ?
সত্যিই।
একবার ভাল হবার সুযোগ দেবে না?
আমি মলিন হাসি। নিঃস্ব, রিক্ত, সব হারানো মানুষ আমি। আমি সুযোগ দেবার কে! আমি কি কোনও মানুষ। নিজের ওপরই লজ্জা হয়, নিজেকেই ঘৃণা হয়। রুদ্র দাঁড়িয়ে থাকে চরপাড়ার রাস্তায়, একা। আমি চলে আসি, আমার একবারও ইচ্ছে হয় না পেছনে তাকাতে। একবারও ইচ্ছে হয় না রুদ্রকে বলি আবার এসো, চিঠি লিখো। ইচ্ছে হয় না আমার। আমি জানি এই শেষ দেখা আমার তার সঙ্গে। আর হয়ত কোনওদিন দেখা হবে, হঠাৎ কখনও ঢাকার রাস্তায়, কখনও কোনদিন কোনও বইমেলায়। রুদ্রকে আমার স্বামী বলে তো নয়ই, কোনও প্রেমিক বলেও মনে হয় না। মনে হয় এক চেনা লোক। চেনা লোকটি কবিতা লেখে। চেনা লোকটির অসখু হয়েছে বলে, যেহেতু আমার হাতের কাছে চিকিৎসার সৃুযোগ আছে, করুণা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। চেনা লোকটি তার চেনা জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। আমি ফিরে যাচ্ছি আমার চেনা জায়গায়। চেনা লোকটিকে নিয়ে আমার কোনও স্বপ্ন নেই। চেনা লোকটি আর কোনওদিন আসবে না আমার কাছে, আমার জীবনে, আমার শরীরে, আমার মনে। আর কোনও প্রেমের চিঠি নয়। আর কোনও শোয়াশোয়ি নয়। আর কোনও সংসার নয়। কোনও বন্ধন নয়। বন্ধন ছিন্ন করতে কোনও একদিন কোনও একটি কাগজে সই করে দেব। চেনা লোকটি ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে উঠবে। চেনা লোকটির কবিতাই শুধু চেনা থেকে যাবে। আর কিছু নয়। চেনা লোকটির কবিতা হয়ত পড়ব, ধূসর ধূসর কিছু স্মৃতি হয়ত আমাকে মুহূর্তের জন্য আনমনা করবে। কেবল এই। এর বেশি নয় কিছু আর।
১৮. অনুতপ্ত অন্ধকার
সমুদ্রে তোলা ছবিগুলো দেখে মা বলেন, আমাকে নাকি জলকন্যার মত লাগছে। সমুদ্রের শাদা ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি, জলে ভেজা শরীর রোদে চিকচিক করছে, খালি পায়ে সূর্যাস্তের দিকে হেঁটে যাচ্ছি, অনেক সময় এক দঙ্গল মেয়ে আছে সঙ্গে। মা বলেন, আর কাউরে তো তোমার মত এত সুন্দর লাগতাছে না। তোমারেই মনে হইতাছে জল থেইকা উইঠা আইছো। মা যদি জানতেন কি ঘটেছে আমার জীবনে, আমার শরীর এখন আর জলকন্যার মত পবিত্র নয়, তবে নিশ্চয়ই এ নামে আমাকে ডাকতেন না। মা যদি জানতেন সমুদ্রের হাওয়া খেয়েই আসিনি আমি, কদিনের জন্য হাওয়া হয়েও গিয়েছিলাম। আগুনের হলকা ছিল সে হাওয়ায়। আমি শুকনো হাসি হাসি। কার কাছে বলব নিজের এই পরাজয়ের কথা! না কেউ নেই কোথাও যার কাছে বসে কাঁদি। আমাকে একা একাই কাঁদতে হয়। একা একাই বসে থাকতে হয় ছাদে, নৈঃশব্দের কোলে মাথা রেখে। চোখের জল লুকিয়ে রাখতে হয় জলকন্যার। শওকত টিপ্পনি কেটেছে, কি, হাইমেন রাপচার হইছে?
আমি ম্লান হেসেছি।
কি গো জলকন্যা সমুদ্র নিয়া কবিতা লিখবা না! ইয়াসমিন বার বারই জিজ্ঞেস করে। নাহ, কবিতায় মন নেই, মন শরীরে। দীর্ঘ দিন কবিতা লিখিনা, কবিতা আসে না আজকাল। জলকন্যাকে মনে মনে যাদুর পালঙ্কে ঘুম পাড়াই, মনে মনে বুঝি ঘুম নেই তার চোখে, দুশ্চিন্তার চাদর মুড়ি দিয়ে একা একা জেগে থাকে সে। জলকন্যা চিঠি পায়, এসেই নিয়ে নিয়েছি। ব্যথা তেমন লাগেনি। ক্ষত এখনো অপরিবর্তিত। অভাবিত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি নিজেকে। তবে শোচনার কষ্ট খুব বেশি। .. দুর্ভাবনা করো না। কিছুই হারাইনি আমরা। সোনা মানিক, বিভ্রান্তির কালো রোদ আর কখনো আমাকে স্পর্শ করবে না। আমি ভাল থাকছি। ভাল থাকবো। আমি তোমার স্বপ্নের মত ভাল থাকব। তোমার শরীরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে রয়েছে সারা ঘরে—আমি সেই ঘ্রাণের সাথে খেলি। তোমার হৃদয়ের রোদ উজ্জ্বল করে রেখেছে আমার পরান। আমি সকালের রোদ হয়ে উঠব, সকালের রোদ। রুদ্রকে আমি চিঠিতে রোদ বলে ডাকতাম, রুদ্র ডাকত আমাকে সকাল বলে। ওইসব বাঁধনছেঁড়া প্রেম এখন কী বিষম অর্থহীন মনে হয়। রুদ্র এখন সকালের রোদ হয়ে উঠতে চায়। সে এখন আমার রুদ্র হয়ে উঠতে চায়। এখন কেন? কেন সে সেই প্রথম থেকেই ছিল না আমার! কেন সে বার বার বলেছে সে আমার ছিল! কেন সে ঠকিয়েছে আমাকে! কেন মিথ্যে বলেছে! এখন সে সকালের রোদ হয়ে উঠবে, কি করে বিশ্বাস করি তাকে!কেন আর চিঠি লেখে রুদ্র আমাকে। আমি তো তাকে আর আমার এ জীবনের সঙ্গে জড়াবো না। আমি মন থেকে ঝেড়ে ফেলেছি রুদ্র নামের প্রতারকটির নাম। ধূসর আকাশ থেকে অবিরল বৃষ্টি হয় হোক, জলের প্রপাত বেয়ে বন্যা এসে দুকূল ভাসাক, তবু ভাল নির্বাসন। খানিকটা ঝিকমিক রোদ আচমকা সুখ এনে পণূর্ করে ঘরের চৌকাঠ, গোপনে বিনাশ করে স্বপ্নে ধোয়া সোনার বাসর, ঘণু পোকা খুঁটে খায় শরীরের সুচারু বৈভব, হৃদয়ের রক্ত খায়, খেয়ে যায় বাদামি মগজ। সেই রোদে পুড়ে পুড়ে খাক হয় অনন্ত আগামী, জীবন পুড়িয়ে দিয়ে আগুনের হল্কা ওঠে নেচে। আমার উঠোন জুড়ে মাটি আর খরায় চৌচির, জগত আধাঁর করে নামে যদি তুমুল তুফানতবু ভাল নির্বাসন, রোদহীন বিষণ্ন সকাল। পৃথিবী আধাঁর করে ফিরে যায় অমল রোদ্দুর, পেছনে কালিমা রেখে ফিরে যায় সবুজ সুষমা, শিকার খুবলে খেয়ে ফিরে যায় চতুর শগৃাল, লম্পট জুয়ারি ফেরে, অমানুষ, মদ্যপ শকুন। তুমিও তেমনি করে ফিরে যাও পরানের রোদ, ঘুরঘুট্টি কালো রাত ফেলে তুমি বনবাসে যাও, সোনালী ডানার রোদ উড়ে যাও পরবাসে যাও। এক ফোঁটা জ্যোৎস্না নেই, সেই ভাল, নিকষ আন্ধার, অমাবস্যা ডুবে থাক, তবু রোদ খুঁজো না সকাল। তবু রোদ তার সকালকে খুঁজেই যাবে। আর যা কিছুই হারাক, সে তার সকালকে হারাতে চায় না।
