রুদ্র কথা বলে না।
ঠিক আছে চল। আমার জন্য নয়। তোমার জন্য চল ময়মনসিংহে। ওখানে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেব।
মহাখালির বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস দুঘন্টা সময় নেয় ময়মনসিংহে পৌঁছতে। বাসের পুরো পথ দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ শুনি না নিজের। পৃথিবীতে আর যেন কোনও শব্দ নেই। পাশে বসে রুদ্র নিঃশব্দে ঘুমোয়। ঘুমের রুদ্রর মখু হাঁ হয়ে থাকে। কি করে মানুষটির ঘুম আসে, এমন নিশ্চিন্তি সে কোত্থেকে পায় আমি বুঝে পাই না। ময়মনসিংহে নেমে রুদ্র কোথাও যায়, কোনও হোটেলে। আমি অবকাশে ফিরি। মা দৌড়ে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, আহারে আমার মেয়েটা কতদিন ঘরছাড়া ছিল। ইয়াসমিন বুবু আইছে বুবু আইছে বলে ছুটে আসে। ইয়াসমিনের কোল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার কোলে সুহৃদ। আমি লুকোতে চেষ্টা করি চোখের জল, পারি না। ইচ্ছে হয় চিৎকার করে কাঁদি। গলা ছেড়ে কাঁদি। ইচ্ছে হয় মেঝেয় লুটিয়ে কাঁদি। বাবা বলেন, সমুদ্র কেমন দেখলা মা? আমারই সমুদ্র দেখা হয় নাই এখনও, আমার মেয়ে সমুদ্র দেইখা ফেলল। মা দৌড়ে গেলেন রান্নাঘরে, তাড়াতাড়ি ভাল কিছু রান্না বসাতে। সুফি হেসে বলে,ইস কতদিন পরে আইলাইন! মা বাপ ছাড়া কেমন লাগছে এত দূরে! মামি ত নিত্যিদিন কয়, আমার মেয়েডা না জানি কি করতাছে! সুহৃদকে ইয়াসমিনের কোলে তুলে দিয়ে দৌড়ে গোসলখানায় যাই, আমার এক্ষুনি পেচ্ছাব না করলে নয়। গোসলখানায় বসে মুখে পানি ঢালি যেন চোখের জল পানির স্রোতের সঙ্গে চলে যায়। বদনি বদনি পানি ঢালি, বালতির পানি ফুরিয়ে যায়, চোখের জল ফুরোয় না। আমি প্রাণপণ শক্তি দিয়ে নিজের চিৎকার থামাতে পারি, চোখের জলকে পারি না। তার চেয়ে এরকম যদি হত, আমি বাড়ি ঢুকলেই বাবা আমাকে গাল দিতেন, গালে দুটো চড় কষিয়ে বলতেন, আইজকা সকালে তো হাইজিন ট্যুরের দল ময়মনসিংহ পৌঁচেছে, তর দেরি হইল কেন হারামজাদি? মা যদি বলতেন, সমুদ্রের নাম কইয়া আসলে কই গেছিলি ক তো! ওই যে যেই বেডা তরে বউ কইয়া চিঠি লেকছিল, হেই বেডার সাথে কাডইিয়া আইছস না তো। ইয়াসমিন যদি কাছে না আসত, আমার বাড়ি ফেরায় না ফেরায় ওর যদি কিছু না যায় আসত, সুহৃদকে কোলে নিতে চাইলে সুহৃদ যদি মখু ফিরিয়ে নিত, আমার ভাল লাগত। আমি ভালবাসা পেতে চাই না কারও কাছ থেকে আর। ঘণৃা করুক আমাকে সবাই। প্রচণ্ড ঘণৃা করুক।
পরদিন কলেজে গিয়ে কোনও ক্লাস না করে রুদ্রকে ক্যান্টিন থেকে উঠিয়ে নিয়ে চড়পাড়ার রাস্তায় সারি সারি ওষুধের দোকান, ডাক্তারের চেম্বার আর ল্যাবরটরির পাশ দিয়ে হাঁটি। কোথায় যাব, কোন ডাক্তারের কাছে? যে কোনও ডাক্তারই আমাকে চেনে, নামে চেনে, মুখে চেনে, নয়ত বাবার মেয়ে হিসেবে চেনা। যে কোনও ডাক্তারই অবাক হবে আমি একটি সিফিলিস রোগিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে, বার বার প্রশ্ন করবে কে এই রোগি? কি হয় আমার? ভাবি কোনও ডাক্তারের না গিয়ে রক্ত পরীক্ষাই করে নেওয়া ভাল। ভেবে কোনও ডাক্তারের চেম্বারে নয়, রক্ত পরীক্ষার জন্য ঢুকি একটি প্যাথলজি ল্যাবএ। এক চৌকোনা চোয়ালের কালো লোক, চোখ দুটো বেরিয়ে আসছে কোটর থেকে, অনুমান করি টেকনিশিয়ান, বলি এর ভিডিআরএল টেস্ট করতে হবে। বলার সময় কণ্ঠ কাঁপে আমার। লোকটি তীক্ষ্ম চোখে আমাকে দেখে। চোখের প্রশ্ন লোক কি হয় আপনার? আমি চোখ নামিয়ে ফেলি, যেন পড়িনি কোনও প্রশ্ন। চোখের তীক্ষ্মতা দেখিনি। মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীরা চেনা রোগি নিয়ে এমন কি রাস্তায় পড়ে থেকে কাতরাতে থাকা রোগীদের দয়া করে তো চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এরকমই হয়ত কিছু। হাসপাতালের করিডোরে এক লোক হাঁটছিল, আমার সাহায্য চাইল তার রোগের চিকিৎসার জন্য। আমার অবসর ছিল বলে, ঠিক এক্ষুনি কোনও ক্লাস ছিল না বলে, লোকটিকে দেখাতে নিয়ে এসেছি কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে। মুখের ভাবে যে রকম কারণই দিই না কেন লোকটির ঠোঁটে বাঁকা একটি হাসি খেলতে থাকে, বুঝি যে এই লোক আমাদের দুজনকে আগে অনেক দেখেছে, এই লোক খুব ভাল করে চেনে আমাকে, রুদ্র আমার স্বামী এ কথা না জানলেও জানে রুদ্র আমার প্রেমিক।
রুদ্রর রক্ত পরীক্ষার ফল হাতে এল। ভিডিআরএল পজিটিভ।
কাগজটির দিকে তাকিয়ে, যে এক চিলতে আশাকে লালন করেছিলাম, শক্ত পায়ে কেউ মাড়িয়ে গেল। হাহাকার ছাড়া কিছু আর অবশিষ্ট নেই। সারা জীবনের জন্য ওই আমার সম্বল।
রক্ত পরীক্ষা হল মেডিকেল কলেজের আঙিনায়। চৌকোনা লোকটি হাসপাতালে যেতে আসতে আমাকে ফিরে ফিরে দেখে। এ লোক কি তাবৎ ডাক্তারদের কাছে বলে বেড়াচ্ছে যে আমার সঙ্গে একটি দাড়িঅলা লোক ঘোরে, লোকটির সিফিলিস হয়েছে! বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে, আর কিসের সতর্কতা আমার! ওই আঙিনাতেই বিকেলে যৌনবিশেষজ্ঞের চেম্বারে ঢুকি প্যাথলজির কাগজটি হাতে নিয়ে। পেছনে রুদ্র। বিশেষজ্ঞ চোখ কুঁচকে কাগজের দিকে, রুদ্রর দিকে, আমার দিকে ঘন ঘন তাকিয়ে ব্যবস্থাপত্র লিখে জিজ্ঞেস করলেন আমাকে, এ কি তোমার চেনা রোগি?
হ্যাঁ স্যার। শান্ত কন্ঠ।
ও।
বিশেষজ্ঞের ভাবনার ভেতরে নেই এই রোগী আমার কোনও আত্মীয় হতে পারে। কোনও উদ্ভট কল্পনাও যদি এই বিশেষজ্ঞ করেন, তার ত্রিসীমানার মধ্যে নেই এই রোগী আমার প্রেমিক হতে পারে, অথবা আমার স্বামী। তাই রোগী তোমার কি হয় জিজ্ঞেস না করে জানতে চেয়েছেন এ আমার চেনা রোগী কি না। চেনাই তো। রুদ্র আমার সেই কতকালের চেনা। ফের কোনও বাক্যালাপের সুযোগ না দিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরোই। বাইরে এসে ফুসফুস ভরে মুক্ত হাওয়ার ঘ্রাণ নিয়ে শান্ত গলায় বলি, এবার? সবই তো হল। যাও, ঢাকায় গিয়ে পেনিসিলিন ইনজেকশন নাও। কোনও এক ফার্মেসিতে গিয়ে বল, কমপাউন্ডার পুশ করে দেবে।
