কোনও উত্তর দেয় না রুদ্র। খেতে খেতে আমি তাকে দেখি। এত চেনা তার খাওয়ার, তার হাত ধোওয়ার, মখু মোছার, এত চেনা তার সিগারেটে আগুন ধরাবার, সিগারেট ফোঁকার ভঙ্গি!
রুদ্র প্রসঙ্গ পাল্টায় কবিতা পড়ে। চৌদ্দই ফেব্রুয়ারিতে সরকারি আদেশে পুলিশ ট্রাক চালিয়ে দিয়েছিল ছাত্র মিছিলে। ট্রাকের তলায় পিষ্ট হয়েছে অগুনতি মানুষ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে, আর সরকারি আদেশে গুলি চালাচ্ছে পুলিশ নিরীহ মানুষের বুক লক্ষ করে।
আমি তোমাকে আর ঘণৃা করতে চাই না,
আমি থুতু দিতে চাই জলপাই বাহিনীর মুখেযা
রা শিশু একাডেমি, নীলক্ষেত রক্তে ভিজিয়েছে,
যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে গুলিবিদ্ধ লাশ,
বুটের তলায় পিষে যারা খুন করেছে মানুষ,
আজ সেই জলপাই বাহিনীর রক্ত নিতে চাই। ..
রুদ্র একটির পর একটি কবিতা পড়ছে। ভারি কণ্ঠে, স্পষ্ট উচ্চারণে।
একদা অরণ্যে যেভাবে অতিকায় বন্যপ্রাণী হত্যা করে
আমরা অরণ্য জীবনে শান্তি ফিরিয়ে এনেছি,
আজ এইসব অতিকায় কদাকার বন্যমানুষগুলো নির্মূল করে
আমরা আবার সমতার পৃথিবী বানাবো,
সম্পদ আর আনন্দের পৃথিবী বানাবো। শ্রম আর প্রশান্তির পৃথিবী বানাবো।
মেঝেয় আধশোয়া হয়ে কবিতা শুনতে শুনতে আমি ভুলে যেতে থাকি মোংলা বন্দরে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা। যেন চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি আমি ঢাকায় এসেছি, রুদ্রকে সেই আগের মত আমি ভালবাসি, তার জীবনের কুৎসিত নোংরা চেহারাটি আমার দেখা হয়নি। আমি মগ্ধু তাকিয়ে থাকি, বিলীন হতে থাকি তার বলিষ্ঠ কণ্ঠে, সচেতন শব্দাবলীতে, মনে হতে থাকে রুদ্র আমার কেবলই এক বন্ধু আমার প্রেমিক নয়, স্বামী নয়। কবিতার খাতাটি পাশে রেখে রুদ্র জানালায় স্থির তাকিয়ে বলে আমার একটা খুব স্বপ্নের কথা তোমাকে বলি। আমি মিছিলে মরতে চাই গুলি খেয়ে। চোখদুটোয় দু ফোঁটা স্বপ্ন, চোখদুটো তার রাতের আকাশের দুটো তারা। মৃত্যু নিয়ে কাউকে এমন স্বপ্ন দেখতে দেখিনি আগে। মিছিলে মরতে রুদ্র কেন চায়! তাকে নিয়ে যেন মিছিল হয়, আন্দোলন জমে ওঠে, যেন সে অমর হয়ে থাকে! মৃত্যু ভাবনাটি আমাকে স্পর্শ করতে থাকে, সেই স্পর্শ সরিয়ে রুদ্র আমাকে চুমু খায়। চুমু খেতে খেতে আমার শরীর সে একটু একটু করে অবশ করতে থাকে। অবশ হতে থাকি, ভুলে যেতে থাকি আমি কে আমি কোত্থেকে, আমার সঙ্গে রুদ্রর সম্পর্ক, যেন আমি নই, এ অন্য কেউ, রুদ্রর প্রেমিকা, যে প্রেমিকাকে নিয়ে সে অনেক কবিতা লিখেছে। সেই প্রেমিকাকে সে আদর করছে, প্রেমিকা শরীর ভরে রুদ্রর আদর নিচ্ছে। রুদ্র তার বুকের কাপড় খুলে নিচ্ছে। সমস্ত শরীর দিয়ে ভালবাসছে তার সমস্ত শরীর। তার প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদছে তার প্রতি অঙ্গ। এক শরীর হারিয়ে যাচ্ছে আরেক শরীরে। সুখে, তীব্র সুখে প্রেমিকা জড়িয়ে ধরছে প্রেমিকের শরীর। যখন সব থেমে যায়, যখন চেতন ফেরে, প্রেমিকা হাঁসের মত হেঁটে যৌনাঙ্গে যন্ত্রণা নিয়ে পেচ্ছাব করতে যায়। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরতে থাকে পথে, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পেচ্ছাবখানায়। তখন সে আর প্রেমিকা নয় রুদ্রর। তখন সে আমি, রুদ্রর বউ আমি। এ কি হল! এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কি করে আমি রুদ্রর সঙ্গে মিলিত হয়েছি আবার, আবার কেন আমি তাকে আমার শরীর স্পর্শ করতে দিয়েছি? সে তো এই দাবি রাখে না। তার সঙ্গে ওই রাতের পরই কি আমার সম্পর্কে শেষ হয়নি? শেষ হয়েছে নিশ্চয়ই। তবে জেনেও কেন আমি একটি অসখু তার শরীর থেকে আবার নিয়েছি। কেন এই ভুল। কেন আবার পাপের সঙ্গে নিজেকে জড়ানো! কেন আবার রোগের জীবাণু নিজের শরীরে নিয়ে নিজেকে অসুস্থ করা! ছি ছি! নিজেকে আমি কি একটওু ভালবাসি না। সাধ করে কেউ অসুস্থ হতে চায়! একটি নোংরা রোগ নিতে চায় নিজের রক্তে! নাকি ওই যৌনসুখ এমনই সুখ যে আমি এর গায়ে লেগে থাকা সংক্রামক অসখু টির কথা ভুলে যাচ্ছি! জানি না। আমি কিছুই জানি না! নিজের ওপর রাগ হয়, ঘণৃা হয়। আবার এও মনে হয়, রোগের জীবাণু তো ঢুকেই গেছে আমার রক্তে!শুদ্ধতা তো গেছেই শরীর থেকে, তাহলে আর কিসের প্রতিরোধ! যে জীবাণু আমার রক্তে নেচে বেড়াচ্ছে সেই প্রথম মিলনের রাত থেকে সেই জীবাণু দ্বিতীয় বার গ্রহণ করতে আর ক্ষতি কি! রুদ্র আমাকে তো নষ্ট করেছে, আমার আর নতুন করে নষ্ট হতে বাধা কোথায়! নিজেকে একটি নষ্ট পচা কীটের মত মনে হয়, নর্দমাতেও আমার স্থান হওয়া উচিত নয়। আমি আর আগের আমি নই। আগের আমার মৃত্যু হয়েছে। এ আমি নতুন আমি। এ আমি নষ্ট আমি। এ আমি রুদ্রর মতই পথভ্রষ্ট, রুদ্রর মতই নিয়নণ্ত্র হীন। বোধহীন। নিজের লাগাম খসে গেছে নিজেরই হাত থেকে। এখন আমাকে নিয়ে যে কেউ যা খুশি করতে পারে। নিজেকে বেশ্যার মত মনে হয়। বেশ্যার রোগ শরীরে। আমি বেশ্যাই তো। আর কি! সারা রাত দীর্ঘশ্বাসের এপাশ ফিরি, দীর্ঘশ্বাসের ওপাশ ফিরি। পরদিন ময়মনসিংহে যাওয়ার জন্য বেরোই ছোট্ট গুমোট ঘরটি থেকে, ভোরের শীতল স্নিগ্ধ হাওয়া আমার শরীরের ক্লান্তি তুলে নেয় এক নিমেষেই। রুদ্র পেছনে দৌড়ে আসে, সেও যাবে আমার সঙ্গে ময়মনসিংহে।
তুমি কেন যাবে? পথে যদি বিপদ হয় রক্ষা করতে? কারণ তুমি আমার খুব মঙ্গল কামনা করো, তাই না? আমার শরীরে যেন কারও আঘাত না লাগে, আমার দিকে চোখ তুলে যেন কোনও পুরুষ না চায়, সে কারণে, তাই তো!
