ভোরের আলো ফুটলে বলি, আমি এক্ষুনি যাব।
রুদ্র তৈরি হয়। একবারও বলে না, আরও দুদিন থাকো বা কিছু। বাড়ির সবাই অবাক,কী ব্যাপার, হঠাৎ চলে যাচ্ছ যে।
রুদ্র ওদের বলে, ওর যেতে হবে। কেন যেতে হবে, তা কিছু বলে না। নাস্তা খেতে বলে ওরা, আমি না বলি।
লঞ্চের ভেতরে পেচ্ছাবের ঝাঁজালো আর মাছের আঁশটে গন্ধে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ক্রমাগত ভোঁ শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার গা গুলোয়, সারারাত জেগে থেকে কেঁদে ভোরের হাওয়া নিতে গিয়ে বমি করে ভাসাই লঞ্চের বারান্দা। রুদ্র লোকের ভিড়ে বসে পেছনে ঘাড় ফেলে ঘুমোচ্ছে, হাঁ হয়ে আছে মখু । এই লোকটিকে আমার চেনা কেউ বলে মনে হয় না। মনে হয় না এই মানুষটি আমার কেউ হয়।
লম্বা লঞ্চ যাত্রা, ততোধিক লম্বা রেল যাত্রা নিঃশব্দে ফুরোয়। রেল যাত্রা ফুরোলো নিঃশব্দে। সব জেনেও মৃত মনকে বারবার বলেছি, ও আসলে অন্য রোগ। অন্য ঘা।
যৌনাঙ্গে তো কত রকম ঘা হতে পারে। আমি কি আর সব জানি, এখনও ডাক্তার হওয়ার ঢের বাকি আমার। পরীক্ষা করে একবার দেখি না কেন ঘা- টি! হয়ত এমনও হতে পারে, এটি নতুন একরকম ভাইরাস রোগ। এমনও হতে পারে, রুদ্র আমার সঙ্গে মজা করছে বলে যে সে বেশ্যালয়ে গেছে, একাধিকবার গেছে। সে নিশ্চয় আমাকে একদিন চমকে দেবে বলে, যে সব মিথ্যে ছিল, যা সে বলেছে। আমাকে পরীক্ষা করেছে সে, কতটুকু তাকে বিশ্বাস করি, তার পরীক্ষা। রাত কাটিয়েছে, যেরকম রাত আমার সঙ্গে কাটাতে সে বার বার চেয়েছে।
ঢাকায় নেমে দেখি ঢাকা মখু থুবড়ে পড়ে আছে অন্ধকারের পায়ে। শহরটি এত প্রিয় আমার, এত প্রাণবন্ত শহরটিকে মনে হয় নিস্তেজ। রাতে মুহম্মদপুরে রুদ্রর ভাড়া বাড়িটিতে যাই।একটি পড়ো পড়ো তিনতলা বাড়ি, বাড়িটির দোতলায় রুদ্রর দুটো ঘর, একটি ঝুল বারান্দা, ঘরের বাইরে ছোট্ট একটি রান্নাঘর, আর করিডোর পেরিয়ে একটি মলমূুত্রগোসলের জায়গা, সেটি বাড়িঅলাও ব্যবহার করে, রুদ্রও। খুব বেশিদিন হয়নি সে এটি ভাড়া নিয়েছে। দুটো ঘরের একটি শোবার, একটি পড়ার। পড়ার ঘরে টেবিল চেয়ার আর বই রাখার একটি তাক, বইয়ে উপচে পড়ছে তাকটি। জায়গা নেই বলে বই মেঝেয়, ছড়িয়ে নয়, গোছানো। শোবার ঘরের বিছানাটিও গোছানো। রুদ্র খুব গোছানো মানুষ। বিছানা টেবিল আমার এরকম গোছানো হয় না। তাই নিজের জীবনটিকে বড় এলোমেলো বলি। রুদ্রও নিজেকে বলে এলোমেলো, গুছিয়েই যদি সে রাখে তবে কেন এলোমেলো? তবে কি তার নিয়নণ্ত্র হীন জীবনটিকে বোঝাতে সে এলোমেলো শব্দটি ব্যবহার করে! দুই জীবনে একটি শব্দের অ−র্থর কী ভীষণ পার্থক্য! আমাকে ঘরে রেখে রুদ্র বেরিয়ে যায় দুজনের জন্য খাবার কিনে নিয়ে আসতে। আমি মেঝেয় শুয়ে তাকের কিছু বই উল্টো দেখি। মোটা মোটা দুটো কবিতার খাতা তাকটির নিচে সাজানো। পাতা উল্টো যাই, এত কবিতা সে জীবনে লিখেছে! সবই গভীর প্রেমের কবিতা। কাউকে খুব সাংঘাতিক ভাবে ভালবাসতো রুদ্র। কে সে যাকে বলছে আমার গান আমার সকল কবিতা তোমার জন্যই লেখা। রুদ্র খাবার নিয়ে ফিরে এলে জিজ্ঞেস করি, কে এই রমণী যাকে জীবন উৎসর্গ করেছো?
করেছিলাম।
কে সে?
খুব কি জানার দরকার?
বলই না শুনি।
নেলি।
লালবাগে বসে কবিতাগুলো লেখা।
লালবাগে মামার বাড়ি। ওখানে ছিলাম। নেলি হচ্ছে আমার মামির বোন। ও বাড়িতেই থাকত।
মামির বোন হলে তো তোমার খালা হয়।
হ্যাঁ খালা হয়।
খালার সঙ্গে প্রেম করতে?
রুদ্র মাথা নাড়ে, করত। বয়সে যে তার চেয়ে অনেক বড় তার খালা সে কথাও বলে।
কেবল কি প্রেমই করতে? নাকি আরও কিছু?
আরও কিছু।
মানে শুয়েছো তোমার খালার সঙ্গে?
হ্যাঁ।
ও বাড়িতে যখন ছিলে, তখন তো ইশকুলে পড়তে। ওই ইশকুলে পড়ার সময়ই শুয়েছো?
হ্যাঁ, রুদ্র সেই ইশকুলে পড়ার সময়ই জীবনের সব সেরে নিয়েছে। ছোটবেলাতেই সঙ্গম শিখেছে।
উপদ্রুত উপকূলে পেছনে হলুদ বাড়ি পঞ্চাশ লালবাগ, নিবেদিত বকুল বেদনা নামের ওসব তাহলে নেলিকে নিয়ে লেখা?
হ্যাঁ।
আমি হেসে বলি, জানো, ওই বইয়ের কবিতাগুলো পড়ে আমি তোমার প্রেমে পড়েছিলাম, ভাবলে এখন হাসি পায়।
তা তোমার প্রেমিকা নেলি এখন কোথায়?
এক মাস্টারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। তালাক হয়ে গেছে। এখন লালবাগে আছে।
যাও না ওর কাছে? গিয়ে রাত কাটাও না ওর সঙ্গে? তোমার খালার সঙ্গে?
বাজে কথা বোলো না।
বাজে কথা বুঝি?
বাজে কথাই তো।
রুদ্রর চোখের ভেতর লাল রক্তের রেখা, সবুজাভ দাগ, চোখে এসব কি জিজ্ঞেস করাতে রুদ্র একবার বলেছিল, শ্যাওলা জমেছে। শ্যাওলা জমা চোখ রুদ্র আমার চোখে ফেলে রেখে অনেকক্ষণ, বলে,ও প্রস্তাব দিয়েছিল, রাজি হইনি।
কেন? তোমার তো কারও সঙ্গে এই সম্পর্কে যেতে কোনও বাধা নেই! রাজি হবে না কেন?
ওর সঙ্গে তো হৃদয়ের কোনও সম্পর্কে নেই, সম্পর্কে তোমার সঙ্গে।
বাহ, বেশ ভাল নীতি তোমার। যার সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক মানে যাকে ভালবাসো তার সঙ্গেই শোও শুধু হাসতে হাসতে বলি, তাহলে বেশ্যাদের কি কর? ভালবেসে ওদের সঙ্গে শুতে যাও?
রুদ্র কোনও উত্তর না দিয়ে উঠে যায়। দুটো কাপে পানি নিয়ে আসে। চল খেয়ে নি। খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। তাড়া দেয়।
তোমার খালাকে বিয়ে করলে না কেন? অবশ্য এখনো করতে পারো। শান্ত স্বর আমার।
অতীতের কথা টানছো কেন?
অতীত! কেবল তোমার অতীতেই ওসব ছিল। বর্তমানে তুমি শুদ্ধতম মানুষ, তাই না?
