একেবারে সিফিলিসের ঘা এর মত দেখতে। চোখ বলে, মন বলতে চায় না। কিন্তু সিফিলিস হওয়ার তো কোনও কারণ নেই। তবে কি হতে পারে এটি! দু ভুরুর মাঝখানে ভাঁজ পড়ে আমার।
আচ্ছা, তোমার কি কোথাও কোনও মেয়ের সঙ্গে কোনও রকম সম্পর্কে হয়েছে।
আবোল তাবোল কি বলছ তুমি!
রুদ্র লুঙ্গি ওপরে তুলে নেয়। ঘা ঢেকে যায়।
শুয়ে পড় তো। অনেক রাত হয়েছে।
রাত হোক, আমার নিদ্রা উবে গেছে। এই ঘাটির কারণ জানার জন্য আমি উদগ্রীব। কোনও রকম মেলামেশা ছাড়া এমন একটি ঘা কেন হতে যাবে!
তোমার বাবাকে দেখিয়েছো?
না।
দু সপ্তাহ ধরে এটি, কোনও ডাক্তারের কাছে গেলে না কেন?
যাইনি।
পরীক্ষা না করে মলম লাগালে ঘা তো যাবে না।
রুদ্র তার দাড়ি চুলকোতে থাকে। কিছু নিয়ে খুব ভাবলে সে এই করে।
আমি হঠাৎ বলি, জানো, প্রস্টিটিউটদের সঙ্গে রিলেশান হলে এরকম ঘা হয়। তুমি নিশ্চয়ই কোনও প্রস্টিটিউটের কাছে যাওনি! প্রশ্ন করি।
না। রুদ্রর বরফ-কন্ঠ।
সত্যিই তো তুমি যাওনি? এই প্রথম তো আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক, তাই না!
রুদ্রর মখু টি হঠাৎ বদলে যায়। কালো ভুরু দুটো জড়ো হতে থাকে। যেন তার যন্ত্রণা হচ্ছে শরীরে কোথাও। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে আমার চোখে। চেষ্টা করেও আমি পড়তে পারি না তার চোখের ভাষা।
অনেকক্ষণ নীরব বসে থাকি দুজন। হঠাৎ রুদ্র বলে, আসলে কি জানো, আমি পাড়ায় গিয়েছি।
পাড়া মানে?
বেশ্যাপাড়া।
গিয়েছো? কেন?
যে কারণে লোকেরা যায়।
কি কারণে?
রুদ্র কথা বলে না। আমার মাথাটি কি ঝিমঝিম করছে? বুকের মধ্যে কি হুড়মুড় করে একটি শ্বাসকষ্ট ঢুকে গেল? শব্দগুলো আগের চেয়ে ধীরে উচ্চাজ্ঞরত। স্বরটি ভাঙছে, কাপঁছে।
কোনও প্রস্টিটিউটের সঙ্গে শুয়েছো?
কথা বলছে না। তার চোখদুটো পাথর হয়ে আছে।
বল, বলছো না কেন, বল।
আমার দুচোখে আকুলতা, বল না, তুমি না বল রুদ্র। না বল। একটি না শব্দের আশায় আমি মোহগ্রস্তের মত বসে থাকি।
হ্যাঁ। রুদ্র বলে।
কি, সেক্সুয়াল রিলেশান হয়েছে?
নিজের স্বরকে আমি চিনতে পারি না, যেন এ আমার কণ্ঠস্বর নয়, অন্য কারও। যেন একটি যন্ত্রে বোতাম টিপে দেওয়া হয়েছে, যন্ত্রটি কথা বলছে।
হ্যাঁ।
আলো জ্বলছে ঘরে, অথচ অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে আমার চোখের সামনে। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। অনেকক্ষণ আমি কোনও নিঃশ্বাস নিতে পারি না। আমার সামনে এ কি কোনও যৌনরোগী, নাকি এ রুদ্র! আমার প্রেমিক, আমার স্বামী! আমার বিশ্বাস হয় না এ রুদ্র, বিশ্বাস হয় নার এর সঙ্গে আমার বছর বছর ধরে প্রেম।
গিয়েছো কবে?
এই তো দু সপ্তাহ আগে।
একবারই গিয়েছো?
হ্যাঁ।
আর কোনওদিন যাওনি?
না।
তোমার ঘা তো দু সপ্তাহ থেকে!
হ্যাঁ।
যেদিন সম্পর্কে হয়েছে, সেদিনই তো ঘা হয় না। হতে কিছু সময় নেয়। মনে করে দেখো একবারের বেশি আরও গিয়েছো কি না।
রুদ্র আমার চোখের দিকে অনেকক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে ধীরে বলে, আরও গিয়েছি।
নিজের কানকে বিশ্বাস হয় না। আমার বিশ্বাস হতে চায় না যে আমি রুদ্রর জীবনে প্রথম মেয়ে নই! অনেকক্ষণ ওভাবেই নিস্পন্দ বসে থাকি।
আমাকে তো কখনও বলনি এসব?
বলিনি।
কেন বলনি?
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে জানি না কি দেখে সে, কোনও উত্তর দেয় না।
বেশ্যপাড়া, তাই না? কোথায় সেটা?
বানিশান্তায়।
বানিশান্তা কোথায়?
এই বন্দরেই।
কেন যাও? তুমি না আমাকে ভালবাস?
ভাল তো বাসিই।
ভালবাসলে অন্য কাউকে ছুঁয়েছো কি করে? আমাকে এতদিন তুমি মিথ্যে কথা বলেছ, বলেছ তুমি আমাকে ছাড়া আর কাউকে স্পর্শ করনি কোনওদিন। জানো, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না এসব কিছু।
আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় রুদ্র অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে শুয়েছে, যেভাবে আমার সঙ্গে সে শুয়েছে। যেভাবে আমার মুখে বুকে চুমু খেয়েছে সেভাবে আর কাউকে খেয়েছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় রুদ্র আর কারও গভীরে প্রবেশ করেছে এমন। মনে হতে থাকে মাঝসমুদ্রে আমার তরীটি ডুবে গেছে। আমি ডুবে যাচ্ছি, যতদূর চোখ যায়, কেউ নেই, কিছু নেই। আমি একা, আমি ডুবছি। আমার আকাশ ভেঙে পড়েছে, আমার জগতটি খণ্ড খণ্ড হয়ে ছিটকে পড়েছে, ছিটকে পড়া টুকরোগুলো গড়াতে গড়াতে সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে। কূলকিনারাহীন উত্তাল সমুদ্রে খড়কুটো নেই, আমি ডুবছি। আমি যেন আমি নই, অন্য কেউ। সেই অন্য কেউএর জন্য আমার কষ্ট হতে থাকে। কষ্টটি আমার স্নায়ুতন্ত্রে্র পাক খেয়ে খেয়ে নামতে থাকে বুকে। বুকের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত পাথর এসে যেন চাপ দিচ্ছে। কোনও শব্দ উচ্চারণ করার সামথর্ আমার নেই। আমি বোধবুদ্ধি হারিয়ে হু হু করে কাঁদি, সারারাত কাঁদি। চোখের জলে ভিজে যেতে থাকে আমার বালিশ, শাড়ি, বিছানার চাদর। রুদ্রর হাত ধরে পা ধরে আমি কাঁদি, বল বল যে তুমি মিথ্যে কথা বলেছো। বল যে তুমি কারও কাছে যাওনি। কারও সঙ্গে শোওনি। বল বল।
পাথরের মত স্তব্ধতা রুদ্রর। ফ্যাকাসে মুখে সে আমার কান্না দেখে সারারাত।
কান্না দেখে সে সকাল, দুপুর, বিকেল। না খাওয়া না নাওয়া আমার কান্না দেখে সে সারাদিন। নিজে সে নায়, খায়। নিজে সে আর দিনের মত যাপন করে দিন। ঘুমোতে চাই, সব ভুলে ঘুমোতে চাই। কিন্তু ঘুম তো আসছে না। ঘুমের ওষধু চাইলে তার বাবার ডাক্তারখানা থেকে রুদ্র দু পাতা সিডাক্সিন এনে দেয়। খুঁজে দু পাতা পেয়েছে, দু পাতাই দিয়েছে। দু পাতার কুড়িটি বড়ি থেকে একটি বড়ি শুধু তুলে নেব। একটি বড়ি শুধু খাব, এরপর মোট কুড়িদিন যেন বড়ি খেয়ে ঘুমোতে পারি। কিন্তু বড়ি যখন রুদ্রর আড়ালে আমি কুড়িটিই একবারে খেয়ে নিই, সেদিনই, সেই বিকেলে, আমি দূরে চলে যাবো তবু আমারে দেব না ভুলিতের কোনও সুর আমার ভেতর ছিল না, চাচ্ছিল!ম দূরে চলে যেতে, আমাকে রুদ্র ভুলে যাক, কখনও আর মনে না করুক আমি নামে কেউ ছিল তার জীবনে। নিজের এই অস্তিত্বকে আমার আর মোটেও মনে হচ্ছিল না আমি বহন করতে পারব, মনে হচ্ছিল না যে আমার জীবনের কোনও মূল্য আর আছে। মনে হচ্ছিল না তীব্র এই কষ্টগুলো নিয়ে তীব্র এই অপমানগুলো নিয়ে আমি আর একটি মুহূতর্ও বাচঁ তে পারব বেশি। কাঙিক্ষত মৃত্যুর দিকে আমি যখন দৌড়ে যাচ্ছি, আমাকে পেছন থেকে খামচে থামাল কেউ। যখন ফিরিয়ে আনা হল ওই পথ থেকে দেখি শক্ত নল আমার নাকে, পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রুদ্রর ডাক্তার বাবা। বিষ বের হল শরীর থেকে, কিন্তু মন থেকে একফোঁটা বিষ বের হয়নি, মন মরতে থাকে। আমার চোখের সামনে মৃত্যুযনণ্ত্রায় কাতরাতে থাকে মন। সারারাত মৃত মনকে পাশে নিয়ে নির্ঘুম কাটাই।
