আমি সরাইতাম কেন?
সুহৃদের পট সরাও না?
সরাই।
তাইলে শুভর পট সরাইতে পারবা না কেন?
শুভর পট সরাইতাম ক্যা?
কেন শুভর পট সরাইতে পারো না?
পারি না।
পারি না কইলেই হইব নাকি? পারতে হইব।
পারতে হইব না।
পারতে হইবই।
পারতে হইবই কেন? শুভর কাজের ছেড়ি আছে না? ঝর্ণা কি করে?
সুহৃদের তো নার্গিস আছে। তাইলে তরাও ত সুহৃদের পট সরাস। তরা ত সুহৃদের চাকর।
হ চাকর। সুহৃদের চাকর হইছি ভালা হইছে।
শুভরও চাকর হইবি।
কেন হইতাম?
হইতে হইব।
তুই কইলেই হইতে হইব?
হ। আমি কইলেই হইতে হইব।
কি কইলি?
যা কইলাম, কইলাম।
আবার ক।
সুহৃদের গু খাইতে পারস, শুভর গু ও খাইতে হইব।
ইয়াসমিন এবার লাখি মেরে শুভর পটটিকে ফেলল উঠোনে।হাসিনা উড়ে এসে ইয়াসমিনের চুল টেনে বলল, যা পট তুইলা আন। ইয়াসমিনও হেঁচকা টান দিয়ে হাসিনার চুলে বলল, তুই আন।
আমি শব্দ শুনে নাড়ি নক্ষত্র থেকে উঠে দরজায় দাঁড়িয়ে এই চুলোচুলি দেখেই শরীর গলিয়ে ইয়াসমিনকে ছাড়িয়ে আনতে গেলাম। তিন জনে ধস্তাধস্তি। এর মধ্যে কোত্থেকে উড়ে এসে স্যুটেড বুটেড দাদা ঝাঁপিয়ে পড়লেন আমার আর ইয়াসমিনের ওপর, ইয়াসমিনের চুল শক্ত মুঠিতে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে ফেললেন উঠোনের মাঝখানে যেখানে শুভর পট উল্টো পড়ে আছে। হাসিনা দৌড়ে গিয়ে পড়ে থাকা ইয়াসমিনের মখু বুক খামচে পিঠে ধড়াম ধড়াম কিল বসাতে শুরু করেছে। ইয়াসমিন খোয়ার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেয়ে চাইছে হাসিনাকে ওই পটের ওপর ফেলতে। হাসিনা দুহাতে ওর মখু ঠেসে ধরে পটের ওপর, মখু সরিয়ে ইয়াসমিন খামচি দিয়ে ধরে হাসিনার পা, টেনে ফেলতে চায়, পারে না। দাদা এবার লাথি বসালেন ইয়াসমিনের ঘাড়ে। ক্রমাগত। লাথি ঘাড়ে পিঠে নিতম্বে, উঁরুতে। ইয়াসমিন হাত ছুটে যায় হাসিনার পা থেকে। লাথি খেয়ে কুণ্ডুলি পাকাতে থাকা ইয়াসমিনের মুখের ওপর হাসিনা উপুড় করে ধরে পট। ওর মুখে লেপ্টে থাকে শুভর গু। এই নৃশংস কাণ্ড দেখে আমি হাঁ হয়ে আছি। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না এ আমাদের দাদা! এর মধ্যে আরোগ্য বিতান থেকে শুভর জন্য আলাদা করে বাবার পাঠিয়ে দেওয়া দশটি মুরগি হাতে সালাম দাঁড়িয়ে থাকে বারান্দায়, হতবাক সালাম উঠোনের নৃশংস দৃশ্যটি দেখে। দেখল। আমার পক্ষে হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখা সম্ভব হয় না আর, ইয়াসমিনকে ছাড়িয়ে আনতে ছুটে যাই, পারি না, আমার পিঠেও কিল পড়ে, আমার চৃুলেও শক্ত টান পড়ে। ইয়াসমিনের সারা শরীরে তখন দাদা আর হাসিনার শক্ত শক্ত লাথি। ইয়াসমিন কাঁদে না। ওর চোয়াল শক্ত হতে থাকে। আমি অসহায় বসে থাকি ইয়াসমিনের পাশে। আমাদের দুজনের গা ধুলোয় গড়াতে থাকে।
এই ঘটনার পর দাদা আর হাসিনার সঙ্গে আমি কথা বলা বন্ধ করে দিই।
মা বাড়ি এলে সব শুনে এ ঘর ও ঘর হাঁটেন, খামোকা হাঁটেন, বলতে বলতে, এর শইলডা হিংসায় ভরা। সুহৃদরে সহ্য করতে পারে না। কবে যেন বিষ খাওয়াইয়া ছেড়াডারে মাইরা ফেলব।
বাবা ঘটনা শুনে কোনও রা করলেন না।
বাবার চপু হয়ে থাকায় মা চেঁচিয়ে বলেন,মেয়ে দুইডারে যে ছেলে তার বউরে নিয়া মাইরা শেষ কইরা রাখল, সব শুইনাও কোনও কিছু করতাছেন না! ইয়াসমিন তো শইল নড়াইতে পারে না, হাড্ডিগুড্ডি ভাইঙা থইছে মাইরা! আমি সুহৃদরে দিয়া দেই কামালের কাছে। এ হইল ওগোর শত্রু। ছেড়াডারে এই বাড়িতে পালা হইতাছে, এইডাই ওগোর সহ্য হয় না। আপনে থাকেন আপনার ছেলে আর ছেলের বউরে নিয়া। আমি কোথাও যাই গা। কী ছেলে জন্ম দিছিলাম রে খোদা, আপন বইনদেরে মারে, তাও আবার বউরে নিয়া।
বাবার নৈঃশব্দের মধ্যেও মা চেঁচান, নাসরিন ইয়াসমিন, তরা ছেলে দেখ, বিয়া টিয়া কইরা এই বাড়ি থেইকা তাড়াতাড়ি যা। বাপেও তার ছেলেরে আশকারা দিব তোদেরে মাইরা লুলা বানাইতে।
মার এসব কথার উত্তর কেউ দেয় না।
এর সাতদিন পর, গুমোট বাড়িটিতে দাদা জানিয়ে দিলেন যে তিনি বদলি হয়েছেন বগুড়ায়। বাবা দাদাকে ডেকে পাশে বসিয়ে বললেন, বগুড়ায় কেন?
আমি কি জানি! কোম্পানী বদলি করল। দাদার উদাস উত্তর।
বগুড়া কোনও একটা জায়গা হইল যাওয়ার? বগুড়ায় কি আছে?
মহাস্থান গড় আছে।
মহাস্থানগড় দিয়া তুমি কি করবা?
বগুড়ার দই তো ভাল।
তা কি দই এর লোভে যাইতাছ নাকি?
বদলি হইছি বইলা যাইতাছি।
বাড়িঘর ফালাইয়া দূর দেশে কই থাকবা, কী খাইবা!
দাদা উঠে যান, বাবা বসেই থাকেন। মা তাড়া দেন, ভাত বাড়া আছে, খাইয়া লন।
বাবার সে রাতে আর খেতে ইচ্ছে হয়নি। তিনি দুহাতে মাথার চুল খামচে ধরে বসে থাকেন।
দাদার বদলি হওয়াতে সবচেয়ে যে বেশি খুশি হয়েছে এ বাড়িতে, সে হল হাসিনা। হাসিনা গুনে গুনে কাচের বাসন, চামচ এসব বাক্সে ভরল। কালো ফটকের সামনে চেয়ার পেতে বসে পা নাড়তে নাড়তে, বাড়িতে যত আসবাব ছিল দাদার, হিশেব করে ট্রাকে তুলল। টেলিভিশনটিও।
দাদারা চলে যাবার পর ঘরগুলো হঠাৎ ন্যাংটো হয়ে গেল। এক কোণে পড়ে আছে রং ওঠা পুরোনো বেতের সোফা আর কয়েকটি ছালওঠা চেয়ার, দেয়ালে চৌকোনা দাগ, আর কটি বাঁকা তারকাঁটা।
প্রায়ই লক্ষ করি বারান্দায় একলা বসে থাকেন মা, সন্ধের দিকে। হু হু বাতাসের নাকি মার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে ঘরে, ঠিক বুঝি না। সন্ধেয় বাতি জ্বলে ঘরে ঘরে, মা বসেই থাকেন একা অন্ধকারে, মার হাতে তসবিহটি ঝুলে থাকে, নড়ে। ঘর ছেড়ে জড়ত্ব ঝেড়ে উঠোনে নেমে কোনও কারণ ছাড়া হাঁটতে থাকি এক সন্ধেয়।
