মা, বাইরে বইসা রইছ কেন? ঘরে যাও।
মা শব্দ করে শ্বাস ফেলে বলেন, নোমানডা রাগ কইরা বাড়ি থেইকা চইলা গেল! ঘরের ছেলে যদি ঘরে না থাকে তাইলে কি ঘরে থাকতে ইচ্ছা করে!
নোমান নোমান কর কেন? আমরা আছি না? নাকি আমরা কেউ হই না তোমার!
মেয়েরা তো বিয়া হইলে পরের বাড়ি চইলা যায়।
আমি তেতো গলায় বলি, তোমার ছেলেরাই তো পরের বাড়ি গেছে গা। মেয়েরাই রইছে।
মেয়েরা আইজ আছে, কাইল নাই। মা বলেন।
তোমার ছেলেরা তো আইজও নাই। কাইল তো নাই ই।
মা চপু হয়ে যান।
বারান্দার কাপড় শুকোনোর দড়িতে দুহাত রেখে সামনে পেছনে দুলতে দুলতে উঠোনের অন্ধকারের দিকে চেয়ে বলি, এত যে ছেলে ছেলে কর, দুইটা ছেলেই তো দূরে সইরা গেল।
হ সব গেল গা। এখন বউই তাদের কাছে আপন। বাপ মা ভাই বোন কিছু না। মা মিহি গলায় বলেন।
আমি ভেতরে ঢুকে যাই। শীতল নিস্তব্ধতা জুড়ে বসে থাকি। ইয়াসমিন পড়ে পড়ে ঘুমোয় কেবল। আনন্দমোহনে যাচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু বাড়িতে বই পত্তরের কোনও খোঁজ নেই। দেবনাথ পণ্ডিতকে বাড়ি এসে ইয়াসমিনকে পড়াতে বলেছিলেন বাবা, তিনি রাজি হননি। রাজি হননি কারণ ছাত্রছাত্রীসংখ্যা এত বেশি তাঁর যে একা কারও জন্য তাঁর সময় দেওয়া সম্ভব নয়। একমাত্র তিনি গ্রুপে পড়াতে পারবেন। ইয়াসমিন দেবনাথ পণ্ডিতের বাড়িতে গ্রুপে পড়তে যায়, ফিরে এসে খাতা বই ছুঁড়ে দিয়ে বলে, কি পড়ায় কিচ্ছু বুঝি না! বাড়িতে বই নিয়ে বসার নাম গন্ধ নেই। নিথর বাড়িটিকে চমকে দিয়ে আমি চেঁচাই, ইয়াসমিন পড়তে ব। ইয়াসমিন পাশ ফেরে শোয়। আবারও চেঁচাই, ওঠ, পড়তে ব। ইয়াসমিন চেঁচিয়ে থামায় আমার চেঁচানো। ওর কি করতে হবে না হবে, ও নিজে ভাল বোঝে, কারও পরামর্শ দেওয়ার দরকার নেই। আমাকেও ও দূরে সরিয়ে রাখে। আমার সঙ্গী হয় একটি শাদা বেড়াল। একটি শাদা বেড়াল আমার সঙ্গী।শাদা একটি বেড়াল আমার সঙ্গী। সঙ্গী শাদা বেড়াল। বেড়ালই ভাল। মানুষের চেয়ে সহস্রগুণ ভাল। বেড়ালটিকে আমি বুকে জড়িয়ে বসে থাকি। এ বাড়িতে নর্দমার ফাঁক গলে অথবা পাঁচিল পেরিয়ে বেড়াল আসে, বেড়ালেরা তক্কে তক্কে থাকে সুযোগ বুঝে রান্নাঘরে ঢুকে পাতিলে মখু দেয়। যে বেড়ালই আসে, মা তাড়িয়ে দেন। সব বেড়াল নাকি চোরা বিলাই। তাড়ালে চলে যায়, আবার আসে। এই শাদা বেড়ালটি যখন এসেছিল, একেও তাড়ানো হয়েছিল, কালো ফটকের ওপারে নর্দমায় ফেলে আসা হয়েছে, বেড়ালটি পরিষ্কার হয়ে এ বাড়িতে চলে এসেছে আবার। শেষে বেড়ালটিকে নিয়ে নতুনবাজারের কাঁচাবাজারের জটলায় ফেলে আসা হল, পরদিন দেখি উঠোনের রোদে বেড়ালটি শুয়ে আছে। এবার বাবার আদেশ, একে বস্তায় পুরে নদীর ওপারে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। তাই করা হল। সালাম একটি বস্তায় বেড়ালটিকে পুরে বস্তার মখু দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে নৌকো ভাড়া করে ব্রহ্মপুত্রের ওপারে গিয়ে কাঁটা ঝোপের মধ্যে ফেলে দিয়ে এল। বাড়িতে সকলে জানে, বেড়াল আর ফিরবে না, কোনও কারণ নেই ফেরার। সাতদিন পার হয়েছে, বেড়ালের কথা ভুলেই গেছে সবাই। কিন্তু হঠাৎ দেখি বেড়ালটি বিকেলবেলা কালো ফটকের সামনে সজল চোখে দাঁড়িয়ে আছে, আমি আয় আয় বলে ডাকতেই দৌড়ে ও চলে এল আমার কাছে। রান্নাঘরে নিয়ে পাতিলের তলায় যেটুকু ভাত ছিল দিই। হাভাতের মত খেয়ে বেড়ালটি আমার পেছন পেছন, যেখানেই যাই, যেতে লাগল। সেই থেকে এ বেড়ালটিকে আমি আর কাউকে দিই না কোথাও ফেলে আসতে। থেকে গেছে এ বাড়িতে, রাতে বিছানায় আমার পায়ের কাছে ঘুমোয়। চেয়ারে বসলে লাফিয়ে আমার কোলের ওপর এসে বসে। বেড়ালটি ভাত আর মাছের কাঁটাকুটো খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে এ বাড়িতে। আমি খেয়ে পাতে সামান্য রেখে দিই বেড়ালটির জন্য। মাকে লুকিয়ে আমার নিজের ভাগের মাছের টুকরো থেকে কিছুটা ওর ভাতে মিশিয়ে দিয়ে দিই। বেড়ালটিকে বুকে জড়িয়ে আমি বসে আছি আমার ঘরে। অন্য ঘরে, যেটি একসময় ছোটদার ঘর ছিল, অসময়ে ইয়াসমিন ঘুমোচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে ভাত খেয়ে আবার ঘুমোবে সে। যেন ঘুমের মত এত সুখের জিনিস পৃথিবীতে আর নেই। ওর ঘাড়ের হাড়ে ব্যথা, পিঠের হাড়ে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা। দাদা আর হাসিনার নৃশংসতা ওকে এই অসখু গুলো দিয়েছে। ইয়াসমিনকে নিয়ে হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। মেডিসিনের অধ্যাপক প্রভাকর পুরকায়স্থকে দেখিয়েছি, তিনি ওর বুকে স্টেথোসকোপ বসাতে গিয়ে বারবারই চাপ দিচ্ছিলেন স্তনে। ও প্রভাকরের ঘর থেকে মুখে বিরক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসে। এরপর ওর হাঁটুর ব্যথা এমনই তীব্র হয়ে উংল যে হাঁটু নিয়ে ও আর উঠতে বসতে পারছিল না। সেই হাঁটু পরীক্ষা করতে দাড়িঅলা হারুনুর রশিদ খানের কাছে যাই, তিনি হাড়ের ডাক্তার, কেবল ডাক্তার নন, রীতিমত অস্থিবিদ্যা-বিভাগের প্রধান। ইয়া লম্বা দাড়ি মুখে, মাথায় টুপি, পরনে পাজামা পাঞ্জাবি। কোনও অধ্যাপককে এই লেবাসে দেখে অভ্যেস নেই আমার। লেবাস যেমনই হোক, ডাক্তার ভাল তিনি। আমাকে চেনেন তিনি, আমার বাবাকেও। বাবা যখন হাসপাতালে ছিলেন, বাবাকে একটি তাবিজ দিয়ে এসেছিলেন বালিশের নিচে রাখতে। ওটি নাকি অসখুৃ ভাল করার ওষধু ।সেই ফর্সা লম্বা দাড়িঅলা ভাল ডাক্তার অস্থিরোগ চিকিৎসায় এক নম্বর তাবিজ কবজে আল্লাহ রসুলে বিশ্বাসী ইয়াসমিনকে তাঁর চেম্বারের রোগি দেখার টেবিলে শুইয়ে দিয়ে পর্দা ঢেকে দিয়ে ওর হাঁটু টিপতে টিপতে হাঁটু থেকে হাত ওপরে নিতে নিতে তলপেট -পেট টিপে টিপে বুকে গেলেন। বুক টিপে বাইরে থেকে ফুসফুস বা হৃদপিণ্ডের অস্তিত্ব বুঝতে চাইলেন কি!ইয়াসমিন বের হয়ে আমাকে শুধু বলল, আমারে আর কোনওদিন কোনও ডাক্তারের কাছে নিও না। আমার অসখু ভাল হওয়ার দরকার নাই। আমার অনেকবার ইচ্ছে হয়েছে হারুনুর রশিদ খানের কাছে জিজ্ঞেস করি, আমার বোনের হাঁটু পরীক্ষা করার কথা ছিল আপনার, বুক পরীক্ষা করার নয়। বুকে কি ছিল পরীক্ষা করার? ইচ্ছে হয়েছে প্রভাকর পুরকায়স্থকে বলি, আপনার তো কোনও পারকিনসনস রোগ হয়নি যে বুকে স্টেথেসকোপ বসালে হাত বার বার সরে যায় চাকতি থেকে! ইচ্ছে হয়েছে, পারিনি। গলার কাছে শব্দগুলো কষ্ট হয়ে বিধঁ ছিল, বেরোতে পারেনি।
