বাবা ঠাণ্ডা গলায় বলেন, তোমার বাপেরে যে পায়েস খাওয়াইতাছ, তার ত ডায়বেটিস!
একটু খাইলে কিμছু হইব না। বাজান মিষ্টি খাইতে পছন্দ করে।
আমি নাড়ি নক্ষত্রে। নাড়ি নক্ষত্র থেকে উঠে যেই না মার শরবতের কিনারা করতে পেশাবখানায় যাচ্ছি, দেখি মা দরজা ধরে বসে আছেন।
কি? রক্ত গেছে পাইলসের।
হ।
মা ওই রক্ত যাওয়া শরীরেই উঠে সুহৃদের দুধের বোতল ফুটোনো পানিতে ধুতে শুরু করেন। বোতলে দুধ ভরে, সুহৃদকে ফুটফুটে এক রাজকুমারের গল্প বলতে বলতে দধু খাওয়াবেন মা। দুধ খাওয়ানো শেষ হলে বনবাসী এক রাজকুমারীর গান শোনাতে শোনাতে ঘুম পাড়াবেন। সে রাতে বাবা ফিরলে বলবেন, পাইলসের কোনও চিকিৎসা নাই? রক্ত যা আছে শইলে, সব তো গেল গা!
বাবা উত্তর দেবেন না। একবার আমার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে যাবেন নাড়িনক্ষত্র নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি নাকি কবিতা লিখছি নাকি প্রেমপত্র!
মা কাতরকণ্ঠে বলতে থাকবেন, আমার তো একটু দুধ খাওয়া দরকার। একটা কলা অন্তত দিনে। একটা ডিম। এইভাবে রক্ত গেলে শইলে তো আর কিছু থাকব না। আমার জন্য এক পোয়া কইরা দধু দিতে কই ভাগীর মারে?
বাবা এসবের উত্তর দেবেন না।
সুহৃদ হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। চারপাশে রাজ্যির খেলনা নিয়ে খেলতে শিখেছে। সুহৃদের প্রতিটি উত্তরণে আমার আর ইয়াসমিনের আনন্দ উপচে ওঠে। আমরা কাড়াকাড়ি করি ওকে কোলে নিতে। ওকে নিয়ে বেড়াতে। ওকে দোলাতে। সুহৃদকে কোলে নিয়ে বারান্দার দোলনায় দোলাচ্ছি।
দাদা বারান্দায় বসে গলা ছেড়ে গান গাইছেন, হাড়ের ঘরখানি চামড়ার ছাউনি বান্ধে বান্ধে জোড়া। টাঙ্গাইলের রাস্তায় এক ভিখিরিকে গানটি গাইতে দেখে শিখেছেন। হাসিনা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খেঁকিয়ে ওঠে, গান গাইলে চলব! শুভর মুরগি নিয়া আস।
দাদা গান থামিয়ে বলেন, মুরগি নাই?
না নাই। শুভর মুরগি নাই।
একদিন মুরগি না খাইলে কিছু হইব না মুমু।
হাসিনার গলা চড়ে, দাঁড়কাকের কর্কশতা গলায়, কিছু হইব না মানে! বাড়িত ত আরেকটা বাচ্চা আছে, কেমনে ফু পাইড়া পালা হইতাছে দেখতাছ না! তুমার বাচ্চার বেলায় এত অবহেলা কেন! নাতি কি একটাই নাকি? শুভ কি নাতি না?
মুরগি নাই কও কেন? ওই তো উঠানে মুরগি হাঁটতাছে।
হাসিনার চোখ থেকে আগুনের ফুলকি ওঠে।
বাচ্চা-মুরগি নাই।
ওই যে দেখ মুমু খাঁচার মধ্যে বাচ্চা মুরগি। জবো করতে কও।
ওইগুলা সুহৃদের, ভাল কইরাই ত জানো। তুমার ছেলের জন্য তো আর বাবা মুরগি কিন্যা রাখে নাই।
মা শব্দ শুনে বেরিয়ে এসে নাক গলান, বৌমা এই সব কি কও, সবসময় না তোমার শ্বশুর দুই বাচ্চার জন্য মুরগি কিনতাছে। সবসময় না দুইটা মুরগির সপু হইতাছে। সুহৃদের একটা, শুভর একটা। তোমার শ্বশুর তো দুই বাচ্চার জন্যই দধু ডিম সব কিনতাছে। শুভ সুহৃদ দুই জনই ত নাতি।
দুই জনই ত নাতি। তা ত জানি। কিন্তু এক নাতির দিকেই ত সবার নজর। শুভর দিকে কে ফিরা চায়! হাসিনা কড়মড়িয়ে ওঠে।
ফির্যা চায় না মানে! কি যে উল্ডা পাল্ডা কথা কইতাছ। সুহৃদের বাবা মা কাছে নাই। তাই ওরে দেখতে হয়।শুভ ত তার বাপ মার সাথেই আছে।
হাসিনা ঘরে গিয়ে শাড়ি পাল্টো, আমি পারভিন আপার বাসায় যাইতাছি, মা শুভরে দেইখা রাইখেন ত।
বলে গটগট করে পেছনে না ফিরে চলে যায়। মা তখন এক হাতে সুহৃদকে, আরেক হাতে শুভকে সামলাচ্ছেন।
দাদা বাকি গানটুকু গাইছেন।
হাসিনা প্রায়ই তার নকলে ফুপাতো বোন আসলে আপন বোন পারভিনের বাড়িতে যায়। কুসুমের বাড়িতেও যায়। কুসুম নিজের স্বামী, রেলওয়ে ইস্কুলের হেডমাস্টারকে ছেড়ে করিম নামের এক বিবাহিত ছেলেমেয়েঅলা লোককে বিয়ে করেছে। করিম দেখতে অনেকটা তরমুজের মত, গোলগোল। কুসুমও। গোলগাল তরমুজ দাদার বিয়ের পর প্রায়ই এ বাড়ি বেড়াতে এসে বলে যাইও, তোমরা বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াইয়া আইস। করিম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনটি একধরনের দেখাশোনার কাজ করে। একধরনের, কারণ না সে বোটানিস্ট, না মালি। বেড়াতে গিয়ে একদিন নানারকম ফুলের চারা নিয়ে এসে বাড়ির মাঠে মাটি কেটে পুঁতে দিয়েছি, হাজারি গোলাপ ফুটছে, তরতর করে বাড়ছে চেরি, এমন যে ছাদ ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাগানের শখ আমার হঠাৎ হঠাৎ হয়। একবার টিনের ঘরের কিনার ঘেঁষা বাগানে ধনে পাতা লাগালাম, প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে মাটিতে আঙুল বুলিয়ে হতাশ হয়ে যেতাম, এত দেরি করে যে এরা বড় হয়! গোলাপ গাছ লাগিয়ে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় একবার দেখে আসি ফুল ফুটেছে কি না, সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, গোলাপের কোনও চিহ্ন নেই, ব্যস উৎসাহ নিবে গেল। আর সব আগাছার মত গোলাপ গাছও বড় হতে লাগল, কলেজ থেকে একদিন ফিরে হঠাৎ চমকে উঠি দেখে ফুটে থাকা লাল গোলাপ। চেয়ে পাওয়ায় যত সখু , তার চেয়ে বেশি বুঝি না চেয়ে পাওয়ায়!
হাসিনা ফিরে এলে, বিকেলে, শুভকে তার মার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে সুহৃদকে সাজিয়ে গুজিয়ে মা নিয়ে গেলেন নানি বাড়ি, অনেক দিন ও বাড়ি যান না তিনি। বারান্দার গা ঘেঁষেই আমার ঘর, বারান্দার যে কোনও ফিসফিসও কানে আসে আমার, ইয়াসমিন বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে যখন বলছে, কি রে শুভর গুঅলা পটটা সকাল থেইকা বারান্দায় পইড়া রইছে, সরায় না কেন কেউ!
হাসিনা বারান্দার চেয়ারে পা তুলে বসেছিল, বলল,তুমি সরাও না কেন?
কী কইলা?
কইলাম তুমি সরাও না কেন? দেখতাছই যহন যে পটটা পইড়া রইছে।
