কও তাইলে যে আমার বিছানায় একটা মশারি লাগব, তারপর নতুনটা আমি লাগাইয়া আমারটা কাজের মানুষদের দিয়া দিই। সুফিরেও ত মশা কামড়ায়।
তর বাপেরে চিনস না! কিছুতেই কিছু কিনব না। টাকা পয়সা তো সব পাঠাইয়া দেয়। কাইলও রিয়াজউদ্দিন আইসা টাকা লইয়া গেছে।
সুহৃদ হঠাৎ ওয়াক করে উঠল, বমি।
মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে মার। পেটে কিচ্ছু থাকে না ছেলেটার, যা খাওয়াই তাই বমি কইরা ভাসাইয়া দেয়।
মা দুধের বোতল ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। নার্গিস সপু এনে নরম গলায় বলল, খালা, সপু টা কি এখন খাওয়াইবেন?
ফালাইয়া দে সপু । খাওয়াইয়া লাভ কি, সবই তো ভাসাইব।
জানি, মা যাই বলুন না কেন, নতুন উদ্যমে আবার সপু বা দধু খাওয়াতে শুরু করবেন, আবারও বমি করে ভাসাবে, আবারও খাওয়াবেন। মার অতি যত্নে ছেলেটি নাদুসনুদুস হচ্ছে।
ছোটদা গীতাকে নিয়ে যেদিন নাদুস নুদুসকে দেখতে এসে শহরে ঘুরে পিয়নপাড়া হয়ে সন্ধেয় বাড়ি ফিরে ফুরফুরে মন নিয়ে বলেন, কালকে চইলা যাইতে হইব, পরশুদিন ফ্লাইট আছে।
আইসাই যে যাই যাই করস, মা বলেন সুহৃদরে তো একটু কোলেও নিলি না।
কোলেই আসে না, কি আদর করাম!
মা, বাবা, আমার আর ইয়াসমিনের কোল ছাড়া আর কারও কোল সুহৃদের ভাল লাগে না। ওর নিজের বাবা মা এলে মুখ ফিরিয়ে রাখে। এতে ছোটদার আপত্তি না থাকলেও গীতার আপত্তি।
আমার পেটের ছেলে হইয়া আমার দিকে ফিরে না?
মা হেসে বলেন আমাদেরে দেখে তো চোখের সামনে, তাই। তুমি আরও ঘন ঘন আসবা, তাইলেই চিনব তোমারে।
সকালে ছোটদার নাস্তার জন্য ঘি এ ভাজা পরোটা আর খাসির মাংস করতে মা রান্নাঘরে ছোটেন।ছোটদারা বাড়ি এলে সখুাদ্যের আয়োজন হয়। যে ছোটদাকে বাবা ত্যাজ্যপুত্র করতে চেয়েছিলেন, সেই ছোটদাকে এখন কাছে বসিয়ে বাবা আমার, ছেলে আমার বলে আদর করে কাছে বসান। যে ছোটদা চুরি করে দাদার জামা পরতেন, সেই ছোটদার পরনের জামা দেখে দাদার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, বাহ! শার্টটা তো সুন্দর! আমার লাইগা এইরকম একটা শার্ট আইনা দিস তো! যে ছোটদা আমার কাছে এক টাকা দু টাকা ভিক্ষে চাইতেন, সেই ছোটদা বলেন, কী রে তর সেঁজুতির খবর কি!
খবর আর কী! ছাপানোর টাকা নাই।
দে তর পাণ্ডুলিপি দে। ঢাকা থেইকা ছাপাইয়া আইনা দিই।
সেই ছোটদা সেঁজুতির পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেলেন ঢাকায়, ছাপতে। পাণ্ডুলিপি তৈরিই ছিল। এ সেঁজুতিতে রুদ্রর কবিতা তো আছেই, এখন যৌবন যার ,যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় এর নিভৃত নির্জন কবি হেলাল হাফিজের আর পশ্চিমবঙ্গের কিছু কবির কবিতা। রুদ্রর এক বন্ধু মইনুল আহসান সাবের, নতুন গল্প লিখতে শুরু করেছে, চমৎকার গল্প লেখে, ওর একটি গল্প আর নিজের একটি গল্পও, এই প্রথম সেঁজুতিতে আমার গল্প, আর আনন্দমোহন কলেজের বাংলার অধ্যাপক শরফউদ্দিন আহমেদের কবিতার একাল সেকাল নিয়ে একটি প্রবন্ধ। এবার নিজে পঈচ্ছদ করিনি। শিল্পী দিয়ে করা। ছোটদার হাতে পাণ্ডুলিপি দেওয়ার আগে তড়িঘড়ি সম্পাদকীয় লিখে দিই, একেবারে নিরুৎসাহ ছিলাম। সত্য ও সুন্দরের এমন আকাল পড়েছে দেশে, সৃষ্টিশীল কিছু একটা করতে এক পা এগোলে দু পা পেছোতে হয়। আমার বাবা বলেন সেঁজুতি করে করে আমি নাকি আমার ভবিষ্যতের বারোটা বাজাচ্ছি। মা দুঃখ করে বলেন, মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেল। একেবারে নিরৎু সাহ ছিলাম, একজন বাড়িয়ে দিল সহযোগিতার হাত। আমার শৈশব আর কৈশোরের ভালবাসা। গোপনে গোপনে যার লেখা থেকে আমার কবিতার প্রেরণা। তার হাতে আমার শ্রম আর সাধনার ধন সেঁজুতি তুলে দিলাম আর আমার পরম বিশ্বাসটুকু দিলাম।
পরম বিশ্বাসের মর্যাদা ছোটদা রেখেছেন। দিব্যি সেঁজুতি ছেপে আনলেন। অবশ্য সে ঘরে আসতে আসতে তিন মাস পেরোলো। ছোটদা বললেন, ওই দাড়িঅলা বেডার কবিতা বাদ দিছি।
রুদ্রর কবিতাহীন সেঁজুতিটি দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। প্রথম কাজ রুদ্রর ঠিকানায় দশ কপি পাঠিয়ে দেওয়া। পেয়ে সে জানাল, আরও পঁচিশ কপি পাঠাতে। পঁচিশ কপির পর আরও চাইল। ময়মনসিংহেও সেঁজুতি বিলি হল। স্টেশন রোডের পত্রপত্রিকার দোকানে বিক্রি করতে দিলে বেশ বিক্রিও হল। সেঁজুতির পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে আবারও মন চায়। কিন্তু সময় কোথায়। লেখাপড়ার চাপ বাড়ছে। বাবা বললেন, এখন থেইকা যদি ফাইনালের জন্য প্রস্তুতি না নেস, তাইলে আর পাশ করা হইব না। বাবা কথা ভুল বলেন না। প্রতিবছর শেষ পরীক্ষায় আটকে যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। দুবারে গতি হচ্ছে না,এমন কি চারবারেও না। আমার এক ক্লাস ওপরের ছাত্র রাজিবকে বাবা বলেছেন আমাকে যেন তিনি তাঁর নোটখাতাগুলো পড়তে দেন। রাজিব মেডিকেলের সবগুলো পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছেলে, শিক্ষকদের আদরের ধন। এক কথায় চিকিৎসাবিদ্যার যে কথা বলা যায়, একশ কথায় তার নাড়ি নক্ষত্র তুলে ধরে লেখা খাতার সপ্তূ দিয়ে গেলেন আমাকে। নাড়ি নক্ষত্রে ঝুঁকে আমার বেলা ফুরোতে লাগল।
নানা আসছেন প্রায়ই দুপুরে। বারান্দার চেয়ারে বসে তিনি উঠোনের রোদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়ে থাকেন যতক্ষণ না মা এসে বারান্দার বা উঠোনের রোদে পিড়ি পেতে বসিয়ে নানার ফর্সা শরীরটিকে মেজে গোসল করাতে ডাকেন। মার নাভিশ্বাস ওঠে সংসার সুহৃদ সামলাতে। তারপরও নানা এলে নানাকে রোদে বসিয়ে শরীর মেজে গোসল করিয়ে বাবার একটি ধোয়া লুঙ্গি পরিয়ে শুইয়ে রাখেন। নানা বাচ্চা ছেলের মত ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠলে মা ভাত এনে দেবেন খেতে, ভাতের পর পায়েস। নানার পায়েস খাওয়ার মধ্যে বাবা চলে আসেন। মা অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, বাজান তো এই বাড়িতে আসেই না, আসলেও তো কিছু খায় না। কত কইয়া একটু পায়েস খাইতে দিলাম।
