দাদা চপু হয়ে থাকেন। সম্ভবত দুনিয়া বোঝার চেষ্টা করেন।
খসখসে কণ্ঠটি উঁচুতে ওঠে।
যাও,বাচ্চার পাউডার লাগবে, পাউডার নিয়া আস।
কি কও মুমু পাউডার না কালকে আনলাম!
বাজে পাউডার। মুখ খসখস করে। জনসন আনো।
জনসন বেবি পাউডার বাজারে যা পাওয়া যায়, তা নকল। ময়দা ঢুকাইয়া রাখে কৌটায়। তিব্বত পাউডারই ভাল।
আরে কি আশ্চর্য, দেশি জিনিস ব্যবহার করব নাকি শুভর জন্য? তোমার কি মাথা খারাপ? আরেকটা বাচ্চার যত্ন ত চোক্ষের সামনেই দেখতাছ? কোনও দেশি জিনিস ব্যবহার হইতাছে ওই ঘরে?
কামালের মত বিদেশ গেলে না হয় বিদেশি জিনিস আনতে পারতাম। সেদিন পয়জন সেন্ট কিনলাম, মেইড ইন ফ্রান্স, শালার বোতলের মধ্যে নুরানি আতর ভইরা রাখছে। এই যে ফেরিওলারা খালি শিশি বোতল কিনতে আসে, ওরা কি করে জানো, শিশি বোতল গুলা নিয়া না বেইচা দেয় জিঞ্জিরায়, জিঞ্জিরায় সব তো দুই নম্বর মাল জানো তো!
অর্ধেক খরচ হওয়া জনসন পাউডারের একটি কৌটো হাসিনার দিয়ে মা বললেন আমার চাইর পুলাপান বড় হইছে দেশি পাউডারে, শইলের চামড়া দেইখা পাড়ার মানুষে কইছে, কী মাখ যে চামড়া এত সুন্দর?
হাসিনা পাউডারের কৌটো নেয় না। অর্ধেক ছাড়া পুরো নেই, মা কথা দেন পরের বার ছোটদা এলে তিনি শুভর জন্য বিদেশি পাউডার আনতে বলবেনই। পাউডারের ঘটনার দিনই ইয়াসমিন কলেজ থেকে ফিরে হাতের কাছে ঝর্ণাকে পেয়ে বলল, এক গ্লাস পানি দে তো ঝর্ণা।
ঝর্ণা এদিক ওদিক হাঁটে, কিন্তু পানি দেয় না।
কী রে পানি আনলি না?
আমি বাচ্চার কামের লাইগা। অন্য কাম করতে না করছে মামী। আপনেগো নার্গিস আছে, নার্গিসরে কন।
বড়দের কাজ করার দুজনের জায়গায় এখন একজন কেবল। এ বাবার লোক কমানোর আওয়াজে কমেনি, আনুর মা য়েচ্ছায় হাওয়া হয়েছে, এরকম হাওয়া হওয়া খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। একজন হাওয়া হলে, আরেকজন উদয় হয়। এখন নার্গিসকে ছোটর কাজ শেষ করে এসে বড়র কাজে নামতে হয়। ভর সন্ধেয় ঘর মুছছে নার্গিস, তেরো বছর বয়স, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ, ত্বক শুকিয়ে কাঠ,গা থেকে বোঁটকা গন্ধ বেরোচ্ছে। ঘর মোছা রেখে বোঁটকা গন্ধ দৌড়ে গিয়ে কল চেপে গেলাসে পানি ভরে নিয়ে ইয়াসমিনকে দেয়। বোঁটকা গন্ধ ফিরে আসে ঘরে।
কি রে নার্গিস গোসল করস না নাকি?
করি তো।
খাওয়া গোসলের কথা জিজেস করলে ও শরমে মাথা নামিয়ে রাখে।
কি রে, খাইছস নার্গিস?
এই তো ঘরগুলা মুইছা গিয়াই খাইয়াম।
সন্ধ্যা হইয়া গেল, তর দুপুরের খাওয়া এখনও হয় নাই?
খিদা লাগে নাই তর? জিজ্ঞেস করি।
না খিদা লাগে নাই। খাইছি ত!
কখন খাইছস?
সকালে নাস্তা খাইছি তো।
প্রতিদিন কি সন্ধ্যার পর দুপুরের খাবার খাস?
না না। কী যে কন আপা। কাপড় ধোয়া হইছে তো। একটু দেরি হইয়া গেছে আজকে।
চোখে আমার করুণাধারা, মনে কণ্টকীর বেড়ে ওঠা।
চুলোয় পাশে দধু জ্বাল দিতে থাকা গরমে ঘামতে থাকা মাকে আমার রোষানলে আরও তপ্ত করি।
তুমি কি নার্গিসরে গোসল করার, খাওয়ার সময়ও দেও না নাকি?
মা ফুঁসে উঠলেন, ও কখন খায়, কখন গোসল করে, এইসব খবর তুই জানস নাকি! ছেড়িডা এত ধীর গতির, একটা বোতল ধুইতেই দশ মিনিট লাগায়। নিজেই কইছে ঘর মুইছা পরে খাইব।
সে সন্ধেয় নার্গিসের আর খাওয়া হয় নি। খেতে খেতে রাত বারোটা। মেয়েটির জন্য আমার বড় মায়া হতে থাকে। পরদিন সকালে রান্নাঘরে রুটি বেলছে। আমার চা চাই এর হাঁক শুনে, চা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতেই ওর মুখে মুখে চেয়ে চমকে উঠি, সারা মুখে লাল ফুসকুড়ি।
কি রে তর কি হইছে, বসন্ত নাকি?
না, কিছু হয় নাই তো!
মুখে কিসের দাগ এত!
না কিছু না। নার্গিস হেসে হাতে মুখ ঢাকে।
ওর হাত সরিয়ে নিয়ে মুখের দাগগুলো দেখি। কয়েকশ ফুসকুড়ি মুখে, বীভৎস দেখাচ্ছে মখু টি। ফুসকুড়ি হাতেও আছে। পায়েও।
তর ত বসন্ত হইছে।
না, বসন্ত হইব কেন? কি যে কন আপা। মশার দুএকটা কামড়।
মশায় এইভাবে কামড়াইছে?
সুহৃদের গুমুতের কাথাঁ নার্গিসের হাতে দিতে এসেছেন মা, কলপারে নিয়ে ধুতে হবে, রুটি বেলবে সুফি।
নার্গিসরে একটা মশারি দিতে পারো না নাকি মা? ওর তো মুখের অবস্থা সাংঘাতিক খারাপ!
মশারি আছে তো। লাগায় না কেন? মার নিরুদ্বেগ স্বর।
মশারি লাগাই তো। ওই দুইএকটা ছিদ্র দিয়া মশা আসে। এমন কিছু না। নার্গিস তার গাল আড়াল করে রাখে দু হাত বোঝাই কাপড়ে।
ছিঁড়া মশারি শিলাই কইরা লইতে কইছি, ছেড়িডা আইলসার আইলসা। মা বলেন।
সেই রাতে মেঝেতে একটি ছেঁড়া কাথাঁ বিছিয়ে নার্গিস যখন শুয়েছে, রাত তখন অনেক। আমি ওকে টেনে তুলে বললাম, যা মশারি লাগাইয়া শ। ঘুমচোখে ও রান্নাঘরের খোপ থেকে মশারি নিয়ে এল। নার্গিস ছেঁড়া মশারিটিই টাঙাতে থাকে, এক ফিতে এক চেয়ারে, আরেক ফিতে এক ছিটকিনিতে। মশারিটিতে আমি গুনে দেখি, আটানব্বইটি ছিদ্র। ওই শত-ছিদ্র মশারি ব্যবহার করা না করা সমান কথা।
নার্গিসের মুখে আরও নতুন ফুসকুড়ি। পরদিনও আমি মশারি নিয়ে পড়ি।
মা, সুহৃদকে পায়ের ওপর শুইয়ে দধু খাওয়াচ্ছিলেন, কাছে গিয়ে সুহৃদের গালে আদর করে দিতে দিতে মাকে বলি, মা ওই ছেঁড়া মশারি ছাড়া আর কোনও মশারি নাই নাকি? নার্গিসের মুখটা দেখছ?
আর কোনও মশারি থাকলে কি আমি দেই না নাকি? তর বাপে কি কিছু কিনে? ছিঁড়া ছিঁড়া মশারি তো শিলাই কইরা চালাইতাছি। আমি যদি কই কামের মানুষের লাইগা মশারি লাগব, আমারে উল্ডা যা তা কথা কইব। সুহৃদের বিছানার লাইগা নতুন মশারি কিনছে। আমার ত নাইলে থাকতে হইত ছিঁড়া মশারি দিয়াই।
